Published : 14 Jan 2026, 04:41 AM
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফটোকার্ড প্রকাশ করতে শুরু করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা ফটোকার্ডে গণভোটের ‘হ্যাঁ’-তে সিল দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। গণভোটের প্রচারণার অংশ হিসেবে ১১ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মোট আটটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হবে বলে শুনলাম।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, গণভোট সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে (এনজিও) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জুমার খুতবায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আলোচনাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন চালাতে বলা হয়েছে। পোশাক কারখানার সামনে ঝোলাতে বলা হয়েছে ব্যানার। এছাড়া গণভোটের পক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে।
সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো গণভোটের বিষয়ে জনগণকে সচেতন এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। কিন্ত বাস্তবতা হলো, সরকার গণভোটে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে—যা স্পষ্টত সরকারের পক্ষপাত প্রকাশ করছে। একটি ব্যালটে দুটি অপশন বা প্রতীক (‘হ্যাঁ’ ও ‘না’) থাকবে, তার মধ্য থেকে জনগণ কোনটি বেছে নেবে বা কে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে আর কে ‘না’ ভোট দেবে—সেই অধিকার ব্যক্তির। সরকার এখানে কোনো একটি প্রতীক বা বিকল্পে ভোট দেওয়ার জন্য প্রচার চালাতে পারে না। কারণ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে ভোটের আয়োজন করা। কে কোন মার্কায় ভোট দেবে, সেটি তার পছন্দ। সরকার কোনো রাজনৈতিক দল নয় যে, একটি নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাবে। এখানে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটকে মার্কা বলে ধরে নিয়ে সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকবার কথা। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোনো বিকল্পে তার অবস্থান স্পষ্ট করা নীতিগতভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।
শুধু তাই নয়, নির্বাচনের দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাবে দেশের সব ব্যাংক। ‘হ্যাঁ’ ভোটের এই প্রচারণায় ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে টাকা খরচ করা হবে। কোনো বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) গণভোট ইস্যুতে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির জন্য সহায়তা চাইলে ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে–এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
তার মানে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার যদি ভোটের ফলাফল ঠিক করেই রাখে বা কোন ফলাফলটি সে চায়, সেটি যদি নির্ধারিতই থাকে, তাহলে আর ভোটের কী প্রয়োজন?
তর্কের খাতিরে হয়তো এটা বলা হবে যে, এই সরকার বিগত দিনের তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচিত সরকারের মতো নয়। অভ্যুত্থানের মুখে সরকারের পতনের পরে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি বিশেষ ধরনের সরকার। দ্বিতীয়ত, এই সরকার যেহেতু জুলাই সনদ তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে এবং জুলাই সনদ অনুমোদনের পক্ষে—ফলে জুলাই সনদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত পাওয়ার জন্য সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু এই যুক্তিটিও কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটি তর্কসাপেক্ষ।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলছেন, ‘আইনি বাধা না থাকায় গণভোটের প্রচারণা চালাবে সরকার।’ এখানে আইনি বাধার চেয়ে বড় প্রশ্ন নৈতিকতার এবং সরকারের নিরপেক্ষতার। কেননা ভোট মানেই হলো তার ফলাফল নির্ধারিত নয় এবং ভোটের আয়োজক রেফারির ভূমিকায় থাকবেন। তিনি খেলার নিয়ম বলে দেবেন। কিন্তু কোনো দলকে গোল করতে সহযোগিতা করবেন না। সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মানে ‘না’ ভোটের বিপক্ষে। সুতরাং সরকারের আহ্বান উপেক্ষা করে যারা গণভোটে ‘না’ ভোট দেবে, তারা কি সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবেন? তাছাড়া সরকার যখন কোনো একটি বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে, তখন মাঠ প্রশাসনের পক্ষে সরকারের সেই সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, মাঠ প্রশাসনের ওপর যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার চাপ থাকে, তাহলে সেই ভোট কি নিরপেক্ষ হবে?

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এর আগেও তিনটি গণভোট হয়েছে। কিন্তু সেইসবে ভোটের সঙ্গে এবারের ভোটের পার্থক্য অনেক। এর আগের ভোটগুলো হয়েছে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে। প্রথম গণভোট হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি মানুষের আস্থা আছে কি না—এই প্রশ্নে। বাংলাদেশে দ্বিতীয় গণভোট হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকায় জনগণের সম্মতি আছে কি না—এই প্রশ্নে।

দেশের ইতিহাসে তৃতীয় তথা সবশেষ গণভোট হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধন) বিল, ১৯৯১-এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেওয়া উচিত কি না—এই প্রশ্নে।
কিন্তু এবার গণভোট হচ্ছে চারটি প্রশ্নে। অর্থাৎ চারটি প্রশ্নের উত্তরে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিতে হবে। এই পদ্ধতিটিই ত্রুটিপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য একটি ব্যালটের বাইরে গণভোটের জন্য একটি অতিরিক্ত ব্যালট পেপার দেওয়া হবে প্রত্যেক ভোটারকে। সেখানে লেখা থাকবে: “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
এরপর ওই ব্যালটে চারটি প্রশ্ন থাকবে–
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।”
এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন।
পৃথিবীর কোনো দেশে কোনোদিন এই পদ্ধতিতে ভোট হয়েছে বলে মনে হয় না। ভোটাররা একটি ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়ে চারটি ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবে কীভাবে? ধরা যাক, কেউ দুটিতে ‘হ্যাঁ’ দেবে আর দুটিতে ‘না’। তাহলে সে কী করবে? ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ দুটি বাক্সেই ভোট দেবে? তাহলে তো ব্যালট পেপারটি বাতিল হয়ে যাবে। এর মধ্য দিয়ে আসলেই প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটবে কি না সেটি বিরাট প্রশ্ন। সম্ভবত সে কারণেই সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, গণভোটের আয়োজন করাই হয় সরকারের মতামতকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সেটিকে আইনি বৈধতা দেওয়ার জন্য। এসব গণভোটের প্রত্যক্ষদর্শী এবং গবেষকদের লেখায়ও এটি উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটেই জনগণের অংশগ্রহণ ছিল অতি সামান্য এবং যে পরিমাণ ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হয়, সেগুলো আসলে ভোটের দায়িত্বে থাকা সরকারি লোকজনের সৃষ্ট। রাষ্ট্রীয় আয়োজন ও তৎপরতায় এবারও এটি দৃশ্যমান যে, সরকার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এই গণভোটের আয়োজন করেছে এবং এই ভোটের ফলাফলও অতীতের মতোই নির্ধারিত।

বাস্তবতা হলো, জুলাই সনদে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তার অধিকাংশের সঙ্গেই দেশবাসী হয়তো একমত। দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নও জরুরি। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে জনগণের মতামত গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ। যে প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে এবার গণভোট হচ্ছে, সেটি ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সংস্কারের পক্ষে নিশ্চয়ই দেশের অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু সেটি কী সংস্কার, কার সংস্কার এবং কার দ্বারা কোন প্রক্রিয়ায় সংস্কার বাস্তবায়িত হবে—সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা থেকে বঙ্গবন্ধু ও শেখ পরিবারের লোকদের নাম বাদ দেওয়া আর পুলিশের পোশাকের রঙ বদলানো ছাড়া প্রকৃত অর্থে জনগণের কল্যাণে কী কী সংস্কার হয়েছে, সেই প্রশ্নও জনমনে আছে।