Published : 09 Sep 2025, 01:38 AM
চলতি আলাপখানির শিরোনাম দিতে চেয়েছিলাম মালপাহাড়িয়া জাতির মালতো ভাষায়, ‘জারাম ক্ষেক্ষলা তেইলাম, জারাম ক্ষেক্ষলদূ তেইলান’। বাংলায় এর মানে ‘আমরা জন্মমাটি ছাড়ব না, জন্মভূমি ছাড়ব না’। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট পরিচালিত ২০১৮ সালের ভাষা জরিপে দেশের ১৪টি আদিবাসী মাতৃভাষাকে বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ভেতর মালতো ভাষা একটি। ভাষাবিদ সুকুমার সেন তার ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৪৫) বইতে মালপাহাড়িয়া ভাষাকে দ্রাবিড় ভাষার কন্নাড়ি শাখার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেছেন। কৃষ্ণচন্দ্র টুডু অবশ্য মালতো ভাষাকে দ্রাবিড়ীয় ভাষা গোষ্ঠীর উত্তরীয় শাখার একটি ভাষা বলে মনে করেন।
এই মালতো ভাষা গত কয়েকবছরে আরও বিপন্নতর ও রক্তাক্ত হয়েছে। কারণ এই ভাষাভাষী মানুষেরা নিজ ভূমিতে নিজের জীবন নিয়েই বাঁচতে পারছেন না, সেখানে মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখা এক জটিলতম প্রশ্ন। সম্প্রতি রাজশাহীর মোল্লাপাড়াতে গ্রাম উচ্ছেদ নিয়ে মালতোভাষীরা আবারও আলোচনায় এসেছেন। মোল্লাপাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের এক মালপাহাড়িয়া আদিবাসী গ্রাম। আগে এই জায়গাটি ‘ইন্দ্র ধূপির বাথান’ নামে পরিচিত ছিল। পরে এখানে মালপাহাড়িয়াদের বসত গড়ে ওঠে এবং জায়গাটি ‘আদিবাসীপাড়া’ নামে পরিচিতি পায়। পাড়াটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২ নং ওয়ার্ডের কাশিয়াডাঙ্গা থানার হড়গ্রাম মৌজায় অবস্থিত। সাঁওতালি ভাষায় ‘হড়’ মানে মানুষ। আগে এই এলাকায় সাঁওতাল, মালপাহাড়িয়া, ওঁরাও আদিবাসীদের প্রাচীন বসতি ছিল। পাড়াটিকে মানুষ বোর্ডঘর নামেও চেনে।
মোল্লাপাড়ার সর্বপ্রবীণ ফুলমনি বিশ্বাস। এই পাড়াটি প্রথম যারা গড়ে তুলেছিলেন তার ভেতর ফুলমনির পিতা সূর্য মালপাহাড়ি এবং মা সুরু মালপাহাড়িও ছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার জন্মতারিখ লেখা আছে ২২-৫-১৯৩৭, কিন্তু কোনো ‘পদবি’ লেখা নেই। প্রায় নব্বই বছরের ফুলমণির সংসার এবং স্বজনদের জন্ম-মৃত্যু সবই হয়েছে এই পাড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার এক ছেলে মারা যায়, শৈশবে হারান দুই পুত্র। কালনী, গোপাল, যশোদা, সরলা, অধীর, সুধীরের বিয়ে হয়েছে এই পাড়া থেকেই। তার এক মেয়ে সরলা বিশ্বাসের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ লেখা আছে ২০-৩-১৯৮১। সরলার মেয়ে রূপালীর বিয়ে হয়েছে দিনাজপুরের এক মুন্ডা ছেলের সঙ্গে। ফুলমণির অন্য ছেলেরা বিয়ে করে এই পাড়াতেই আছে। সবার সংসার বেড়েছে। বাড়েনি মাটি। প্রথমে ৬টি পরিবার বসতি গড়ে তুললেও আজ হয়েছে ১৬ পরিবার।

দীর্ঘ ষাট বছর পর মালপাহাড়িয়া গ্রামটি দখল করে উচ্ছেদ করতে মরিয়া হয়েছেন সাজ্জাদ আলী নামের এক বাঙালি দখলদার। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ তৎপর হয়। আপাতত উচ্ছেদ বন্ধ আছে। কিন্তু মোল্লাপাড়ায় শঙ্কা, সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। অনেকেই দখলদারের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিচয়কে সামনে আনছেন কিংবা রেজিমের প্রসঙ্গ টানছেন। কিন্তু সকল রেজিমেই, সকল রাজনৈতিক পরিচয়েই এদেশে আদিবাসী বসতভূমি দখল হয়েছে এবং অন্যায় উচ্ছেদ ঘটেছে। ভীমপুর থেকে নাহার পুঞ্জি, উপকূলের রাখাইন বসতি থেকে সুন্দরবনের মুন্ডা জনপদ, মধুপুর থেকে লামার সরই পাহাড় কিংবা বাগদাফার্ম থেকে বগুড়া।
