Published : 31 Dec 2025, 02:51 AM
খালেদা জিয়ার মৃত্যু এমন এক রাজনৈতিক সময়ের সমাপ্তি, যার সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, অস্থিরতা, প্রতিহিংসা এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার উত্থান–পতন গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তার প্রস্থান তাই একজন নেতার মৃত্যুর চাইতে বেশি কিছু; রাজনৈতিক সংস্কৃতির হিসাবনিকাশ, অসম্পূর্ণতার দলিল এবং দীর্ঘদিন জমে থাকা দ্বন্দ্বগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর মুহূর্ত। দীর্ঘ সময় ধরে যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, মৃত্যু তাকেই আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। রাজনীতিতে এ নতুন কিছু নয়। অনেক সময় জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষকেই বরং কথা বলার সুযোগ করে দেয় ইতিহাস।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় কেটেছে শারীরিক ভঙ্গুরতা আর রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে। অসুস্থতা, কারাবাস, নীরবতা এবং ক্রমাগত দূরে সরিয়ে রাখার কৌশল কায়েম করে তাকে ধীরে ধীরে জনপরিসর থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের ফিরিয়ে নেয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার দিকে। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার উত্থান কোনো পরিকল্পিত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রতিফল ছিল না। এটি ছিল আকস্মিক এক ট্র্যাজিক উত্তরাধিকার। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর রাজনীতিতে তার প্রবেশ ছিল ব্যক্তিগত শোক ও রাষ্ট্রীয় শূন্যতার মিলিত প্রতিক্রিয়ার মতো। এরপর যে পথচলা তার, তা উত্থান–পতন, আন্দোলন, সংঘর্ষ, আপস, ভুল সিদ্ধান্ত এবং আপসহীন অবস্থানের সংমিশ্রণ।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে শেখ হাসিনার সঙ্গে সৃষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই দ্বন্দ্ব যতটা না ক্ষমতার লড়াই, তার চেয়ে বেশি ছিল জাতীয় পরিচয়, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি ভিন্ন বয়ানের সাংঘর্ষিক অবস্থান। তবুও দুই ‘বেগম’-এর এই প্রতিযোগিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দর্শনের চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। এর ফল ভোগ করেছে পুরো সমাজ, দেশ, বাংলাদেশের মানুষ। রাজনীতির ভাষা হয়ে উঠেছে কঠোর, প্রতিহিংসাপূর্ণ এবং বিভাজনমূলক।
এই সরলীকরণ আসলে ঘটে যাওয়া বাস্তবতাকে ঢেকে দেয়। খালেদা জিয়া একা এই সংস্কৃতি তৈরি করেননি, আবার এর বাইরেও ছিলেন না পুরোপুরি। বরং তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের রাজনীতির প্রতীক, যেখানে প্রতিক্রিয়া ছিল নীতি, প্রতিশোধ ছিল কৌশল এবং ক্ষমতা ছিল অস্তিত্বে নামান্তর।
খালেদা জিয়ার রাজনীতি মনস্তাত্ত্বিকভাবে বোঝাও জরুরি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নেতারা জনগণের মনে কেবল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে থাকেন না; তারা হয়ে উঠেন আশা, হতাশা, রাগ এবং প্রত্যাশার অসামান্য এক আধার। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। তার জয়–পরাজয় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তার পতনের সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা, অসহায়ত্ব এবং হারানোর বেদনা জন্ম নিয়েছে।
প্রশ্ন আসে, রাজনীতি কি ব্যক্তির ছায়া, নাকি সমাজের প্রতিচ্ছবি? খালেদা জিয়ার উত্থান ও পতনে এটা স্পষ্ট যে, রাজনীতি একক ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিচালিত হয় না। এটি সমাজের মূল্যবোধ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং নৈতিকতার সমষ্টিগত প্রতিফলন। সমাজ যদি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিহিংসা ও বিভাজনের মধ্যে বাস করে, রাজনীতিও ক্রমে সেই পথেই হাঁটতে শুরু করে।
