Published : 14 Mar 2026, 11:11 AM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভিঘাতে বাংলাদেশের রাজনীতি যে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছিল, তার পূর্ণ পরিণতি এখনো নির্ধারিত হয়নি। সেই অস্থির সময় পেরিয়ে দেশ শেষ পর্যন্ত দেড় দশকেরও বেশি পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার পেয়েছে, সরকার গঠন করেছে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন যেমন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, তেমনি রেখে গেছে বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন। গণঅভ্যুত্থানের আবেগ, রাজনৈতিক সহিংসতার দাগ এবং একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ছায়া—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে এখন বড় একটি দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে ন্যায়বিচারের পথে ফেরানো।
জুলাইয়ের আন্দোলন শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটাপ্রথা বাতিলের দাবিতে। পরে আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিও যুক্ত হয় এবং ছাত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে দূরে থাকা সাধারণ নাগরিকও রাজপথে নেমেছিলেন এবং শেষপর্যন্ত তা শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। সফল ওই আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য কণ্ঠ ছিলেন শরীফ ওসমান বিন হাদি, যিনি অভ্যুত্থানের পরে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হিসেবে দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠেন। টেলিভিশনের পর্দায় তার বক্তব্য, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তার অবস্থান এবং নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ওসমান হাদি প্রায়শই অমার্জিত ভাষায় কথা বলতেন। রাজনীতির প্রয়োজনে তিনি কখনো প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিতে চাইতেন, আবার কখনো নিজেই অনেক বড় ঝুঁকি নিতেন। তার এই নির্ভীকতা মানুষের প্রশংসা কুড়ালেও মাঝেমধ্যে তা শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যেত। তবে এই কঠোর ও লড়াকু মেজাজের কারণেই জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজেকে রাজনীতির একজন মুখ্য চরিত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন এবং ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করবেন বলে গণসংযোগেও নেমে পড়েছিলেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনার সেই সময়েই ঘটে যায় এক নির্মম ঘটনা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ঢাকায় সশস্ত্র হামলার শিকার হন হাদি। পরে বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু সংবাদ আসে, যা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রাজধানীর রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে নানা স্থানে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি রাজনীতিকের মৃত্যু ছিল না; জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক ভয়ংকর প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে। সে সময় দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি’ ছাড়াও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ ও ‘উদীচী’ কার্যালয়ে ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনেক মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে এনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক পোশাকশ্রমিককে কারখানা থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা ও তার মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ছিল জনমনে চরম আতঙ্কের কারণ। হাদি নিহত হওয়ার পর এই সব মবের পেছনে ইন্ধনদাতাদের পরিচয় কিছুটা প্রকাশ্য হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে থেকে যারা এর আগে মবকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তারাও একপর্যায়ে নিন্দায় সরব হতে বাধ্য হন।
অনেকেই দাবি করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে এর মাধ্যমে নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এর ফলে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তীব্র চাপের মুখে পড়ে। দেশজুড়ে সন্দেহ, আতঙ্ক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। নির্বাচন আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দেয়। শেষপর্যন্ত সুষ্ঠু একটা নির্বাচন হলেও হাদি হত্যার তদন্ত অগ্রসর হয়নি। তবে সম্প্রতি এই ঘটনা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জানা যায়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে। দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এই গ্রেপ্তার সম্ভব হয়েছে বলা হচ্ছে।
হাদির হত্যাকারী বলে অভিযুক্তের সঙ্গে হাদিরই সংগঠনের এক নেত্রীর সেলফি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান সন্দেহের কথা বলা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা যদি থেকেও থাকে, তবু নেপথ্যে যে প্রভাবশালী কোনো চক্র রয়েছে, সেই অনুমান উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্তকারীদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন কেবল হত্যাকারীকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়, আড়ালে থাকা কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করাও সমান জরুরি।
নতুন সরকারকে বুঝতে হবে যে জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য ছিল না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও ছিল ওই আন্দোলনের অন্যতম দাবি। সেই দাবি পূরণ করতে হলে তদন্তকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে হবে এবং সহিংসতার রাজনীতিকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। নয়তো গণঅভ্যুত্থানের সময় যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা দ্রুত হতাশায় পরিণত হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে ভাষা ও রাজনৈতিক প্রতীকের প্রশ্ন। সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় কিছু মহলে ইনকিলাব, ইনসাফ এবং আজাদি শব্দগুলোকে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে গড়ে উঠেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে বাংলা ভাষা ছিল সংগ্রামের কেন্দ্র। তাই বিপ্লব, ন্যায়বিচার এবং মুক্তি—এই শব্দগুলো শুধু ভাষাগত বিকল্প নয়; এগুলো জাতির ইতিহাসের অংশ।
বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যার জন্মই হয়েছে ভাষার প্রশ্নে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে অন্য ভাষার রাজনৈতিক স্লোগানকে কেন্দ্রীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা অনেকের কাছে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবশ্যই ভাষা ও সংস্কৃতির বিনিময় মানবসভ্যতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাংলা ভাষা নিজেও বহু ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করেছে। কিন্তু গ্রহণ এবং প্রতিস্থাপনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। শক্তিশালী নিজস্ব শব্দ থাকা সত্ত্বেও অন্য ভাষার রাজনৈতিক প্রতীককে কেন্দ্রীয় স্থানে বসানো হলে তা ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক অবস্থান বদলে দিতে পারে।
এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের দায়িত্ব আরও বড় হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রকে একদিকে রাজনৈতিক সহিংসতা দমন করতে হবে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই মতভেদ যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়—এই নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বাস্তবায়ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যদি এই ঘটনার প্রকৃত সত্য প্রকাশ পায় এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হয়, তবে তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না; বরং এটি প্রমাণ করবে যে নতুন বাংলাদেশ সত্যিই আইনের শাসনের পথে এগোতে চায়।
দেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নতুন সরকার, অন্যদিকে রয়েছে অমীমাংসিত সহিংসতার স্মৃতি এবং গণঅভ্যুত্থানের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন। এই দুই বাস্তবতার সংঘাতে ভবিষ্যতের পথ নির্ধারিত হবে।
যদি নতুন সরকার সাহসিকতার সঙ্গে সত্য অনুসন্ধান করে, বিচার নিশ্চিত করে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনর্গঠন করে, তবে জুলাইয়ের আন্দোলন ইতিহাসে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি সেই সুযোগ নষ্ট হয়, তবে এই অধ্যায় আরও দীর্ঘ অস্থিরতার দিকে দেশকে ঠেলে দিতে পারে।
শরীফ ওসমান হাদির রক্তাক্ত স্মৃতি তাই আজ কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; নতুন বাংলাদেশের কাছে একটি নৈতিক প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে রাষ্ট্রকে, রাজনীতিকে এবং পুরো সমাজকে। কারণ গণঅভ্যুত্থানের চেতনা তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকবে, যখন ভয় নয়, ন্যায়বিচারই হবে রাজনীতির ভাষা।