Published : 20 Oct 2025, 07:26 PM
দোহায় কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চলাকালে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছে সংবাদমাধ্যম এমনটাই বলছে। এক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সীমান্তে কয়েক দফা তীব্র সংঘাত চলার পর প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে শান্তি আলোচনায় বসে তারা। ‘যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং টেকসই ও নির্ভরযোগ্যভাবে এর বাস্তবায়ন যাচাই করতে’ দুই প্রতিবেশী অগ্রগতির পর্যালোচনা করার জন্য আবার বৈঠক করতে সম্মত হয়েছে। ২০২১ সালে তালেবানরা কাবুলের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এটি দুই দেশের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে মারাত্মক সংঘাত। এতে উভয়পক্ষের সামরিক-বেসামরিকসহ বহু মানুষ হতাহত হয়েছে।
প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এই দুই দেশের মধ্যে। সম্প্রতি আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ওপর জঙ্গি হামলার তীব্রতা বাড়ে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে যে তালেবানরাই এই জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং এর জের ধরেই তারা প্রথম আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালায়। জবাবে তালেবান যোদ্ধারা সীমান্তে পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনা চৌকিতে হামলা চালালে সংঘাত তীব্র রূপ নেয়। অন্যদিকে, তালেবানদের দাবি, পাকিস্তানই আইএসআইএস-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের মদদ দিচ্ছে।
এহেন বাস্তবতায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। ১. তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পাকিস্তানের চিরকালের 'দহরম-মহরম' সম্পর্কের এমন পরিণতি হলো কেন? ২. রাজনীতি ও কূটনীতির দাবার চাল উল্টে দিয়ে কাবুলের তালেবান কর্তৃপক্ষ কেন ভারতের দিকে ঝুঁকছে? ৩. বেলুচিস্তানে চলমান সংঘাতের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি? ৪. এই অবস্থায় চীনের অবস্থান কতটা পরিষ্কার? ৫. রাশিয়া এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া কী? ৬. এই সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের ওপর কতটা পড়বে? ৭. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে কলকাঠি নাড়ছে?
উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর মধ্যেই পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের রহস্য লুকিয়ে আছে। এই লেখায় এই প্রশ্নগুলো একে একে খোলাসা করতে চাই।
তালেবান শাসিত আফগানিস্তান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক, এমনটাই গোটা দুনিয়া জানে। তাহলে দুই দেশের সম্পর্কে কেন এমন মোড় নিল? দৃশ্যত যে কারণগুলো সামনে এসেছে, তার চেয়ে অদৃশ্য কারণগুলোই এখানে বড় নিয়ামক। আমরা জানি যে বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—এই তিনটি বৃহৎ শক্তির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। অবাক করার মতো হলেও পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের পেছনেও প্রায় একই ধরনের প্রভাব বিদ্যমান। এর সঙ্গে পাকিস্তানের নিকট অতীতের ইমরান খান সরকারের পতন এবং সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের মার্কিন সফরের যোগসূত্র রয়েছে।
২০২২ সালে পাকিস্তানের সংসদীয় প্রক্রিয়ার ছদ্মবেশে সরকার পরিবর্তন হলেও এর মূল নকশা ও পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়েছিল ওয়াশিংটনে। ইমরান খান তার দেশের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অধিকার প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হন।
এর বিপরীতে, পাকিস্তানের জেনারেল আসিম মুনির মার্কিন স্বার্থ হাসিলের ষোলো কলা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলেই ধারণা করা হয়। এ কারণেই হয়তো ইমরান খানের পতন এবং তার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ, আর অন্যদিকে আসিম মুনির যেন 'দেবদূত'। এমনকি, রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল উপেক্ষা করে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডনাল্ড ট্রাম্প ২০২০ সালের অগাস্ট মাসে হোয়াইট হাউজে পাকিস্তানি জেনারেলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে জেনারেল মুনির মার্কিনিদের কাছে সামরিক ঘাঁটি ছাড়াও আফগানিস্তান, বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশ, মিয়ানমারে তাদের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করার এবং বেলুচিস্তানের খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য আহ্বান জানানোর মতো লোভনীয় সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন।
