Published : 02 May 2026, 08:47 AM
ভারতের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনগুলো একটি গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তা হলো, এক সময়ের শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলো ক্রমশ তাদের প্রভাব হারাচ্ছে; আর জাতীয় দল, বিশেষত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে রাজ্য থেকে রাজ্যে। এই পরিবর্তন কেবল নির্বাচনি ফলাফলের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভারতের ফেডারেল কাঠামো, গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের চরিত্রকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই আঞ্চলিক দলগুলো, যারা একসময় ভারতের রাজনীতির মেরুদণ্ড ছিল, তারা আজ সংকটের মুখে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইতিহাস, কৌশল, নেতৃত্ব এবং পরিচয়বাদী রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করা জরুরি।
১৯৬৭ সালের পর থেকেই ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান শুরু হয়। কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় ইস্যু, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। যেমন, তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (ডিএমকে) ও অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (এআইএডিএমকে), পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস, মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি), উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি), বিহারের আরজেডি ও জেডিইউ, পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দল এবং অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি) ইত্যাদি। এই দলগুলোই ভারতের রাজ্যভিত্তিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে এবং গণতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করেছে। তারা কেন্দ্রের অতিরিক্ত ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং স্থানীয় জনগণের দাবি-দাওয়া জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই সমীকরণ দ্রুত বদলাতে থাকে। বিজেপি কেবল একটি জাতীয় দল নয়, বরং এক সর্বভারতীয় সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করে। তাদের কৌশলের মূলে ছিল তিনটি বিষয়: শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, জনকল্যাণমূলক রাজনীতির প্রচার এবং হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। এই ত্রিফলা কৌশল আঞ্চলিক দলগুলোর রাজনৈতিক পথ সংকীর্ণ করে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনি অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বিজেপির সঙ্গে জোট করা আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। গোয়া, আসাম, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র বা বিহার—প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বিজেপির সঙ্গে জোটে থাকা আঞ্চলিক দলগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের ভোটব্যাংক হারিয়েছে। এর প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, বিজেপি তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে জোটসঙ্গী দলের ভোটব্যাংকে প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত, জোটে থাকলে আঞ্চলিক দলের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে আঞ্চলিক দলগুলো স্বল্পমেয়াদে ক্ষমতায় অংশীদার হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের রাজনৈতিক পাটাতন হারায়।
আঞ্চলিক দলগুলোর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো ব্যক্তিনির্ভরতা ও পরিবারতন্ত্র। একাধিক প্রজন্ম ধরে একই পরিবার নেতৃত্ব ধরে রাখায় অনেক ক্ষেত্রে দলীয় গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে। তামিলনাড়ুতে এম. কে. স্ট্যালিন, উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদব, বিহারে তেজস্বী যাদব কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—সবখানেই এই ধারাটি স্পষ্ট। যদিও এই নেতারা নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন, তবুও নতুন নেতৃত্বের অভাব এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ঘাটতি দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি শক্তি ক্ষয় করছে।
তামিলনাড়ু এখনও আঞ্চলিক রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। এখানে ডিএমকে বনাম এআইএডিএমকে—এই দ্বিমেরু কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। বর্তমানে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের তুলনায় ডিএমকে জোট সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ডিএমকে তাদের রাজনীতিকে ‘দ্রাবিড় বনাম আর্য’ পরিচয়ের ওপর দাঁড় করিয়েছে, যা ভাষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক গর্বের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, বিজেপি হিন্দুত্ব ও উন্নয়নের ইস্যু নিয়ে সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করছে। তবে এই সমীকরণে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে দক্ষিণী সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগাম’ (টিভিকে)। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই দল যাত্রা শুরু করে। যদি এই নতুন দল ১০ শতাংশের মতো ভোট কাটতে পারে, তবে নির্বাচনের ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
ভারতের রাজনীতিতে নতুন দলের আবির্ভাব নতুন কিছু নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা কেবল ‘ভোট কাটুয়া’ বা ভোট ভাগ করার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকে। যেমন, তামিলনাড়ুর প্রখ্যাত অভিনেতা কমল হাসানের দল ‘মক্কল নিধি মাইয়াম’ ২০২১ সালে উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও কোনো আসন জিততে পারেনি। বিজয়ের দল টিভিকের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন, তারা কি বিকল্প শক্তি হয়ে উঠবে, নাকি কেবল ভোটের অঙ্ক জটিল করবে? যদি তারা সত্যিই উল্লেখযোগ্য ভোট পায়, তবে তা ডিএমকে ও এনডিএ—উভয় জোটেরই ক্ষতি করতে পারে। ফলে নির্বাচন ত্রিমুখী হয়ে উঠতে পারে, যা আঞ্চলিক রাজনীতির আরও ভাঙন নিশ্চিত করবে।
আঞ্চলিক দলগুলোর মূল শক্তি ছিল ‘সাব-ন্যাশনালিজম’ বা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ। ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস—এই উপাদানগুলো তাদের রাজনীতিকে শক্তিশালী করে। কিন্তু বিজেপি একটি ‘প্যান-ন্যাশনালিজম’ বা সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণা সামনে এনেছে, যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক একত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই দুই প্রবণতার সংঘাত এখন ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু। তামিলনাড়ুর ‘হিন্দি-বিরোধী আন্দোলন’ বা ভাষাভিত্তিক রাজনীতি এখনও শক্তিশালী হলেও, তা কি জাতীয়তাবাদের এই নতুন ঢেউকে প্রতিহত করতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
আঞ্চলিক দলগুলোর আরেকটি শক্তি ছিল তাদের কল্যাণমূলক রাজনীতি। ডিএমকে সরকার সাম্প্রতিক সময়ে নানা আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যেখানে কোটি কোটি নারী ভোটার সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু বিজেপিও এখন কেন্দ্রীয় স্তরে একই কৌশল গ্রহণ করেছে। সরাসরি নগদ সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মতো উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে জাতীয় দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব কমছে।
ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব কমে যাওয়া একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। এর পেছনে রয়েছে জাতীয় দলের সাংগঠনিক বিস্তার, জোট রাজনীতির সীমাবদ্ধতা, নেতৃত্বের সংকট, নতুন রাজনৈতিক বয়ান এবং ভোটারদের আচরণের পরিবর্তন। তবে এটাও সত্য যে, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে আঞ্চলিক দলগুলো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই। বরং তারা টিকে থাকতে নিজেদের নতুনভাবে সাজিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
তামিলনাড়ুর আসন্ন নির্বাচন এই প্রশ্নগুলোর অনেক উত্তর দেবে। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ফলাফলও আগামী দিনের কেন্দ্রীয় রাজনীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। যদি কোনো রাজ্যে আঞ্চলিক দল ক্ষমতা হারায়, তবে তাদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠবে। শেষপর্যন্ত ভারতের রাজনীতি কি বহুত্ববাদী কাঠামোয় টিকে থাকবে, নাকি ক্রমশ একক জাতীয় বয়ানের দিকে এগোবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর টিকে থাকার লড়াইয়ের ওপর।