ভূমি দখল ও উচ্ছেদ ঘটনার কোনো রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার না হওয়াতে আদিবাসী ভূমি দখলের অনিবার্য গণিত বৈধতা পেয়েছে। অধিপতি বাঙালি মনোজগতে এই ভূমিদখলের প্রতি প্রবল সম্মতি উৎপাদিত হয়েছে। মোল্লাপাড়ায় মালপাহাড়িয়াদের ভূমিদখলের ঘটনাটি কোনোভাবেই নতুন বা একপক্ষীয় ঘটনা নয়। আদিবাসী নিয়ে রাষ্ট্রের পাতানো বাইনারি, ঔপনিবেশিক লিগ্যাসি আর কর্তৃত্ববাদী তৎপরতা সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মোল্লাপাড়ার ভূমি এবং মালপাহাড়িয়াদের জীবনের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে দশাসই সব বৈষম্য আর বাইনারির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটি রাষ্ট্রের আমূল ভূমি সংস্কার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত। এক চিমটি বিবৃতি আর কয়েকদিনের পুলিশ পাহারা দিয়ে এর সুরাহা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক, স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন এক মৌলিক সংস্কারের পথ হতে পারে।
কী ঘটছে মোল্লাপাড়ায়?
মোল্লাপাড়ায় মালপাহাড়িয়া আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বাস। বরেন্দ্র ভূমির এক আদি জাতিসত্তা মালপাহাড়িয়া। উইলিয়াম উইলসন হান্টার ১৮৭২ সালে প্রকাশিত তার ‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়াতে’ রাজশাহী অঞ্চলে পাহাড়িয়া আদিবাসীদের কথা উল্লেখ করেছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ বুলেটিন হিসেবে ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় একে দাস, বি রায়চৌধুরী এবং এমকে রাহার ‘দ্য মালপাহাড়িয়ার অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ (সিরিজ নং-৭)। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে ২০০৫ সালে সুকান্ত বিশ্বাসের ‘মালপাহাড়িয়া’ বইটি প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশে মালপাহাড়িয়াদের নিয়ে খুব একটা গবেষণা কাজের নজির নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএস থেকে পাহাড়িয়াদের নিয়ে ‘দ্য পাহাড়িয়াস এ গ্লিমপস অব ট্রাইবাল লাইফ ইন নর্থ-ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১৯৮৪ সালে ফাদার স্টিফেন জি গোমেজের একটি পিএইচডি গবেষণার কথা জানা যায়। নাটোরের পাহাড়িয়াদের নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা অঞ্চলের আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থে মালপাহাড়িয়াদের প্রসঙ্গ কিছু প্রসঙ্গ বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিতভাবে এসেছে। কুমোরবাগ, রায়, পাহাড়িয়া ও আমড়িয়া এই চারটি প্রধানভাবে বিভক্ত মালপাহাড়িয়া সমাজ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ও চাবাগানে ছড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিকতা ও ভূমিহীনতার যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন।
