Published : 13 Jan 2026, 10:38 PM
ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল জ্বালানি সম্পদ, প্রাচীন সভ্যতা ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গভীর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। এই সংকট শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, সমাজ ও রাজনীতিতেও প্রবল।
কয়েক দশক ধরে চলা দমন-পীড়ন, বাক-স্বাধীনতা হরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের হতাশা ও ক্ষোভ নাগরিকদের প্রবল সরকারবিরোধী করে তুলেছে। বর্তমান পরিস্থিতি যেন জনগণের মনে জমে থাকা বারুদ, যেখানে দিয়াশলাই পড়তেই জ্বলে উঠেছে, সারা দেশের চিত্র অন্তত তাই বলে।
জনজীবনের নানা সংকট নিয়ে অতীতে ছোট-বড় অনেক আন্দোলন হয়েছে দেশটিতে। সর্বশেষ ২০২২ সালে হিজাব ঠিকমতো না পরার কারণে মাশা আমিনী নামের এক তরুণীকে নির্যাতন করে হত্যা করে দেশটির নীতি পুলিশ। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে ব্যাপক আন্দোলন, শত শত নাগরিক নিহত হয়, আহত ও কারাবন্দী হয় হাজার হাজার প্রতিবাদকারী।
দেশটিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে, যা মূলত অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত। ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের ভয়াবহ পতন ও মূল্যস্ফীতির কারণে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এই বিক্ষোভ দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শ্রমিক ও কর্মজীবীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশব্যাপী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় তেল রপ্তানি কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে টান পড়ে এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে পড়েছে।
রিয়ালের মূল্যহ্রাসে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়েছে। মধ্যবিত্ত দ্রুত দরিদ্র হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে, সামাজিক সংকট তীব্র হয়েছে। সরকার ভর্তুকি দিয়েও পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে।
মুসলিম বিশ্বে ইরানে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী বেশি। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যে ও ঐতিহ্যে অগ্রগণ্য। এমন সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কারণে গভীর সংকটে। শাসকশ্রেণির সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বেড়েছে। সরকার শিক্ষিতদের একাংশকে সামরিকখাতে কাজে লাগালেও সামগ্রিকভাবে তাতে সংকট মেটেনি।
ইরানের জিডিপি ৩৫৬.৫১ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ০.৬ শতাংশ, অনেক ক্ষেত্রে নেগেটিভ। এই দুরবস্থা মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে শত্রুতা ও জাতীয় নিরাপত্তায় বিপুল ব্যয়ের ফল। সীমিত জাতীয় আয়ের বড় অংশ সেখানে গেছে, সংকট তৈরি হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তায়।
৪৭ বছর আগের বিপ্লব জনআকাঙ্ক্ষা ধারণ না করে ধর্মীয় মতাদর্শের মোড়কে একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে। নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে সমাজে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হয়েছে। সমাজ বিভক্ত—একদিকে রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী, অন্যদিকে সাধারণ জনগণ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বেকার ও সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধে বন্দি। দেশত্যাগের চেষ্টা করলেও তাদের জন্য বাইরের দরজা বন্ধ।
ইরানে কার্যত ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। নামমাত্র নির্বাচন হলেও মূল ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। গার্ডিয়ান কাউন্সিল, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনী-আইআরজিসি সরাসরি তার অধীন। ফলে এটি কোনো প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, প্রচণ্ড মাত্রায় নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা।
বিপ্লবের সময় বহুদলীয় উদারগণতান্ত্রিক ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামপন্থীরা একচ্ছত্র ক্ষমতা দখল করে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে বামপন্থী তুদেহ পার্টি, ফেদায়ান-ই-খালক, মোজাহেদিন-ই-খালকসহ, ইসলামপন্থী ও উদারপন্থীরা একসঙ্গে শাহকে উৎখাত করেছিল। অথচ, ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বাম ও উদারপন্থীদেরকে ‘ইসলামবিরোধী’ ও ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী’ আখ্যা দিয়ে কারাবন্দী করে, হাজার হাজার নেতাকর্মীকে নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৮৮ সালের কারাগারে গণহত্যা এক্ষেত্রে খুবই উল্লেখযোগ্য।
