Published : 06 Feb 2026, 08:09 AM
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছিলেন—এটি ঘটনাচক্রে রাজনীতিতে একটি বড় বিতর্কের বিষয়। বিশেষ করে বিএনপি যখন স্বাধীনতা ঘোষণার কৃতিত্ব জিয়াউর রহমানকে দিতে চায়, তখন আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকেই বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে। উপরন্তু সরকারে থাকাকালে দলটি জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাবও কেড়ে নিয়েছিল।
বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই বিতর্ক বা কৃতিত্ব দাবি এবং অস্বীকারের রাজনীতি বস্তুত রাজনৈতিক বিভেদ ও প্রতিহিংসাই বাড়িয়েছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তিকে চির শত্রুতে পরিণত করেছে—যার খেসারত জাতিকে দিতে হচ্ছে এখনও। এই সুযোগে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে সম্প্রতি আরেকটি বিতর্ক উসকে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের দল জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
গত ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে একাত্তর সালে স্বাধীনতার ঘোষণা এখান থেকেই হয়েছিল। আপনাদেরই এক গর্বিত সন্তান সবার আগে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘উই রিভল্ট’। তিনি হচ্ছেন এলডিপির সম্মানিত সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম। জিয়াউর রহমান সাহেবকে হাতে ধরে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। চট্টলাবাসী, আপনাদের স্যালুট।’’
স্বাধীনতার ঘোষণা ইস্যুতে হঠাৎ করে অলি আহমদকে ‘হিরো’ বানানোর এই রাজনীতিটা বোঝা কঠিন নয়। সেটি হলো, জামায়াতের একসময়ের নির্বাচনি মিত্র এবং ক্ষমতার অংশীদার বিএনপির সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে। ৫ অগাস্টের পটপরিবর্তনের পরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানারকম নতুন বয়ান সামনে আনা হচ্ছে—যেসব বয়ানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকাকে হালকা করা এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে ‘ভিলেন’ বানানোর চেষ্টা হচ্ছে। জামায়াত এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বলেও স্বীকার করে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতের এই নতুন বয়ানকে বিএনপি গ্রহণ করছে না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য এমনকি শত্রুভাবাপন্ন অবস্থা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে বিএনপি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করছে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতি বয়ানে বিএনপি সমর্থন দিচ্ছে না। এই সমর্থন না দেওয়ার পেছনেও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সম্ভবত এসব কারণেই জামায়াত এখন নতুন কাউকে হিরো বানানোর কর্মযজ্ঞে নেমেছে। জামায়াতের আমির অবশ্য এ কথা বলেননি যে, অলি আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে স্বাধীনতার ঘোষণার যে প্রক্রিয়াটি জিয়াউর রহমানের দ্বারা সম্পাদিত হয়েছে, তার মূল নায়ক বানানো হয়েছে অলি আহমদকে।
চট্টগ্রামে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে জিয়াউর রহমানের অধীনে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন অলি আহমদ। ওই সময় চট্টগ্রামে এই রেজিমেন্টের বিদ্রোহের সম্মুখভাগে তিনি ছিলেন বলে বিভিন্ন সময় স্মৃতিচারণ ও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। নিজে বহুবার বলেছেন, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে তারা বিদ্রোহ করেছেন। তবে এখন সুর পাল্টেছেন।
জামায়াত আমিরের ওই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোট ১১-দলের সমাবেশে অলি আহমদ বলেছিলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে আমি বিদ্রোহ ঘোষণা করি।’সবশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি বিকালেও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ১১-দলীয় জোটের এক সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াত আমিরের বক্তব্যে তার আপত্তি নেই। তিনি প্রথম বিদ্রোহ করেছেন, এটা সত্য।
অলি আহমদ নিঃসন্দেহে একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য তিনি জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন। বাঙালি জাতি এজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি যে রাজনৈতিক মত ও আদর্শ ধারণ করুন না কেন; এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে নির্বাচনি জোট করলেও ১৯৭১ সালে তার যে অবদান, সেটি মুছে যাবে না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ‘উই রিভল্ট’ বলার মধ্য দিয়ে কর্নেল অলি আহমদই বিদ্রোহের সূচনা করেছেন বা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ইতিহাস তা বলে না। জামায়াতে ইসলামী চাইলেই অলি আহমদের পুনর্জন্ম হবে না। ইতিহাসের যেখানে যতটুকু ভূমিকা রেখেছিলেন, ততটুকুই তার প্রাপ্য।
