১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

এই মৌসুমের সাথে মানানসই সুগন্ধি

প্রকৃতির সুবাস, টক-মিষ্টি ফলের গন্ধ কিংবা গোলাপের সৌরভে ব্যক্তিত্বের নিজস্বতা ফুটিয়ে তোলা যায়।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 May 2025, 04:49 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:41 PM

বছরের এই সময়ে চারপাশে যখন নতুন পাতা ও রঙিন ফুলের দেখা মেলে, তখন মন চায় একটু নতুন কিছু পরার, নতুন কিছু ব্যবহারের।

পোশাকের সঙ্গে বদলে যায় সুগন্ধির ধরনও। সুগন্ধের জগতে বসন্ত পরবর্তী সময় মানেই শুধু ফুলের ঘ্রাণ নয়, এবারের ঘ্রাণের ধারা বলছে এতে আছে আরও অনেক কিছু।

দুধ, কফি, ফলমূল এমনকি কিছুটা গাঢ় এবং গম্ভীর ঘ্রাণও উঠে এসেছে সুগন্ধির নতুন তালিকায়।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের সুগন্ধি বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারকার ট্রেন্ডে জায়গা করে নিয়েছে স্ট্রবেরি, মিল্ক, কফি, ককটেল বিটার্স, ভায়োলেট (বেগুনি), ট্যাঙ্গি বা টক-মিষ্টি ফল, গোলাপ, ডার্ক নোটস বা গাঢ় এবং লাইট-লেয়ার্ড গৌরমেন্ডস বা খাবারের ঘ্রাণ সুগন্ধি।

নতুন এই সুবাসগুলোর বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য এবং আবেদন এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে সুগন্ধির ধরনে।

স্ট্রবেরির প্রাণবন্ততা

এ মৌসুমের সঙ্গে স্ট্রবেরির সম্পর্ক অনন্য।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ফ্রেইগরেন্স অ্যালায়েন্স নেটওয়ার্ক’–এর প্রতিষ্ঠাতা ও সুগন্ধি বিশেষজ্ঞ গুস্তাভো রোমেরো বলছেন, “স্ট্রবেরির গন্ধ নিয়ে সুগন্ধিকররা এখন এমনভাবে কাজ করছেন, যা আগের থেকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত, প্রাণবন্ত এবং পরিশীলিত। এটি শুধু মজার নয়, বরং মুড বুস্টার (মানসিকভাবে চাঙা করে তোলে) হিসেবেও কাজ করে।”

রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি মন্তব্য করেন, এই সুগন্ধি এখন শুধু কিশোরী বা তরুণীদের জন্য নয়, বরং বয়স্ক ব্যবহারকারীদের মাঝেও জায়গা করে নিচ্ছে এর হালকা টক-মিষ্টি ও সতেজ গন্ধের জন্য।

বেগুনির শান্ত বিলাসিতা

ফুলের মাঝে ভায়োলেট বা বেগুনি যেন এক নীরব সৌন্দর্যের নাম।

মার্কিন সুগন্ধি ব্র্যান্ড ‘গুড কেমিস্ট্রি’–এর সুগন্ধি-বিষয়ক পরিচালক গ্রেটা প্যাগেল একই প্রতিবেদনে বলেন, “ভায়োলেটের’ অনন্যতা হল এর দ্বৈত স্বভাব। একদিকে এটি নরম, মিষ্টি, পাউডারি, অন্যদিকে আবার মাটির মতো সবুজ, ভেজা গন্ধের ছোঁয়া আছে এতে।”

তিনি আরও বলেন, “এই গন্ধ এখনকার ভোক্তারা বেশি পছন্দ করছেন। বিশেষ করে যারা একটু গভীরতা ও ব্যক্তিত্ব চান সুগন্ধিতে। এটা নিঃশব্দ বিলাসিতার প্রতিচ্ছবি, যা শুধু অনুভব করা যায়।”

মিল্ক: ক্রিমি কোমলতার স্পর্শ

দুধ বা মিল্ক যখন সুগন্ধির উপাদান হয়, তখন সেটা শুধু খাবারের গন্ধ নয়, বরং এক ধরনের আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় প্রসাধনী ব্র্যান্ড ‘লাষ কসমেটিকস’-এর সৌরভ-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলিনা গ্লিউইনস্কা বলেন, “মিল্কি নোটগুলোতে একটা মোলায়েম, ক্রিইমি অনুভব থাকে। এটি ভ্যানিলা, নারিকেল বা রাইস মিল্কের মতো কোমল সুগন্ধির মাধ্যমেই আসে। এতে থাকে হালকা মিষ্টি গন্ধ, তবে তা কখনই অতিরিক্ত হয় না।”

এই ধরণের সুবাস ব্যবহারকারীদের জন্য হতে পারে এক ধরনের আরামদায়ক অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে যারা দিন শেষে একটু কোমলতার খোঁজ করেন।

কফি: ঘ্রাণেই জেগে ওঠা

কফির সুবাস মানেই যেন এক প্রকার মনের উষ্ণতা। কেবল সকালবেলার কাপেই নয়, এখন এই গন্ধ সুগন্ধিতেও দারুণ জনপ্রিয়।

আলিনা গ্লিউইনস্কা বলছেন, “গৌরমেন্ডস সুগন্ধির (খাবারের ঘ্রাণ) জগতে কফির ব্যবহার এখন এক নতুন মাত্রা এনেছে। এটি শুধু গাঢ় নয়, বরং পরিশীলিত ও বাস্তবিক।”