বাংলাদেশে মালপাহাড়িয়াদের ভেতর যারা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন তারা নিজেদের ‘পাহাড়িয়া’ এবং বাকিরা নিজেদের মালপাহাড়িয়া হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’-এর তফশিলে এই জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সঠিকভাবে যুক্ত হয়নি। তফশিলে ‘পাহাড়ী এবং মালপাহাড়ী’ নামে দুটি পরিচয় যুক্ত হয়েছে। মালপাহাড়িয়ারা এই জাত্যাভিমানী রাষ্ট্রে চরম অন্যায় পরিচয়সংকট নিয়ে বসবাস করছেন। রাষ্ট্রের কোনো নথি, দলিলে তাদের সঠিক আত্মপরিচয় মর্যাদা দিয়ে স্বীকৃতি পায়নি। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রে তাদের নামের পরে পদবিগুলোও লেখা হয়নি। এতই অবেহলা, এতই অনাদর, এতই বিভাজন।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে মোল্লাপাড়ার ভূমিদখল নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়, ৫-৯-২৫ তারিখে খাসি কেটে পাড়ার সবাইকে খাওয়ানো হবে এবং ৭-৯-২৫ তারিখের ভেতর সবাইকে পাড়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। মাত্র ১৬ কাঠা জায়গায় বর্তমানে ১৬টি পরিবারের বাস। ভূমির মালিকানা দাবি করা উচ্ছেদকারী সাজ্জাদ আলীর চাপে তিনটি পরিবার পাড়া ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় বাঙালিরা বলেন, মালপাহাড়িয়ারা এখানে ৬২ বছর ধরে আছে, জায়গাটির মালিক ইন্দ্র ধূপি। কিন্তু দখলদার সাজ্জাদ আলী ‘সন্দেহজনক’ কিছু দালিলিক কাগজপত্র হাজির করেছেন। ওইসব কাগজপত্র বিশ্লেষণে ময়মনসিংহের শিবচরণ রজক, তৃপাল রজক, মধুসূধন দাস, দিলীপ দাস, সূর্যকমল দাস, প্রকাশ দাস এমন কিছু নাম পাওয়া যায়। রাষ্ট্রকে এসব দলিলের সত্য-মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সাজ্জাদ আলী এইসব ‘সন্দেহজনক’ কাগজপত্র নিয়ে দাবি করেন তিনি এই জায়গা ১৯৯৪ সালে কিনেছেন। কার কাছ থেকে কীভাবে কিনলেন সেসবের কোনো প্রমাণ ও ব্যাখ্যা তিনি হাজির করেননি।

রাজশাহীর আমচত্বর-কাশিয়াডাঙ্গা সড়ক সংলগ্ন এই জায়গার বর্তমান দাম কয়েক কোটি টাকা। ৬টি পরিবার ধরে প্রতিটি পরিবারকে ৬ লাখ করে দিতে চান সাজ্জাদ আলী। জোর করে ভয় দেখিয়ে কিছু পরিবারকে টাকা নিতে বাধ্য করেছেন তিনি। যদি তারা থানায় যায়, অভিযোগ জানায় তবে টাকা না দিয়ে সবাইকে তুলে দেওয়ার হুমকিও দেন সাজ্জাদ আলী। ৪-৯-২৫ তারিখে কাশিয়াডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোল্লাপাড়ায় গেলে পুলিশের সামনে সবাইকে এসব জানান আতঙ্কিত বাসিন্দারা।
মালপাহাড়িয়াদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই জায়গার মালিক ছিলেন ইন্দ্র ধূপি নামে একজন ধোপা। জায়গাটি তাই ইন্দ্র ধূপির বাথান নামে পরিচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি এই জায়গায় ৬টি মালপাহাড়িয়া পরিবারকে জায়গা দেন। ভূমি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী হড়গ্রাম মৌজায় ৫১ নং জেএল এবং ১২৯০ নম্বর দাগে জমিটির পরিমাণ ৩৭.৯৪ শতক। ৪০৫ নং আরএস খতিয়ানে জমিটির মালিক হিসেবে লেখা রয়েছে রাজশাহীর কাজীহাটা এলাকার গাজিয়া রজকিনি এবং ময়মনসিংহের কোতোয়ালির মনিতারা রজকিনির নাম। ১৯৯৪-১৯৯৫ সালে এ জমি খারিজ হয়েছে সাজ্জাদ আলী, সৈয়দ আলী, ইমতিয়াজ ও ফাহামিদার নামে। সাজ্জাদ আলী যে দলিল পুলিশের সামনে হাজির করেছেন সেখানে দেখা যায় এ জায়গা তিনি মধুসূদন দাস, দিলীপ দাস, সূর্যকমল দাস, প্রকাশ দাস ও তৃপাল রজকের কাছ থেকে কিনেছেন। গাজিয়া রজকিনি ও মণিতারা রজকিনির জায়গা কীভাবে সাজ্জাদ আলী অন্যদের কাছ থেকে কিনলেন সেটি এক গুরুতর প্রশ্ন। প্রায় ষাট বছর ধরে যারা এই জায়গায় বসবাস করছেন আরএস রেকর্ডে সেই মালপাহাড়িয়াদের নাম কেন লেখা হলো না এটি আরও এক গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা।