ইতিহাস বলছে, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তিন দিন আগেই ৪ঠা মার্চ জিয়াউর রহমান বিদ্রোহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং জিয়াউর রহমান নিজে লিখেছেন: সম্ভবত ৪ঠা মার্চে আমি ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে ডেকে নেই। আমাদের ছিল সেটা প্রথম বৈঠক। আমি তাকে সোজাসুজি বললাম, সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। ক্যাপ্টেন আহমদও আমার সাথে একমত হন। আমরা পরিকল্পনা তৈরি করি এবং প্রতিদিনই আলোচনা বৈঠকে মিলিত হতে শুরু করি। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা, আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হল। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠছিল। (জিয়াউর রহমান, একটি জাতির জন্ম, জিয়া স্টাডি সেল/২০০২, পৃ. ১১)।
বাস্তবতা হলো, জীবদ্দশায় জিয়াউর রহমান কখনোই নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। বরং বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার অকৃত্রিম শ্রদ্ধার কথা সর্বজনবিদিতি। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে তার দল বিএনপি তাকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বানানোর চেষ্টা শুরু করে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদানকে অস্বীকার করতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, খোদ জাতীয় সংসদে জিয়াউর রহমানকে ‘পাকিস্তানের চর’ আখ্যা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। বিশেষ করে শেখ ফজলুল করিম সেলিম স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে জিয়াউর রহমানের নামে সবচেয়ে বেশি বিষোদ্গার করেছেন। সংসদ ভবনের উত্তর দিক থেকে জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে ফেলার দাবিও তোলা হয়েছিল। কিন্তু এসব নোংরামির ফলে ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের যে অবদান সেটি ম্লান হয়ে যায়নি। তার কবর সরানো যায়নি। বরং যারা এসব করতে চেয়েছিলেন, তাদেরকেই অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। হয়তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এসব রাজনীতি করে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে না চাইলে আওয়ামী লীগকে অন্তত অভ্যুত্থানের মুখে পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো না। বড়জোর দুয়েকটি মেয়াদে তাদেরকে বিরোধী দলের চেয়ারে বসতে হতো। পরে আবার ক্ষমতায় আসত। কিন্তু ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। যে অন্ধত্ব তারা ক্ষমতার চেয়ারে থাকা অবস্থায় টের পায় না।
এই সত্যটি উপলব্ধি করতে হবে যে, স্বাধীনতার ঘোষণা যে কেউ দিতে পারেন না বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার এখতিয়ার সবার থাকে না। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কারোর এই এখতিয়ার ছিল না। এমনকি তাজউদ্দীন আহমদও যদি রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তারপরও মানুষ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করত। কারণ তখন পুরো দেশের রাজনীতি ছিল ‘মুজিবময়’। সুতরাং জিয়াউর রহমানের মতো একজন মেজরের কথায় বা ঘোষণায় সাত কোটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এটা যেমন হাস্যকর, তেমনি জিয়ার ওই ঘোষণার যে কোনো তাৎপর্য নেই বা তিনি যে ঘোষণা দেননি, এমনকি তাকে ‘বাই চান্স মুক্তিযোদ্ধা’ বলা এবং তার বীর উত্তম খেতার প্রত্যাহার করাও হঠকারী রাজনীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে, তথা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই। যার ঘোষক স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে ঘোষণাটি নিজের মতো করে পাঠ করেছেন জিয়াউর রহমানসহ আরও একাধিক জন। কিন্তু এটা অস্বীকরা করা যাবে না যে, জিয়াউর রহমানের ওই পাঠ বা ঘোষণাটিই তখন মুক্তিকামী বাঙালির জন্য বড় অনুপ্রেরণা ছিল। ইতিহাসের এই ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকটি মেনে নিলেই আর জটিলতা থাকে না। এটি কৃতিত্ব নেওয়া বা কৃতিত্ব অস্বীকারের বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তির কৃতিত্ব নয়। এটা একটি সম্মিলিত প্রয়াস—যেটি শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছিল একটি জনযুদ্ধে। সেনাবাহিনী এই যুদ্ধে নিঃসন্দেহে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি ছিল যে এ দেশের সাধারণ মানুষ; কৃষক-শ্রমিক-শিক্ষক-ছাত্র-জনতা—সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর নারকীয় গণহত্যা চাপিয়ে দিয়ে ওইদিন মধ্যরাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি যে স্বাধীনতার ঘোষণাটি লিখে রেখে যান—যেটি এখন বাংলাদেশর সংবিধানেরও অংশ। সেটিই স্বাধীনতার প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং পরদিন এই ঘোষণাটি বেতার মারফত সারা দেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল বলেই ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস।