এই গন্ধগুলোতে এক ধরনের জাগরণ রয়েছে। যারা ঘরোয়া, কফিশপ-সুলভ উষ্ণতা চান, তাদের জন্য এটি এই মৌসুমের অন্যতম পছন্দ হতে পারে।

ককটেল বিটার্স: তিক্ততায়ও সৌন্দর্য

বিশ্বজুড়ে সুগন্ধিতে এখন জায়গা করে নিচ্ছে ‘ককটেল বিটার্স’-এর মতো একটু অনন্য এবং জটিল সুগন্ধ।

‘জেনারেশন বাই অস্মো’–এর মাস্টার পারফিউমার ক্রিস্টফ লডামিয়ল বলেন, “এই সুগন্ধিগুলো সাধারণত বড় প্রতিষ্ঠানের পারফিউমে দেখা যায় না। বরং কিছু নিরীক্ষা প্রবণ পারফিউমার এ নিয়ে কাজ করেছেন, কারণ তারা এর শিল্প ভালোবাসেন।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “মনে করুন বাতাসে প্রকৃতির মাদকময় গন্ধ, পৃথিবীর সুবাস বা খানিকটা ভেষজ সুবাস- ধনিয়া বীজ আর লাইম বা লেবুর একটুখানি ছোঁয়া।”

টক-মিষ্টি ফলে প্রাণবন্ত

২০২৫ সালের সুগন্ধির জগতে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ট্যাঙ্গি বা টক-মিষ্টি ফলের ঘ্রাণ। এই সুগন্ধিতে চেরি, পেয়ারা, পাকা আম, নাশপাতি, রুবার্ব, ডুমুর এবং ব্ল্যাককারেন্টের (ছোট আকারের বেরি ধরনের ফল) মতো ঘ্রাণগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।

আলিনা গ্লিউইনস্কা বলছেন, “টিনএজার বা বডি স্প্রের যুগ পার করে এই ফলমূলের সুবাস এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। এর মধ্যে এক ধরনের পরিপক্বতা রয়েছে, যা শুধু ‘ফ্রুটি’ গন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।”

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে ফলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, এই ধরনের সুগন্ধি হতে পারে পরিচিত গন্ধের বিলাসী রূপ।

গোলাপের পুনর্জন্ম

‘রোজ’ বা গোলাপ দীর্ঘদিন ধরে সুগন্ধির প্রতীক হলেও, এটি এখন আর শুধু ক্ল্যাসিক পাউডারি গন্ধে সীমাবদ্ধ নেই।

এখনকার গোলাপ সুগন্ধিগুলো একদম নতুন রকমের। দামি জ্যামের মতো ঘন, কখনও ভেজা ঘাসের মতো সতেজ, আবার কখনও মধু বা মসলা মেশানো গন্ধে ভরা।

এই ঘ্রাণ এখন অনেক বেশি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। যারা চিরায়ত অথচ আধুনিক কিছু খোঁজেন, তাদের জন্য এটি আদর্শ সুবাস।

গভীর, গাঢ় ঘ্রাণ: বিষণ্ণতার শোভা

এ মৌসুম মানেই হালকা ফুলেল সুবাস। এই ধারণা এখন আর সর্বজনীন নয়। অনেকেই এখন গাঢ়, মাটির গন্ধ বা গাঢ় সুগন্ধের এর দিকে ঝুঁকছেন।

ফরাসি সুগন্ধি বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টফ লডামিয়ল বলেন, “এই সুগন্ধগুলো যেন বাস্তব পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি। যেখানে কোনো সিনথেটিক বা কৃত্রিম গন্ধ নেই, নেই অতিরঞ্জিত মিষ্টতা। বরং এক ধরনের গভীরতা, শেকড়ের মতো সংযোগ রয়েছে এতে।”

রাতের কোনো অনুষ্ঠানের জন্য এই ধরনের সুগন্ধ হতে পারে যথাযথ সঙ্গী।

লাইট-লেয়ার্ড গৌরমেন্ডস: খাদ্যঘ্রাণের পরিশীলিত রূপ

গৌরমেন্ডস নোট অর্থাৎ খাবারের ঘ্রাণ। বেশ কয়েক বছর ধরেই জনপ্রিয়। তবে এবার তা আরও পরিশীলিত এবং হালকা রূপে ফিরে এসেছে।

আলিনা গ্লিউইনস্কা বলেন, “এগুলো এখন শুধু চকলেট বা ভ্যানিলায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং, হালকা মিষ্টি গন্ধের সঙ্গে থাকছে ফুল, ফল বা কাঠের সুগন্ধের সংমিশ্রণ।”

তিনি উল্লেখ করেন এটি ‘টোস্টেড সুগার’ বা গরম প্যানে গলে যাওয়া চিনির ঘ্রাণের মতো। এটি যে কোনো ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া বেশিরভাগ সময়ই উষ্ণ ও আর্দ্র। তাই অতিরিক্ত গাঢ় কিংবা ভারী সুগন্ধি অনেক সময় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। এ মৌসুমে হালকা, ফলমূল বা দুধ-ভিত্তিক মোলায়েম ঘ্রাণগুলো হতে পারে সবচেয়ে মানানসই।

তবে যারা সন্ধ্যার আয়োজনে একটু গাঢ় বা কফি-ভিত্তিক সুগন্ধি চাইলে তেমন ঘ্রাণও বেছে নিতে পারেন।

আরও পড়ুন

সঠিক সুগন্ধি নির্বাচনের উপায়

সুগন্ধি স্থায়ী করার উপায়

সুগন্ধি কেনার সময় যা মাথায় রাখবেন