আগে টালমাটাল জনপদ বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি আর্মির একচেটিয়া খবরদারি ছিল, যা চীনের স্বার্থ রক্ষা করত। চীনের স্বার্থের বিপরীতে মার্কিন অবস্থান জোরাল হলে এক ঢিলে অনেক পাখি মারা যায়। এর লক্ষ্যবস্তু হলো কাবুল, দিল্লি, বেইজিং, এমনকি মস্কো ও তেহরানও। আর এই কারণেই আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের জেনারেল।
মার্কিন স্বার্থরক্ষার্থেই এই জেনারেলকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে জারি রাখা দরকার। এ জন্য চাই সংঘাত, গোলমাল, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে নানা মাত্রার ও কলেবরের যুদ্ধ। বর্তমানে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, যা এখন খাইবার পাখতুনখোয়া নামে পরিচিত, ওই অঙ্গরাজ্যের লাগোয়া আফগানিস্তান সীমান্তে সেটাই চলছে।
এই ধারাবাহিকতায় আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধান হিসেবে দেখা গেলেও, পশ্চিমা চিত্রনাট্যকার এবং তার নিজস্ব অভিপ্রায় অনুসারে সামনের দিনগুলোতে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আবির্ভূত হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পাকিস্তানি এই জেনারেলের ক্ষমতা ধরে রাখা এবং মার্কিন স্বার্থের দাওয়াই প্রস্তুতের জন্য যুদ্ধ ও সংঘাতের দামামা জরুরি। এজন্যে চাই মানুষের মাথা আর রক্ত। বিনিময়ে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাই বীরত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রভুত্ব, খনিজ ভাণ্ডার আর দীর্ঘমেয়াদি খবরদারি প্রদর্শনের একটা যুথসই আয়োজন। পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ এরকম আয়োজনের বাইরের কিছু না।
রাজনীতি ও কূটনীতির দাবার চাল উল্টে দিয়ে কাবুলের তালেবান কর্তৃপক্ষের ভারতের দিকে ঝোঁকার কারণ কী? ক্ষমতার মহিমা এমনই—প্রয়োজনে শিষ্য গুরুর বুকে অস্ত্র শানায়। এখানে আদর্শিক বিষয়গুলো দৃশ্যত বিবেচ্য হলেও, বাস্তবে ক্ষমতার পালে হাওয়া লাগাতে অঘটন ঘটিয়ে পটিয়সী হবার প্রমাণ দিতে হয়। এরকম বাস্তবতা নতুন কিছু নয়।
চার দশক আগে আফগান মুল্লুকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে দুর্বল করতে মার্কিন, সৌদি এবং পাকিস্তানি স্বার্থান্বেষী কুশীলবরা যে জঙ্গি শক্তির উত্থান ঘটিয়েছিল, ওই শক্তি এখন আর তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ভেতরে নেই। সম্প্রতি তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইব্রাহিম মুত্তাকির দিল্লি সফর পাকিস্তান-মার্কিন বলয়ের ওপর স্পষ্টতই একটি চপেটাঘাত। এখানে আরও উল্লেখ্য, দিল্লি কিন্তু এখনো মস্কোমুখী। ভারতীয় আমদানি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপ ছাড়াও ইউক্রেইন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
ভূরাজনীতির এই নতুন বাস্তবতায় চীন, ইরান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে ভারত। চীনের সঙ্গে কিছু বিষয়ে বোঝাপড়ার সঙ্কট থাকলেও অর্থনীতি, কূটনীতি ও ভূরাজনীতির অনেক বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার এবং পাকিস্তান-মার্কিন স্বার্থের বিপরীতে একই সুরে কথা বলার দৃষ্টান্তও কম নয়। কাবুলের দিল্লিমুখী হওয়া এবং দিল্লির কাবুলের দিকে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার পেছনে একই তাৎপর্য কাজ করেছে।
আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে কাবুলের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে ভারত। কার্যত ভারত এবং আফগানিস্তান উভয় দেশের বিস্তর স্বার্থরক্ষা এবং সম্পর্ক বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। আফগানিস্তান ভারতের উদীয়মান সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিরক্ষা শিল্পের একটি বড় বাজার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। একই সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো নানা ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি দেখা দিলে ভারত সহায়ক শক্তি হিসেবে পাশে দাঁড়াতে পারবে। অন্যদিকে, প্রকারান্তরে একঘরে হয়ে পড়া কাবুলের জন্য যেমন কূটনৈতিক স্বীকৃতি মিলছে, তেমনি আমদানি-রফতানির সঙ্কট মেটাতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