২৬ মার্চ বিবিসির রাতের অধিবেশনে প্রচারিত সংবাদে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কোনো গুপ্ত বেতার থেকে জনসাধারণের কাছে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন। (আফসান চৌধুরী, ১৯৭১ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, ঐতিহ্য/২০২৩, পৃ. ১১৪)।
২৬ মার্চ যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার বাণী গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই অনেক স্থানে পাঠিয়েছিলেন, এ বিষয়ে, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে তার বিরোধিতা করার জন্য খ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছেন, ‘একটি ঘোষণা ২৬ মার্চ রাতে শেখ সাহেব পাঠিয়েছিলেন বেতার মারফত। ঘোষণাটি ২৬ মার্চ আমাদের থানার ডাকঘরে এসেছিল। আহ্বান এসেছিল শেখ মুজিবের নামেই। আমি নিজের চোখে সে ঘোষণাটি দেখেছি। এ ব্যাপারে ধার করা তত্ত্ব শুনতে বা বুঝতে আমি রাজী নই।’ (নির্মল সেন, মা জন্মভূমি, তরফদার প্রকাশনী, পৃ. ৫২)।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু স্যারেন্ডার’ বইয়ে লিখেছেন, ২৫ মার্চ রাতে যখন প্রথম গুলিটি বর্ষিত হলো, ঠিক তখনই পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে শেখ মুজিবের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। সেই কণ্ঠের বাণী মনে হলো আগেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসাবে ঘোষণা করেন।’
রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইটিকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বইতে তিনি লিখেছেন: ‘বাঙালিদের হাতে যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য ঘোষণার আহবান জানানো হয়। এই ঘোষণাটি চট্টগ্রাম রেডিও ট্রান্সমিটিং সেন্টার কালুরঘাটস্থ (স্বাধীন বাঙলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র) থেকে ২৬ শে মার্চ বেলা প্রায় আড়াইটায় জাতির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জনাব এম. এ. হান্নান পাঠ করে শোনান। কালুরঘাটের ১০ কিলোওয়াট শক্তি সম্পন্ন ট্রান্সমিটারটির স্পষ্ট প্রচার ক্ষমতা ছিলো প্রায় ৬০ মাইল ব্যাসার্ধ পর্যন্ত। তাই দেশের অবশিষ্ট অংশের জনসাধারণের অধিকাংশই কালুরঘাট ট্রান্সমিটারের এই প্রথম ঘোষণা পরিষ্কারভাবে শুনতে পাননি। রেডিওর এই সীমাবদ্ধতার কারণে ২৬ শে মার্চ জনাব হান্নানের প্রথম ঘোষণা, ২৭শে মার্চ মেজর জিয়ার ঘোষণা এবং পরে অপর কয়েকজনের ঘোষণাও স্পষ্টভাবে শোনা যায়নি। এমন কি প্রথম দিন অনেকেই রেডিওর কার্যকর আওতার মধ্যে থেকেও জনাব হান্নানের ভাষণ শুনতে পাননি। কারণ, সাধারণত দুপুর আড়াইটায় অনেকেই রেডিও খোলেন না। তাছাড়া সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে যারা খুলেছিলেন, তারা ঢাকার খবর শোনার জন্যই রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র অধীর আগ্রহে শুনছিলেন। বস্তুত সেদিন আমাদের হাতে আদৌ কোন বেতার কেন্দ্র না থাকলেও ইতিহাসের গতিধারা, আপন পথেই চলতো। সমগ্র দেশের বাঙালীরা তখন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে। (রফিকুল ইসলাম, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, ১০৮১/পৃ. ৯১)। পরদিন ২৮ মার্চ জিয়াউর রহমান আরেকটি ঘোষণা দেন। যেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনত ঘোষণা করেন।
এগুলো ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত সত্য ও তথ্য। স্বাধীনতার ঘোষণা বলতে যা বুঝায়, সেটি দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তার পক্ষে জিয়াউর রহমানও ঘোষণা দিয়েছিলেন—সেটিও সত্য। কোনো সত্যকেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এটাও ঠিক যে, ইতিহাস এক জায়গায় থাকে না। নিত্য নতুন গবেষণায় ইতিহাসের ডানায় অনেক নতুন পালক যুক্ত হতে পারে। কিন্তু নতুন পালক সংযুক্তির নামে যদি এমন কোনো বয়ান হাজির করা হয়, যা ইতিহাসকেই বিকৃত করে, সেটি দুঃখজনক। সুতরাং স্বধীনতা যুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতা করা দলের প্রধান যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নতুন কোনো বয়ান সংযোজনের চেষ্টা করেন, তখন বুঝতে হবে, সেখানে দেশপ্রেমের চেয়ে বেশি আছে রাজনৈতিক স্বার্থ।