ইরানের সমাজ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও ফারসি জাতীয়তাভিত্তিক। জাতিগতভাবে তারা ছিল উদার, সংস্কৃতিবান ও শিক্ষিত। বিপ্লবের পর ক্ষমতা দখলকারীরা ধর্মভিত্তিক না হয়ে উদার গণতান্ত্রিক পথে গেলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও উন্নয়নে আজ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনা তাদের ছিল। এই ধর্মভিত্তিক শাসনই বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী, যার শুরুতেই ছিল বিভাজনের বীজ।
ইরানে আন্দোলন নতুন কিছু নয় বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে বিরতি দিয়ে নানা ইস্যুতে তা হয়েছে। সর্বশেষ, ২০২২ সালেও মাশা আমিনীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ওই আন্দোলনগুলোর সাথে এবারের আন্দোলনের আদর্শ ও বৈশিষ্টগত পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। যেমন;
১) আগের আন্দোলনগুলো ছিল সংস্কার বা অর্থনৈতিক দাবি-কেন্দ্রিক। এবার আন্দোলনকারীরা ইসলামি শাসনব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করছে, তারা ‘সংস্কার নয়, সরকারের পতন চায়’।
২) আন্দোলনে শুধু তরুণরা নয়—কিশোর, মধ্যবয়সী, প্রবীণ ও সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছে, যাকে একটি আন্তঃপ্রজন্ম বিদ্রোহ বলা যায়।
৩) পূর্বে আন্দোলন দমনে সরকার সফল হলেও এবার বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ওই ভয় কাজ করছে কম। শত শত মৃত্যু, হাজার হাজার কারাবরণ, ইন্টারনেট বন্ধেও তা থামছে না।
৪) এবার নারীরা শুধু অংশগ্রহণ করছে তাই নয়, তারা আন্দোলনের নৈতিক ও প্রতীকী কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
৫) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক, এই আন্দোলনটি হচ্ছে কোনো সংগঠন ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়াই এবং তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিগত বছরের আন্দোলনগুলো শহরকেন্দ্রীক হলেও এবারের আন্দোলন ৩১টি প্রদেশ, ১৮০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
এসব কারণে এবারের আন্দোলনটি ভিন্নমাত্রিক ও এটা দমন করা কঠিন। শাসনব্যবস্থা মূলত টিকে আছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে। তবে তাদের বৈধতা দুর্বল হচ্ছে দিন দিন।
ইরানে চলমান আন্দোলনকে কেবল অর্থনৈতিক সংকটের ফল বললে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত একটি দেশের গভীর সংকটের প্রতিফলন। এখানে যা ঘটছে বা ঘটবে, তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে পড়বে। পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এই বিক্ষোভ হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ নয়—দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, সংঘাত, অবিশ্বাস, ক্রোধ ও হতাশার ফল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা, ধর্মভিত্তিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, তরুণ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধের উত্তেজনা।
রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বিপুল সামরিক ব্যয়ের কারণে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন উপেক্ষিত হয়েছে। দেশটির অনেক নাগরিক মনে করেন, সরকার বিদেশনীতি ও ধর্মীয় প্রকল্পে অত্যধিক মনোযোগ দিয়ে জনগণের জীবনমানকে অবহেলা করছে। একদিকে নাগরিক সংকট মেটাতে ব্যর্থতা, অন্যদিকে প্রক্সি যুদ্ধে বিপুল বিনিয়োগের জন্য জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে, যা অনেকটা মরার ওপর খড়ার ঘায়ের মতো হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইরানের জনগণের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সমর্থন করছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত। বাইরের শক্তিগুলো জনগণের হতাশাকে কাজে লাগিয়ে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে হস্তক্ষেপ করছে। বিদেশি ইন্ধনকে সমর্থন না করলেও জনগণের যৌক্তিক দাবিকে অস্বীকার করা যায় না।
ইরানের সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাব্য পথ খোলা। প্রথমত, অর্থনৈতিক সংস্কার, সামাজিক শিথিলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করা। দ্বিতীয়ত, দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখা। তৃতীয়ত, চলমান আন্দোলন সহিংসতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিচ্ছিন্নতা ও গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরী হওয়া। সর্বশেষ, সরাসরি বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ, যুদ্ধ-সংঘাত ও আধিপত্য।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রথম পথটি সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কিন্তু সবচেয়ে কঠিন, কারণ সরকার কঠোর দমননীতিতে অটল। হতাহতের সংখ্যা ও উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য ধারাবাহিক সংগ্রামই একমাত্র বিকল্প। ইরান রাষ্ট্র হিসেবে শক্তিশালী, কিন্তু ক্ষমতা ও জনতার মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। এই দূরত্ব কমাতে না পারলে তাৎক্ষণিক পতনের মুখে না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এক গভীর সংকটের দিকে যাবে ইরান।