দৃশ্যত এতসব সম্ভাব্য বিকাশযোগ্য বিষয়ের আড়ালে আফগানিস্তান এখন ভারতের হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার জন্য এক মিত্র। আফগানিস্তান ভারতের জন্য ছায়াযুদ্ধের একটা দারুণ সুযোগ। কাবুলে কট্টর উগ্র তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী কর্তৃপক্ষের এই মেলামেশা অনেক তাত্ত্বিক বাঁকা চোখে দেখলেও, বাস্তবতার নিরিখে দিল্লি ও কাবুলের সামনে এর চেয়ে কার্যকর বিকল্প ছিল না।
বেলুচিস্তানে চলমান সংঘাতের সঙ্গে পাকিস্তান-আফগানিস্তান দ্বন্দ্বের একটি যোগসূত্র রয়েছে। পাকিস্তানের মোট আয়তনের ৪৩ শতাংশ জুড়ে এই অঞ্চল। এক কোটি জনসংখ্যার এই জনপদ নানা আদিবাসী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এই ভূখণ্ডের বড় অংশ পাকিস্তানের অধীন, দক্ষিণ-পশ্চিমের অংশ ইরানে, উত্তর-পশ্চিমের এক অংশ আফগানিস্তানের অধীনে রয়েছে।
পাকিস্তান অধিকৃত অংশটি ১৯৪৮ সালের পর থেকেই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে এলেও, তারা এখন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আদলে একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে। বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে সহযোগিতা পেয়ে আসছে। ভারতীয় জনগণ এবং গণমাধ্যম বেলুচিস্তানের এই আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন জারি রাখলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়াটিকে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখে আসছে। যদিও বেলুচ জনগণের প্রত্যাশা ১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আলোকে ভারত প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহযোগিতার হাত বাড়াবে।
পাকিস্তান-বেলুচিস্তান সংঘাতে ইরান বরাবর পাকিস্তানের অবস্থানের পক্ষে সুর মিলিয়েছে। এর কারণ হলো, বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের আদি মানচিত্র সামনে নিয়ে এসেছে, যার একটি অংশ ইরানের অধীনে রয়েছে। অন্যদিকে, এই সংঘর্ষে মস্কো অনেকটা নিরপেক্ষ অবস্থান দেখিয়ে এসেছে। হাল পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘর্ষেও তেহরান ও মস্কো উভয়ই নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে।
গোল বেঁধেছে চীনের অবস্থান নিয়ে। কারণ, চীনের খনিজ, বন্দরসহ অবকাঠামো প্রকল্প হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে মার্কিনিদের প্রতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা এবং বেলুচিস্তানের খনিজ সম্পদের প্রতি ওয়াশিংটনের আগ্রহের কারণে। তাই বন্ধু ইসলামাবাদের বিপরীতে কাবুল এখন চীনের জন্য শ্রেয়তর বিকল্প। চীন ও ভারতের বোঝাপড়াও বাড়বে। অন্যদিকে মিয়ানমার এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে বেইজিং, দিল্লি এবং মস্কো মার্কিন প্রভাব বলয়ের বিপরীতে একই অক্ষরেখায় একাট্টা।
কাবুল-বেইজিং বাণিজ্যিক বোঝাপড়া এখন আরও বাড়ন্তের দিকে যাবে। মোদ্দা কথা, মার্কিন চোখরাঙানির আয়োজনে ইসলামাবাদ যদি ওয়াশিংটনের তল্পিবাহক হয়, বেইজিং তখন কাবুলের সঙ্গে দৃশ্যে ও অদৃশ্যে সুর মেলাবে—এটা অনেকটা অনুমেয়। তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। চীন ও ভারতের বোঝাপড়াও বাড়বে এতে।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘর্ষ আপাতদৃষ্টিতে দূরবর্তী মনে হলেও তার ধাক্কা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ওপরেও লাগবে। ভূরাজনীতির ঘুড়িগুলোর নাটাই যাদের হাতে তারা তো পশ্চিম আর পূর্বের বড় শক্তিগুলো। আমরা তো ঘুড়ি দেখি নাটাই দেখেও দেখি না।
এখানে উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন বরাবর বেলুচিস্তানে দমনপীড়নে চুপ থেকেছে এবং পাক আর্মিকে সমর্থন দিয়ে গেছে। তালেবান দানব উত্থানে পাক-মার্কিন মহামহিমেরা একযোগে ভূমিকা রেখেছে। এখন আবার পুরোনো সেই সাপ-লুডোর চাল বাগরাম থেকে পাক-আফগান সীমান্ত হয়ে ভারত-প্রশান্ত জলরাশি ছাপিয়ে কোন ভূখণ্ডের কোথায় গিয়ে ঠেকে সেই ভয় কেন মনে জাগে। সেই ধাক্কায় বঙ্গোপসাগর, আমাদের বন্দর, ভূমি আর জনপদের মানুষ বিপদমুক্ত থাকবে তো?