৪-৯-২০২৫ তারিখে মোল্লাপাড়ার বাবলু পাহাড়িয়া, সুধীর বিশ্বাস পাহাড়িয়া, মুনু পাহাড়িয়া, জরিনা পাহাড়িয়া, মিশ্ররাম বর্মণ, অধীর পাহাড়িয়া, গণেশ বিশ্বাস পাহাড়িয়া, শ্রাবণ বিশ্বাস পাহাড়িয়া, রিপন বিশ্বাস, নিতাই বিশ্বাস পাহাড়িয়া, শিপেন বিশ্বাস পাহাড়িয়াসহ আরও অনেকে রাজশাহী মহানগরের কাশিয়াডাঙ্গা থানায় মোল্লাপাড়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি চিঠি দাখিল করেন। আমরা আশা করব, আদালত এর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। কোনো কতৃর্তবাদী চাপ, বাইনারি, রেজিম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। আমরা বিশ্বাস করি রাষ্ট্র ভূমিহীন মালপাহাড়িয়ার সঙ্গে দাঁড়াবে।
দেশী লীয়ে লাড়ারিন, ক্ষেপো লীয়েহ লাড়ারিন
মোল্লাপড়ার পাশে এখন সদলবলে সবাই দাঁড়াচ্ছেন, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে নতুন দিশারীরা। নাগরিক প্রতিবাদে মুখর মোল্লাপাড়া। নাগরিকদের এই প্রতিরোধ-প্রতিবাদ আমাদের আশান্বিত করে। কিন্তু একইভাবে আমাদের বিমর্ষ ও উদভ্রান্ত করে। কারণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের আগে মোল্লাপাড়ায় কী নিদারুণ অনাচার ঘটছে তা প্রশাসন, রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ কেউ জানতে পারেনি। অথচ আমরা প্রতিষ্ঠিত গোয়েন্দাগিরি থেকে আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ঘোরে-বেঘোর। আসলে আমরা জানতাম না, নাকি আমরা পাত্তা দেইনি ওই প্রশ্ন তোলা রইল। মোল্লাপাড়ার ১৬ ঘরের ভেতর মাত্র তিন ঘর জায়গা ছেড়েছিল ভয়ে, বাকিরা কিন্তু যায়নি। প্রবীণ থেকে শিশু প্রতিরোধের বয়ান তৈরি করেছে তারা। বলছেন, দেশী লীয়ে লাড়ারিন, ক্ষেপো লীয়েহ লাড়ারিন (দেশের জন্য লড়েছি, পাড়ার জন্যও লড়ব)। এই স্ফূলিঙ্গ আমরা ভীমপুর, মধুপুর, চিম্বুক, পুঞ্জি, বাগদাফার্মে দেখেছি।
২০০০ সালের ১৮ অগাস্ট। নওগাঁর মহাদেবপুরের ভীমপুর সাঁওতাল গ্রাম লণ্ডভণ্ড রক্তাক্ত করে হাতেম আলী ও সীতেশ ভট্টাচার্যের ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনী। সাঁওতালদের ৪৬০ বিঘা জমি দখল করতে এই অন্যায় আক্রমণ। নিহত হন আলফ্রেড সরেন। ২০০১ সালের ২০ মার্চ। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের মাগনতিনগর গ্রামে ভূমিদখল ঠেকাতে গিয়ে দখলদার মফিজ গংদের হাতে খুন হন গীদিতা রেমা। ২০০৭ সালের ২১ অগাস্ট। সিলেটের লালেং বা পাত্র আদিবাসী গ্রামে শান্তি পাত্রের বাড়িতে এসে পুলিশ এবং ভূমি দখলদার মনু মিয়ার ছেলেরা তাকে উচ্ছেদ নোটিশ দিয়ে যান। ২০২২ সালের ১৯ অগাস্ট। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনের প্রান্তে ১২০০ বিঘার অন্তাখালী চক দখল করতে মুন্ডা গ্রামে আক্রমণ করেন গফুর সরদারের দল। নিহত হন নরেন্দ্র মুন্ডা। আদিবাসী ভূমিদখলের এই খতিয়ান এবং রক্তদাগ বড়ই করুণ ও দীর্ঘ। মোল্লাপাড়া কেবল এর সাম্প্রতিক এক মুখস্থ সংস্করণ। তবে যেভাবে রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম এই ঘটনায় সোচ্চার ও সক্রিয় হয়েছে, পাড়ার মানুষেরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার প্রশ্নকে রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় তৎপরতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মৌলিক জিজ্ঞাসা হিসেবে এই ভূমিযন্ত্রণাকে পাঠ করেই সাম্য ও মানবিক মযাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
‘খাসি কাটা ভোজ’ কী বার্তা দেয়?
