Published : 03 Aug 2025, 02:09 PM
দেশের তিনটি শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তারিখ পাওয়া গেছে সম্প্রতি। এ বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং ১১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন হবে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও ১১ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাকসু, রাকসু ও জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে ছাত্র রাজনীতি। কোনো ছাত্র সংগঠনই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেনি। তবে, সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন উপায়ে প্রচারণা করেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও সরব প্যানেল আশা করা যাচ্ছ।
ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সম্ভবত এখন সবচাইতে জনপ্রিয় ও সারাদেশব্যাপী বিস্তৃত ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ২০০৯ হতে ৪ অগাস্ট ২০২৪ সময়কালে ছাত্রলীগ ও পুলিশের নিপীড়নের শিকার হয়েছে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী। গুম-খুন হয়েছে অনেকে। কারাগারে আটক বা পলাতক থাকতে হয়েছে অনেককে। হুলিয়া-হামলা-মামলা-গুম-খুনের ভয় নিয়েই ১৬ বছরের আন্দোলনে ছাত্রদলকে প্রকাশ্য রাজনীতি করতে হয়েছে। বাধ্য হয়েই অনেক সাধারণ সমর্থক নিষ্ক্রিয় থেকেছে, তবু গোপন কার্যক্রম চালায়নি। ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করেনি। ছদ্মবেশ ধারণ করেনি। বৈরি পরিবেশে লড়াই করে টিকে থেকেছে।
বর্তমানে মুক্ত পরিবেশে ছাত্রদলের মিছিলগুলো ক্রমশ বড় হচ্ছে, তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনে তারা ভালো করবে, এটা খুব স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হচ্ছে, তাদের নেতৃত্বে যারা রয়েছে তাদের বয়স বেশি। এক্ষেত্রে ধর্তব্য যে, ছাত্রদলকে সরকারের হামলা-মামলা-হুলিয়ার মধ্যে রাজনীতি করতে হয়েছে। যেহেতু তারা গুপ্ত, সুপ্ত বা ছদ্মবেশি প্রতারণার রাজনীতির আশ্রয় নেয়নি, তাই শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কেউ যথাসময়ে ছাত্রত্ব শেষ করার সুযোগ পায়নি। আশা করি, আগামী দিনে তাদের নেতৃত্বে নিয়মিত ছাত্র পাওয়া যাবে।
গত প্রায় ৪০ বছরে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠন ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের পলায়নের পাশাপাশি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বও লাপাত্তা। অনেকে আটক হয়ে কারাগারে এবং অনেকে পলাতক। উপরন্তু, ২০২৪-এর জুলাই ও তার আগের ১৫ বছরে বিভিন্ন অপকর্মের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসাবে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। তাই, নিকট ভবিষ্যতে ছাত্রলীগকে দেখা যাবে না। তবে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের অনেক নীরব ভোটার আছে।
সারাদেশে অতটা জনপ্রিয় না হলেও সাংগঠনিক দক্ষতায় ছাত্রশিবির কোথাও কোথাও ছাত্রদলের সমকক্ষ বা তাদের থেকে এগিয়ে রয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বকে ফাঁসি দেয়ার সময়কালে আন্দোলন সংগঠিত করতে গিয়ে শিবিরের অনেকে নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, গুম-খুন হয়েছে। তবে ২০১৩ সালের পর হঠাৎ করেই প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে সরে আসে তারা। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর প্রকাশ্য রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে ছাত্রশিবির। ৮০-৯০ দশকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রগ কাটার মতো নৃশংসতার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বসম্মতভাবে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। ইদানীং সেখানেও তারা জোরালোভাবে ফিরে এসেছে। তাছাড়া, অন্তর্বতী সরকারের আনুকূল্যে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে জামায়াত ইসলামীর সমর্থক বা সমমনারা দায়িত্ব পাওয়ায় শিবির অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে।
যেখানে ছাত্রশিবির নিজেদের মতানুসারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পায়নি বা প্রকাশ্য রাজনীতিতে ছাত্রদলের চাইতে পিছিয়ে রয়েছে সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আন্দোলন শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেখা গেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে যারা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আন্দোলন সংগঠিত করেছে, তাদের অনেকে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পদে আত্মপ্রকাশ করছে। আবার, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিল, এমন কয়েকজন শিক্ষার্থী ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করেছে। এতে দৃশ্যমান ছাত্রশিবির শক্তিশালী হলেও ‘গুপ্ত রাজনীতি’, প্রতারণা ও ধূর্ততার রাজনীতির তকমা পেয়েছে তারা। প্রকৃত সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রশিবিরের রাজনীতির দ্বারা প্রতারিত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটা শিবিরের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। তারা যে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রকৃত অর্থে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট হারাবে।
জাতীয় রাজনীতিতে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা খারাপ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর শক্তিশালী ও দৃশ্যমান অবস্থান রয়েছে। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ঐক্য, ছাত্রমৈত্রী ইত্যাদি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে ভালো ফল করতে পারে।