খালেদা জিয়া ভুল করেছেন। তিনি ক্ষমতায় আসীন হয়ে সেই ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে সংহত করার চেষ্টা করেছেন, র্যাব গঠনের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিরোধী দলমত দমনেও আপস করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই গণহত্যা বা সর্বগ্রাসী দমনকে নৈতিকতা হিসেবে দাঁড় করাননি। তিনি ‘আমরা বনাম তারা’ দিয়ে রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করার প্রয়াস নেননি। চাপ এলে তিনি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, কখনো সংশোধনের চেষ্টাও করেছেন। আর, এখানেই সংশ্লিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তার শাসনের মৌলিক পার্থক্য।
এই পার্থক্যই তার মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রেক্ষাপটে। রাষ্ট্রনেতা হয়েও দেশ ছেড়ে পালানো মানে নিজের রাজনৈতিক লেজিটিমেসিকে নিজ হাতে ভেঙে ফেলা। এর বিপরীতে, খালেদা জিয়া জেল-জীবন নিশ্চিত জেনেও নিরাপত্তার নিরিখে বিদেশে পাড়ি জমাননি। আর, এই দুই সিদ্ধান্তের পার্থক্যই খালেদা জিয়াকে ইতিহাসে আলাদা জায়গা দিয়েছে।
খালেদা জিয়া রাজনীতিতে শূন্যতা রেখে যাননি; তিনি ভবিষ্যৎ রেখে গেছেন। তারেক রহমান, জোবাইদা রহমান ও জাইমা রহমান নামক উত্তরাধিকার পারিবারিক নয় শুধু, এটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতারও প্রশ্ন। তার প্রয়াণ এবং তারেক রহমানের সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা একসঙ্গে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা বহুদিন ধরে চলমান অভাবিত অনেক রাজনৈতিক ‘ধান্দা’র মুখোশ খুলে দিতে চলেছে বলে প্রত্যাশা পোষণ করছে দেশের মানুষ।
অবশ্য, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া স্থিতিশীলতা। আঠারো বছর পর পাওয়া এরকম এক সুযোগ যে কোন রাজনীতিবিদের জন্যই চরম এক প্রত্যাশা ও পরীক্ষার ব্যাপার। তারেক রহমানের মোলায়েম ভাষা, ক্ষমাসুন্দর ইশারা, সমালোচকদের মুক্তচর্চার কথাবার্তা–একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্ভাবনাকে সম্ভব করে তুলতে পারে। আর, এ কারণেই এখনকার সবচেয়ে অঘোষিত সত্য হচ্ছে, তারেক রহমানই এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন। তার এই নিরাপত্তার প্রশ্ন তাই যতটা না ব্যক্তিগত, তারচেয়ে বেশি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
খালেদা জিয়াকে শতভাগ নিখুঁত নেতা বলবার দরকার নেই। কোনো মানুষই তা হন না। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি ছিলেন এমন একটি দেয়াল, যা ভাঙার আগে পর্যন্ত গণতন্ত্রকে কিছুটা হলেও ধরে রেখেছিল। সেই দেয়ালের গায়ে ভর দিয়েই ক্ষমতা জানত, শক্তি সামর্থ্য থাকলেই সবকিছু করা যায় না। আজ সেই দেয়াল আর নেই। নেই এই প্রশ্নের উত্তরও যে, এই একটি মানুষের অনুপস্থিতিতে কি গণতন্ত্র হারিয়ে গেছে, নাকি বহু আগেই তা ঘটে গেছে–শুধু দায়টা তার কাঁধে চাপিয়ে এদেশের রাজনীতিকরা নিজস্ব স্বস্তি খুঁজে নিয়েছেন! উত্তর না থাকলেও, এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আমাদের শেখার জায়গা রয়েছে। ইতিহাস শুধু বিজয়কে গণ্য করে না; ইতিহাস স্থিতির মধ্যে ধৈর্য, ভুল থেকে শিক্ষা এবং নৈতিক সীমারেখা মানার ক্ষমতাকেও তুল্যমূল্যে মাপে।
খালেদা জিয়ার জীবন থেকে আহরিত জ্ঞানের অন্যতম ভাষ্যই এটা–রাজনীতি কখনও ব্যক্তিগত প্রতিশোধের খেলা হতে পারে না। প্রতিহিংসা দিয়ে ক্ষমতা নেওয়া গেলেও রাষ্ট্র ও মানুষের ভাগ্য গড়া যায় না। রাষ্ট্র টিকে থাকে যখন গণমানুষের আশা, নৈতিকতা আর দায়িত্ব এক জায়গায় এসে মেলে। এই জায়গাটা তিনি হয়তো সবসময় ধরতে পারেননি, কিন্তু কখনো অস্বীকারও করেননি।
রাজনীতির সমসাময়িক অনেক নেতার মতো চটজলদি দৌড়ে চলার আকাঙ্ক্ষা ছিল না খালেদা জিয়ার। সময় বারবার তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত আর ত্বরিৎ প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিলেও তিনি হেঁটেছেন নিজের ছন্দে; কখনো থেমে গিয়ে পরিস্থিতি বুঝেছেন, কখনো প্রয়োজন হলে পিছু হটেছেন। এই ধীরতার ভেতরেই নিহিত ছিল তার রাজনীতির দর্শন–সব লড়াই জেতার জন্য নয়, সব জয় তৎনগদ হবার নয়। কারণ, ইতিহাস গতির চাইতে অধিক গুরুত্ব দেয় স্থিরতা, সহনশীলতা এবং সীমারেখা মানার সদিচ্ছায়। অনেক সময় তাই ধীরে চলাই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার একমাত্র উপায় হয়ে উঠে, আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত এই ধৈর্যকেই মূল্যায়িত করে এসেছে।