ওয়াশিংটনের স্বপ্ন বেলুচিস্তানের ঘাঁটি থেকে চট্টগ্রাম আর সেন্টমার্টিনে অবস্থান গেড়ে চীনের ওপর নজরদারি করবে। বেলুচিস্তানে আরব সাগরের উপকূলে পাস্নি বন্দরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা দেওয়ার পাকিস্তানের প্রস্তাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলীর একটি। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত চীন পরিচালিত গোয়াদর বন্দর থেকে মাত্র ১১৩ কিলোমিটার, ইরান থেকে ১৬১ কিলোমিটার এবং ইরানের ভূখণ্ডে অবস্থিত ভারতের চাবাহার বন্দর থেকে প্রায় ২৮৬.৫ কিলোমিটার দূরে পাস্নির ভূ-কৌশলগত অবস্থান।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘর্ষ আর আফগান-ভারত সম্পর্কের মধুচন্দ্রিমার সময় একটা কথা বলে রাখি। রাজনীতি, কূটনীতি আর ক্ষমতার শেষ গুলটিতেও শত্রু-মিত্র অদলবদল হয়ে যায়। ক্ষমতার পালাবদলে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বেড়েছে।
আফগান রাজনীতির জটিল রসায়নে গঠিত নানা শক্তি কোনো না কোনোভাবে যদি বাংলাদেশের ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে, তবে ভারত–বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে আফগান মডেল অনুসরণের আশঙ্কা খুব অমূলক বলা যাবে না। ভবিষ্যতে ভারতের মেত আফগান কূটনীতিকদেরও যদি ঢাকায় দেখা যায়, তাতেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। মনে করিয়ে দেওয়া যায়—সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের নেতা আফগান সরকারের আমন্ত্রণে কাবুল সফর করে এসেছেন এবং দেশে ফিরে এসে তালেবানি শাসন ব্যাপক মুগ্ধতার কথাও বলেছেন।
কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার সুযোগ বড় বড় দেশগুলো নিয়ে থাকে যদি না প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পরস্পরের ওপর আস্থার কমতি থাকে। দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হলে আর দেশের নাগরিকদের মাঝে বিশেষ করে ক্ষমতার কুশীলবদের মাঝে দেশপ্রেমের ঘাটতি থাকলে এরকম আশঙ্কা থেকে যায়। একদিন যে তালেবানের ক্ষমতায় আসা নিয়ে পাকিস্তান হেসেছিল, আজ সেই তালেবানের বিরুদ্ধেই লড়তে হচ্ছে পাকিস্তানকে।
যে সমীকরণে ২০২১ সালে ধরা খাওয়ার পর তালেবানদের কাছে নাকে খত দিয়ে পশ্চিমারা কাবুল ছেড়েছিল, একই সিলসিলায় ওয়াশিংটনের এখন দৃষ্টি পড়েছে কাবুলের উপকণ্ঠে অবস্থিত বাগরাম বিমানঘাঁটির ওপর। কোনো রাখঢাক না রেখেই সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার্ককে পাশে নিয়ে বাগরাম ঘাঁটি মার্কিনিদের কব্জায় নেবার জন্য অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।
বাগরাম বিমানঘাঁটি কব্জায় নেবার খায়েশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আফগানিস্তান, মস্কো, বেইজিং, দিল্লি, তেহরানসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ। এমন কি ইসমাবাদও রয়েছে এর মধ্যে। তবে ওয়াশিংটনের ভাড়ায় খাটা পাক কর্তৃপক্ষের এই অবস্থান ধরে রাখবে এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না।
শেষ কথা হচ্ছে, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘর্ষ আপাতদৃষ্টিতে দূরবর্তী মনে হলেও তার ধাক্কা বাংলাদেশেও লাগবে। মিয়ানমারেরও রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। কেননা দুই ময়দানেই খেলোয়াড় এবং রেফারি একই।