এর বাইরে আরও কয়েকটি ছাত্রসংগঠন রয়েছে, যারা প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। এর মধ্যে ২০২৪-এর জুলাইয়ের গণআন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলে তাদের একটি অংশ বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) গঠন করেছে। বাগছাস ঢাবিতে সক্রিয় ও এখানে তাদের উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে।
নুরুল হক নুর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজমের সময়ে কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে পুঁজি করে ভিপি পদে বিজয়ী হয়েছিলেন। নুরের নেতৃত্বেই রাজনীতি শুরু করেছিলেন নাহিদ, আখতার (এনসিপির আহবায়ক ও সদস্যসচিব), আসিফ (বর্তমান উপদেষ্টা) এবং আরও অনেকে। এদের কয়েকজন নুরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে ছাত্রশক্তি নামে ছাত্রসংগঠনও গড়ে তুলেছিল। তারপরও নূরের দল গণঅধিকার পরিষদের ছাত্র সংগঠনের কিছু ভোট রয়েছে।
সব বিশ্ববিদ্যালয়েই উল্লেখযোগ্য অংশ সাধারণ শিক্ষার্থী, যারা প্রকৃত অর্থে দলীয় কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তাদের ভোট যে পক্ষে যাবে তাদের বিজয়ী হবার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। এখানেই ছাত্রশিবির পিছিয়ে থাকবে। কারণ ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ‘রগ কাটা’র প্রতিষ্ঠিত অভিযোগের পাশাপাশি তাদের বহুরূপী ও ছদ্মবেশি রূপ প্রকাশ পাওয়ায় তারা আস্থা হারিয়েছে।
আগামীতে যে কোনো নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারে। প্রচারণার পাশাপাশি প্রপাগান্ডা ছড়াতে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে অনলাইন ব্যবহৃত হতে পারে। এখানে ছাত্রদল বা বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর তুলনায় ছাত্রশিবির খুবই সংগঠিত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কীভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনলাইন ও অফলাইনের গুজব মোকাবেলা করবে, সেটা একটা মৌলিক প্রশ্ন।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ছাত্র শিবিরের দাবির মুখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। এছাড়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই এসোসিয়েশন (রুয়া) নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের পূর্বসূরিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। ছাত্রদলের পূর্বসূরিরা সংগঠনের সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে এ নির্বাচন বর্জন করেছিলে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের আর্জিতে কর্ণপাত করেনি। এ প্রশাসন রাকসু নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে করতে পারবে কি না, তা সময় হলেই দেখা যাবে।
ছাত্র রাজনীতি ইতিবাচক হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো চলবে, অতীতের মতো মারামারি-হানাহানি বা দখলদারি দূর হবে। ছাত্রদের যে কোনো ন্যায়সঙ্গত সমস্যার সমাধানকে প্রাধান্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ভালো রাখার জন্য ছাত্র রাজনীতির পরিবর্তন দরকার। যে কোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কোনোভাবেই মারামারি-হানাহানি প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। লেখাপড়ার পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটবে এমন কোনো কাজ করা যাবে না। বিশেষ করে, ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতির কারণে কোনো ছাত্র বা ছাত্রীকে বিশেষ সুবিধা প্রদান বন্ধ করতে হবে। ছাত্রদের গণরুম ও র্যাগ সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের গায়ে অতীত অপকর্মের দাগ আছে। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিতে জড়িত হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছাত্রশিবির প্রতিপক্ষদের সঙ্গে ছিল খুবই নৃশংস। ‘রগকাটা’ বা গুপ্ত রাজনীতি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রমূলক সংস্কৃতি থেকে শিবিরকে বের হতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণভাবে মাদকমুক্ত ও ধূমপানমুক্ত করতে পারা দরকার। রাকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট করা হবে বলে শুনেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন তো বটেই, ছাত্র ভর্তিতেও প্রতিবছর এ ডোপ টেস্ট চালু রাখতে হবে। এ ডোপ টেস্টের মধ্যে নিকোটিন টেস্ট অর্থাৎ ধূমপান ও তামাক সেবনের নেশার পরীক্ষাও যুক্ত করতে হবে। যারা নির্বাচনে প্রার্থী হবে, তাদের সবার আয়-ব্যয়, ব্যাংক ব্যালেন্স, পিতা-মাতার আয়-ব্যয়ের বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একইসঙ্গে, প্রার্থী হিসাবে জয়লাভের পর প্রতি ছয়মাস পরপর এবং মেয়াদ পরবর্তী সময়ে তাদের সম্পদের হিসাব বিবরণী প্রকাশ করতে হবে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
প্রার্থীদের অতীত রেকর্ড দেখতে হবে। খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, সন্ত্রাসের প্রমাণিত অভিযোগ থাকলে বা কোনো মামলায় সাজা হলে তার প্রার্থিতা বাতিল করতে হবে। আদালতে বিচারাধীন মামলার তথ্য তুলে ধরতে হবে। তবে, বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে সরকারবিরোধী ছাত্র রাজনীতি যারা করেছে তাদের রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হোক। গবেষণায় সমৃদ্ধ হোক দেশ। ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে ইতিবাচক নেতৃত্ব গড়ে উঠুক, যারা আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে ছাত্র সংসদের নির্ভেজাল, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচনই ভূমিকা রাখতে পারে।