Published : 04 Jul 2026, 12:14 AM
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ঘেষা জঙ্গল, পাট বা ভুট্টা খেতের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে মানুষ, যাদের কাছে কোনো নথি নেই, যাতে প্রমাণ হয় তারা ভারতীয় না কি বাংলাদেশি নাগরিক।
রাতের আঁধারে কিংবা নির্জন ভোরে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ তাদের এনে জড়ো করছে সীমান্তের শূন্য রেখায়। তারপর তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের দিকে।

কিন্তু বিএসএফের ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি রুখে দিলে শূন্য রেখায় খোলা আকাশের নিচে আটকা পড়া ছাড়া উপায় থাকছে না সেসব মানুষের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের এমন একটি ঘটনা মানুষের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল।
গেল ৫ জুন গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের শূন্য রেখায় নারী ও শিশুসহ ২৮ জনকে ঠেলে দেওয়া হয়, বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা পাওয়ায় তারা দুই দিন শূন্য রেখায় পড়ে ছিলেন। পরে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়।
এভাবে মানুষকে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা আইনের চোখ কি বৈধ? নথিহীন মানুষকে এভাবে শূন্য রেখায় ঠেলে দেওয়া মানবাধিকারের দৃষ্টিতে কতটা অমানবিক? আর আন্তর্জাতিক আইনই বা কী বলছে?
‘পুশ ইন’কে অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনসহ এ সংক্রান্ত সব ধরনের আইনে অবৈধ বলছেন বাংলাদেশ ও ভারতের মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে এক দফা ‘পুশ ইন’ ঘটনা ঘটে।
বিএনপির নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনার মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই আবার ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে মানুষজনকে গোপনে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। কেন হঠাৎ ভারত এই পথে হাঁটছে?
গেল মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেই রাজ্যে বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেয় বিজেপি। ২০১৯ সালের সংশোধিত এই আইনটি ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে কার্যকর করা হয়।
ওই আইন ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নথিহীন অমুসলিম অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ খুলে দেয়।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী একজন আবেদনকারীকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারি কর্তৃপক্ষের একটি নথি দিতে হবে, যাতে তার শিকড় বা উৎস প্রমাণিত হয়।
ওই আইনে স্থানীয় পুরোহিত বা স্থানীয় খ্যাতিসম্পন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে আবেদনকারীর ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রত্যয়ন দেওয়ারও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

হিন্দু লিখেছে, যদিও নথিহীন অভিবাসীদের জন্য এ আইনটি আনা হয়েছিল, তবু বিধিমালায় আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নথি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার আগে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকত্ব আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
গেল ৯ মে চেয়ারে বসেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “যারা সিএএ অন্তর্ভুক্ত নন, তাদের গ্রেপ্তার করে সরাসরি তুলে দেওয়া হবে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে।”
এভাবেই ‘পুশ ইন’ সংকটের সূত্রপাত। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ শুভেন্দুর কথার সরাসরি প্রতিবাদ না করলেও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কথা বলে আসছে বারবার।
মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঠেলে পাঠানো লোকজনকে ঠেকাতে ঠেকাতে ‘গলদঘর্ম’ দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। সে সময় থেকে প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তের কোথাও না কোথাও এরকম ‘পুশ ইন’ চলছে।
বাংলাদেশের তরফে কিছু লোকজনকে গ্রহণও করা হচ্ছে, যদিও সেটিকে সঠিক প্রক্রিয়া বলছেন না কর্মকর্তারা।

কত লোককে ‘পুশ ইন’?
গেল ৮ জুন কলকাতায় এক দলীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, মে মাসে রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ জন লোককে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
এসব লোককে বাংলাদেশি ও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেন, “বর্তমানে ৮৩৬ জন ওই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে রয়েছেন।”
তবে শুভেন্দুর এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত করেছে বিজিবি। সোমবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিজিবি মোট ৮৩টি ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছে। যার মাধ্যমে মোট ৬৫২ থেকে ৭০৪ জন নাগরিককে বাংলাদেশে ‘অবৈধভাবে’ ঠেলে পাঠানো হচ্ছিল।
বিজিবির উপমহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘পুশ ইন’ বা ‘পুশব্যাক’ যাই বলেন কোনোভাবেই ‘অ্যালাউ’ করা হচ্ছে না। বিজিবি সদস্যরা এ ব্যাপারে চারগুণের বেশি পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সীমান্ত এলাকায় কাঠোর নজদারি করা হচ্ছে। তবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অনেকেই আসছেন, সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”

বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে গেল বছর এপ্রিলেও ভারত সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষকে ঠেলে পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিল।
সে বছর জুনে সোনা বানু নামের আসামের সেই নারী, যাকে বন্দুকের মুখে বিএসএফ ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন।
জীবনের অধিকাংশ সময় সোনা বানু ও তার পরিবারের আসামে কাটালেও এই নারীকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হয়েছিল যে, তিনি ভারতের নাগরিক, ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ নন।
সোনা বানুর মতোই ‘পুশ ইনের’ শিকার হয়েছিলেন অন্তসত্ত্বা সোনালী বিবি ও তার পরিবারের ছয় সদস্য। কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ২০ অগাস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার আলীনগর মহল্লা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরে সীমান্ত অনুপ্রবেশ আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সোনালীকে ভারতে ফেরত পাঠায় বিজিবি।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন।
আন্তর্জাতিক আইনে ‘পুশ-ইন বা পুশব্যাকের’ কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে এটি সাধারণত ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ বা অ-প্রত্যর্পণ নীতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩(১) ধারা অনুযায়ী ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি প্রযোজ্য। এ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে পাঠানো যাবে না যেখানে তার প্রাণ বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। এই নীতি অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত।
‘পুশ ইন’ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ফেরত পাঠানো হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থি।

‘অমানবিক ও অবৈধ’
এক দেশ থেকে মানুষকে আরেক দেশে ঠেলে পাঠানো, শূন্য রেখায় আটকে থেকে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে পড়াকে অমানবিক ও আইনের লঙ্ঘন বলছেন দুই দেশের মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
গেল বছর ভারতে ‘অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক আইন, ২০২৫’ কার্যকর হয়। এরপরই দেশটির সরকার কিছু লোকজনকে ‘অবৈধ নাগরিক’ আখ্যা দিয়ে সেই দেশ থেকে বের করে দিতে উদ্যোগী হয়। এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা সেখানেও হচ্ছে।
বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান ‘পুশ ইন’ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই আইনটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন।
তাদের অভিযোগ, নতুন আইনটি যথাযথ যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই ‘সন্দেহভাজন’ ব্যক্তিদের সীমান্তে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, এ ধরনের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাজ করা পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম)’ এর সাধারণ সম্পাদক কিরীটী রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘পুশ ইন’কে আমরা বৈধ প্রক্রিয়া বলতে পারি না। যদিও ভারত সরকার সম্প্রতি যে আইন করেছে সেই আইন অনুযায়ী বৈধ।
“তবে আমরা সেটিকে (আইনটিকে) ভারতের হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছি। আমাদের বক্তব্য, এই আইনের প্রয়োগ ভারতের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

২০১১ সালে দিনহাটার চৌধুরীহাট সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া মই বেয়ে পার হয়ে পরিবারের সঙ্গে দেশের ফেরার সময় বিসিএফের গুলিতে কিশোরী ফেলানী নিহত হওয়ার আলোচিত ঘটনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা এই সংগঠনটির প্রধান বলেন, “এই আইনটি কার্যকর হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে অবৈধ অভিবাসী বা বিদেশি হিসেবে সন্দেহ করা হলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে আদালতে হাজির করত। আদালত পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া তদারক করতেন।
“এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তার জাতীয়তা নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, সেই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অনেককে সরাসরি সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
বিশেষ গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আইনটির প্রয়োগ হচ্ছে তুলে ধরে কিরীটী রায় বলছেন, “আমাদের অভিযোগ, বিশেষ করে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের লক্ষ্য করেই এই নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ কারণেই আমরা বিষয়টিকে বৈষম্যমূলক বলছি এবং আদালতে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছি।”
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কোনো ব্যক্তিকে আটক বা বহিষ্কারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিচয় যাচাই, আটক হওয়ার কারণ জানানো এবং প্রয়োজনে বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করার মতো বিষয়গুলোকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)’ এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে খামখেয়ালি বা বেআইনি আটক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আটকের কারণ জানানো এবং দ্রুত বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্তে ফেরত পাঠানো বা ‘পুশ ইন’ করলে এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস, ১৯৬৩ (ভিসিসিআর)’ এর পক্ষভুক্ত। এর ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাকে তার দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনকে অবহিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও কনস্যুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া ‘কনভেনশন অন দ্য রিডাকশন অব স্টেটলেসনেস ১৯৬১’ এ রাষ্ট্রহীনতা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য হল, রাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে কোনো ব্যক্তি যেন রাষ্ট্রহীন হয়ে না পড়েন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী আসিফ মুনির বলছেন, “আধুনিক বিশ্বে প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রেরই নিজস্ব ভূখণ্ড এবং সীমান্ত রক্ষা করার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। তবে এই সীমানা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক রীতিনীতির সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
“সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ ইন’ বা জোরপূর্বক ‘পুশব্যাক’ করার যে প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের পরিপন্থি এবং চরম অমানবিক।”
কোনো আইনেই এই ‘পুশ ইন’কে বৈধ বলা যায় না, তবে কিছু জটিলতা থাকার কথা বলেছেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।
বিডিনিউজকে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কোনো আইনেই এভাবে পুশ ইন বৈধ নয়।
“পুশ ইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা দেওয়ার বিধান থাকলেও, অপর দেশ যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করে, তবে কেবল আইন দিয়ে তাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না।
“এমন পরিস্থিতিতে আইনের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায় এবং বিষয়টি তখন আর কেবল আইনি পরিধিতে না থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।”