মোল্লাপাড়ার নয়া দখলদার সাজ্জাদ আলী বলেছেন, তিনি মালপাহাড়িয়াদের জোর করে তাড়িয়ে দিতে চাননি। তাদেরকে আদর-সোহাগ করে খাসি কেটে খাইয়ে-দাইয়ে এবং এমনকি প্রতি পরিবারকে টাকা দিয়ে এই জায়গা থেকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছেন। সাজ্জাদ আলীর ভাষায় এর নাম ‘পুনর্বাসন’। ‘খাসি কেটে ভোজ হবে’ এবং এরপর উচ্ছেদ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই ট্রিটমেন্ট পাবলিক পরিসরে সংবেদনশীলতা তৈরি করে।
কিন্তু ‘খাসি কাটা ভোজের’ এই বার্তা আমার কাছে মালপাহাড়িয়াদের এক প্রাচীন পৌরাণিক আখ্যানকে সামনে টেনে আনে। মালপাহাড়িয়াদের জন্ম ইতিহাস এবং স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক ভোজপর্বের কাহিনি। যদিও গরিব মালপাহাড়িয়া সমাজ বর্তমানে কিছু পূজা কৃত্য, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ ছাড়া সামাজিক ভোজের আয়োজন করতে পারে না।
পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে স্বর্গ থেকে পাহাড়িয়া ৭ ভাইকে পাঠানো হলো রাজমহল পাহাড়ে। বন পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে সাত ভাই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিল। ৭ ভাইয়ের জন্য আয়োজন করা হলো মহাভোজ। না, সাজ্জাদ আলীর মতো খাসি কেটে নয়। সাত রকমের খাবার সাত ভাগে রাখা হলো। বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এভাবে পরপর খাবার পছন্দ করতে হবে এবং বেছে নিতে হবে বসবাসের জায়গা। কিন্তু বড় ভাই মালায়র অসুস্থ হয়ে পড়ল। অন্য ভাইরা তাদের খাবার ও বসবাসের জায়গা বেছে নিল। এভাবে খাবার এবং বসতি ভাগের সঙ্গে গোত্রে গোত্রে ভাগ হয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল মালপাহাড়িয়া জাতি। বড় ভাই সুস্থ হলে, বাকি ছয় ভাই নিজেদের খাবার থেকে একটি থালায় সাজিয়ে সব খাবার ভাইকে পরিবেশন করল। ওই খাবার গ্রহণের কারণে বড় ভাই ভিন্ন জাতি হিসেবে পরিগণিত হলো।
সাজ্জাদ আলী কী মালপাহাড়িয়াদের এই ভোজ-কাহিনির মিথ জানতেন? তিনি কী খাসি কেটে খাইয়ে তাদের বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন? কারণ মোল্লাপাড়া হারালে মালপাহাড়িয়ারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, আত্মপরিচয়ের সংস্কৃতি হারাবে। ক্রমান্বয়ে নিখোঁজ হতে থাকবে মালতো ভাষা। মোল্লাপাড়ার খুব কাছেই রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যা কেবল মালপাহাড়িয়াদের মতো আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সুরক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত। মোল্লাপাড়ার ঘটনায় ‘রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের’ ভূমিকা কী? যদি এসব প্রতিষ্ঠান জনগোষ্ঠীর সংকটতম সময়ে তাদের পাশে সার্বিকভাবে দাঁড়াতে না পারে তবে এসব প্রতিষ্ঠান দিয়ে জনগোষ্ঠীর কী লাভ? ভাষা কি সংস্কৃতি যাপিতজীবন এবং জীবনসংগ্রামের সঙ্গে জড়িত বিষয়, কেবল মঞ্চনৃত্য নয়। আশা করি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও মোল্লাপাড়ার মালপাহাড়িয়াদের জীবনসংস্কৃতি সুরক্ষায় অগ্রণী হবে।
শুকমণি বা পেনশাইলিনের ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ
মোল্লাপাড়াতে এক রুগ্ন, জীর্ণ পূজাস্থল আছে। মালপাহাড়িয়ারা একে বলেন ‘কুড়ি থান’। কুড়ি হলেন গ্রাম রক্ষাশক্তি। এই থানে ‘টাঠে আড়িয়ান’ বা আম-লবানের পূজা হয়, বিষহরি, গরিয়ানাথ, গোসাই আড়িয়ান কৃত্য হয়। আমের প্রথম মুকুল আসার পর সমাজ আম ফল খাওয়ার অনুমতি চায় এই থানে। আগেকার দিনে গ্রামরক্ষার পুন্টাডি আড়িয়ান, এঁএলা আড়িয়ান, চামডেকী করা হতো। এসব পূজা-কৃত্য হারিয়ে গেছে। এমনকি গাঙ্গি আড়িয়ানও (ভূট্টা পূজা) এখন হয় না। আশেপাশের খাঁড়ি ও পুকুর থেকে ডকে (শামুক), মিন্দু (ছোট মাছ) ধরার চলও কমে গেছে। সবকিছু ভরাট হয়েছে এবং মালপাহাড়িয়াদের প্রবেশাধিকারও ক্রমশ রুদ্ধ হয়েছে।
মোল্লাপাড়ায় কোনো শশ্মান বা সমাধিস্থল নেই। পাড়ার একমাত্র সমাধিক্ষেত্রটি এখন কবর বা গোরস্থান নামে পরিচিত। এটি পূর্ব শেখপাড়াতে। ১৮ কাঠার জায়গার ভেতর টিকে আছে মাত্র ৩ কাঠা। সফিকুল ইসলাম নামের একজন কবরস্থানটি দখল করে দেয়াল তুলে ভেতরে লালশাকের বীজ বুনেছেন। কবরস্থানের যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই এখন মালপাহাড়িয়াদের। দখলদার সেখানের প্রবীণ ছাতিম এবং বটগাছ কেটে ফেলেছেন। বলেছেন ওইসব গাছে ‘ভূত’ থাকে, ভয়ে কেউ যেতে পারে না, তাই তিনি গাছগুলো কেটেছেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে (২০১২) এইরকমের স্মারক বৃক্ষ কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজশাহী বনবিভাগ কি এই বিষয়ে সরব হবে?

উচ্ছেদ-উৎসবের ভেতরেই ৫ সেপ্টেম্বর জন্ম হয়েছে এক কন্যাশিশুর। পোয়াতি শরীর নিয়ে কন্যাটির মা পূর্ণিমার কী সব ভয়াবহ সময় গেছে। শুক্রবারে জন্মেছে বলে বাচ্চাটির নাম রাখা হবে শুকমণি। মালপাহাড়িয়াদের ভেতর বাচ্চা জন্মের ৬ দিন পর কামানি হয় এবং ৩-৪ মাস পরে ‘রান্দা (অন্নপ্রাশন)’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাচ্চার নাম রাখা হয়। রান্দা অনুষ্ঠানে পাড়ার প্রবীণ কেউ শিশুটিকে আর্শীবাদ করে বলেন, ‘‘এঙ্গলে কই পাচকে (আমার মতো দীঘজীবী হও)’’। মোল্লাপাড়ার প্রবীণ নারী ফুলমণি কী আবারও একই আশীর্বাদ করবেন শুকমণিকে? ফুলমণির মতোই ভূমিযন্ত্রণা আর অস্বীকৃতি নিয়েই কী দীর্ঘজীবী হবেন শুকমণি?
শুকমণির জন্মের সঙ্গেসঙ্গেই আমার পেনশাইলিনের কথা মনে হলো। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের নাহার খাসি পুঞ্জি উচ্ছেদ নিয়ে সংকট ৩৫ বছরের। চা-বাগান উচ্ছেদ নোটিশ পাঠায়। ২০১৪ সালের ৩০ মে পুঞ্জি এবং চা-বাগানে সংঘর্ষ হয়। খাসিরা আহত হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নিতাই তাঁতি। এমন ভূমিসংকটের ভেতরেই ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর পেনশাইলিনের জন্ম। পেনশাইলিন বা শুকমণিদের এখনো দেখা হয়নি। দু-জন দুই জাতিসত্তার, দুই ধর্মের, দেশের দুই প্রান্তের বাসিন্দা। কিন্তু আদিবাসী হিসেবে ভূমিহীনতার যন্ত্রণার ভেতর উভয়ের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং সংগ্রাম। দেখা না হলেও প্রান্তিকতা এবং প্রতিরোধের প্রশ্নে এরা অভিন্ন যমজ। রাষ্ট্রকে দেশের সকল ভূমিহীন যমজ নিম্নবর্গের যন্ত্রণাকে কলিজায় ধারণ করতে হবে। শুকমণির জন্য আমরা এক সাম্য, মানবিক মযাদা, বৈষম্যহীন, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ দেখতে চাই।
ছবি: আতিকুর রহমান ও উপেন রবিদাস