নির্বাচনের পর বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক মেরামতের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, পুশ ইনের কারণেও তাও হুমকিতে পড়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ঘের ঘটনা ঘটলেও দুই পাশের বাসিন্দাদের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
‘হোল্ডিং সেন্টার’ থেকে শূন্য রেখায়
বাংলাদেশের সীমান্তে ‘পুশ ইন’ সমস্যা জোরালো হয় মূলত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশিদের নিয়ে অনেকটা রূঢ় বলেই পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষকদের।
কাদেরকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হবে এ বিষয়ে মুখমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, “যারা সিএএর অন্তর্ভুক্ত নন, তারা সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাদের সরাসরি রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করবে এবং বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। এরপর বিজিবির সঙ্গে কথা বলে তাদের দেশ থেকে বার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
“অর্থাৎ- ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট’। সীমান্ত সংলগ্ন সমস্ত থানায় দেশের স্বার্থে, রাজ্যের স্বার্থে আইন কার্যকর করলাম।”

শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণা আসার পর রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ সন্দেহে লোকজনকে ধরে ধরে ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নিয়ে আসা শুরু হয়। এই হোল্ডিং সেন্টারে জড়ো করাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গেল ৬ জুন ভোররাতে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) এলাকার শূন্য রেখায় আটকে থাকা ‘পুশ ইনের’ শিকার দুজনের বয়ানে উঠে এসেছে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ ও শূন্য রেখায় দুর্দশার চিত্র।
তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ৫৮ বছর ও অপরজনের বয়স ৩৫ বছর। তারা ওই সীমান্তে প্রায় ৪২ ঘণ্টা আটকে ছিলেন। ঘটনার দিনে একজন সাংবাদিকের ধারণ করা দুটি ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
‘পুশ ইনের’ শিকার দুই ব্যক্তি নিজেদের নাম প্রকাশ করেননি।
৫৮ বছর বয়সি সেই ব্যক্তিকে বলেছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার দমদম বিমানবন্দর (নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) এলাকায় থাকতেন তিনি। গত ২৬ মে স্বেচ্ছায় হাকিমপুর সীমান্তে গিয়ে বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
তার ভাষ্য, প্রথমে বিএসএফ সদস্যরা তাকে সীমান্তে বসিয়ে রাখে। পরদিন তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর একটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নিয়ে তাকে ছয়-সাত দিন রাখা হয়। সেখানে তার মতো আরও প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জনকে দেখেছেন তিনি ।
তিনি বলেন, “এরপর আমাদের ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন সীমান্তে পাঠানো হয়। গত পরশু দিন (৩ জুন) ১১ জনকে পুলিশের গাড়িতে করে বহরগাঁও সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রেখে পুলিশ চলে যায়। খাবার বলতে শুধু গতকাল একবার খেয়েছি, এরপর আর কিছু পাইনি।”
এরপর বিএসএফ তাদের বাংলাদেশের দিকে হেঁটে যেতে আদেশ দেয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা ১১ জন ছিলাম। বিএসএফ গেইট খুলে দিয়ে বলল, ‘সোজা ভেতরে চলে যাও’। আমরা সামনে এগিয়ে একটি ভবনের কাছে দাঁড়ালে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যরা আমাদের থামায়। পরে আমরা জানাই, ভারত থেকে এসেছি। এরপর তারা আমাদের নিজেদের হেফাজতে নেয়।”
অপর ভিডিও চিত্রে ৩৫ বছরের যুবক বলেন, বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণের পর তাকে প্রথমে ভারতীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে ছয় দিন রাখার পর আরেকটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নেওয়া হয়, যেখানে আরও চার দিন ছিলেন। এরপর ৪ জুন রাতে তাকে সীমান্তে এনে বাংলাদেশ অভিমুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
ছয়-সাত বছর ধরে ভারতে থাকা খুলনার তেরখাদা উপজেলার বাসিন্দা দাবিদার ওই যুবক বলেন, “‘হোল্ডিং সেন্টারে’ তখন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ জন ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি বলে পরিচয় দেওয়া মুসলিম ও বাংলাভাষী।”
‘হোল্ডিং সেন্টারের’ পরিবেশ অত্যন্ত মানবেতর ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, “বেলা ১১টার দিকে একটু চিড়া দিত। দুপুরে কখনো খিচুড়ি, কখনো ডাল-ঘন্ট। এর বাইরে তেমন কোনো খাবার দেওয়া হতো না।”

ষষ্ঠী চন্দ্রের ফিরে আসা
গেল ১০ জুন জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা সীমান্তে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন। রোদে পোড়া চেহারা, ময়লা পোশাক পরা ৬৮ বছরের ষষ্ঠী চন্দ্র প্রায় ২৪ ঘণ্টা শূন্য রেখায় পড়ে ছিলেন। গণমাধ্যমে তার অসহায় চেহারা দুই দেশের মানুষকেই নাড়া দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণ করে বিজিবি।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চান্দলাই এলাকা তার বাড়ি, এটি নিশ্চিত হয়ে ১১ জুন তাকে হেফাজতে নিয়ে স্থানীয় বকশিগঞ্জ থানার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে সীমান্তরক্ষীরা।
সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা ষষ্ঠী চন্দ্রকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) হাসানুর রহমান রবিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মানবিক কারণে তাকে আমরা ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।”
শূন্যরেখায় আটকে থাকা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হাসানুর রহমান বলেন, “এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। এটার (ফিরিয়ে নেওয়ার) কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে। একটা তালিকা (ভারতে যারা বাংলাদেশি সন্দেহে আটক আছে তাদের) দেবে বাংলাদেশ সরকারকে। তারপর যাছাই-বাছাই করে দুই ‘অথোরিটির’ মাধ্যমে আসবে। এভাবে চুরি করে ‘পুশ’ করে দেওয়া এটা কোন প্রক্রিয়া না। এই যে আমরা কাগজপত্র দেখে তাকে (ষষ্ঠী চন্দ্রকে) বাসায় দিয়ে আসলাম, এটাও প্রক্রিয়া না। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যাওয়াটা বৈধ।”

ষষ্ঠী চন্দ্র কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানাচ্ছে তার পরিবার। তার ভাই ভবানী চন্দ্র বর্মণ বলছেন, “ওর মাথায় কিছু সমস্যা আছে। সে আসলে ভারতে গিয়েছিল কি না, এটা নিয়েও সন্দেহ আছে। এত ঝামেলা করে তাকে বাড়িতে আনার পরে থেকে আবারও সে আগের মতো সারাদিন এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
তিনি কীভাবে ওই সীমান্তে গিয়েছিল, এমন প্রশ্ন করা হলে ভবানী বলেন, “আমরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করছি কীভাবে গেলা, তখন সে বলছে ‘হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি’।”
বাংলাদেশী মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলছেন, “বাংলাদেশি দাবি করে এভাবে কাউকে একতরফাভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ আন্তর্জাতিক আইন বা প্রচলিত রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় নেই। ভারতে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক বলে সন্দেহ হলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো। বাংলাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটির সমাধান আলোচনা ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।”
সীমান্তে মানুষ জড়ো করে জোর করে ঠেলে পাঠানোর ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে তুলে ধরে এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, “বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের দিনের পর দিন শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে আটকে রাখা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উদ্বেগজনক। ‘পুশ ইনের’ শিকার অনেকের কাছেই ভারতীয় পরিচয়পত্র, যেমন আধার কার্ড, থাকার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। তাই পরিচয় যাচাই ও দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা ছাড়া এভাবে জোর করে মানুষকে সীমান্ত পার করানোর উদ্যোগ দুই দেশের স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিপন্থি।”
পুরনো খবর:
সীমান্ত সম্মেলন: শূন্যরেখায় আটকে থাকাদের বিষয়ে আলোচনা তুলতে পারে
ভারতের নাগরিকত্ব পেতে প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের পাসপোর্ট জমা
৬২ ঘণ্টা ধরে শূন্যরেখায় ১০ জন: 'মানুষগুলো এভাবে কতদিন থাকবে, সেটাই প্রশ্ন'
জামালপুর সীমান্তে উত্তেজনা, দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে ইট-পাটকেল
মেহেরপুর সীমান্তে ৪ জনকে 'পুশ ইনের' চেষ্টা, বিজিবির বাধা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত ২০ জনকে 'পুশ ইনের চেষ্টা' প্রতিহত করেছে বিজিবি