ত্বকের প্রাকৃতিক ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বুঝবেন যেভাবে
চামড়ার রক্ষাকবচ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ত্বকে নানান সমস্যা দেখা দেয়।
মানবদেহের বাহ্যিক সৌন্দর্য ও সুরক্ষায় ত্বক প্রথম সারির প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। তবে অনেকেই মনে করেন, বাজারচলতি নানান স্ক্রাব, ফেইসওয়াশ বা কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করলেই বুঝি ত্বক ভালো থাকে।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকের একদম বাইরের যে স্তর, যাকে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্ট্র্যাটাম কর্নিয়াম’ বলা হয়, সেটা মূলত একটি সুরক্ষাবলয় বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’।
এটি অনেকটা ইটের দেয়ালের মতো কাজ করে, যেখানে শক্ত ত্বক-কোষ বা ‘কর্নিওসাইট’ হল ইট এবং কোলেস্টেরল, ফ্যাটি অ্যাসিড ও সেরামাইড সমৃদ্ধ লিপিড হল সিমেন্ট-বালির গাঁথুনি।
স্বাস্থ্য-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসা গবেষক রেবেকা জয় স্ট্যানবোরো বলেন, “এই প্রাকৃতিক দেয়াল একদিকে পরিবেশের ক্ষতিকর ধুলোবালি, বিষাক্ত পদার্থ এবং ব্যাকটেরিয়াকে শরীরে ঢুকতে বাধা দেয়; অন্যদিকে শরীরের অভ্যন্তরীণ পানি বাষ্পীভবন হতে না দিয়ে, ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখে।”
যেসব কারণে ত্বকের রক্ষাকবচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়
প্রতিদিনের জীবনে অজান্তেই কিছু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ভুলের কারণে ত্বকের এই সুরক্ষাবলয় ভেঙে যেতে পারে।
প্রতিকূল আবহাওয়া: অতিরিক্ত শুষ্ক বা অতিরিক্ত আর্দ্র আবহাওয়া এবং তীব্র সূর্যের আলো বা ‘ইউভি’ রশ্মির দীর্ঘমেয়াদী সংস্পর্শ।
ভুল কসমেটিক ও বেশি পরিষ্কার করা: ক্ষারযুক্ত সাবান, তীব্র রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা এবং অতিরিক্ত স্ক্রাবিং বা ফেইসওয়াশ দিয়ে বারবার মুখ ধোয়া ক্ষতির কারণ হয়।
ত্বকের অ্যাসিড ম্যান্টল নষ্ট হওয়া: সুস্থ ত্বকের স্বাভাবিক পিএইচ বা ক্ষারীয় মাত্রা সাধারণত ৪.০ থেকে ৫.৮ এর মধ্যে থাকে, যা একটু অ্যাসিডিক। এই আস্তরণ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
ক্ষারীয় পরিষ্কারক ব্যবহার করলে এই ‘অ্যাসিড ম্যান্টল’ নষ্ট হয়ে যায়।
অভ্যন্তরীণ কারণ: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বার্ধক্য এবং বংশগত রোগ যেমন— একজিমা বা সোরিয়াসিস।
সুরক্ষাবলয় ভেঙে যাওয়ার প্রধান লক্ষণ
ত্বকের প্রাকৃতিক ঢাল ঠিকমতো কাজ না করলে বিভিন্ন চর্মরোগ ও উপসর্গ প্রকাশ পায়।
ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, খসখসে এবং মরা চামড়ার মতো খোসা উঠতে পারে।
ত্বকে অনবরত চুলকানি এবং লালচেভাব বা ‘ইনফ্লামেইশন’ অর্থাৎ প্রদাহ তৈরি হয়।
ব্যাকটেরিয়া সহজে প্রবেশ করার কারণে হঠাৎ করে অতিরিক্ত ব্রণ বা সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ফাঙ্গাস মানে ছত্রাক-জনিত বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।
ত্বকের রক্ষাকবচ মেরামত ও সুরক্ষার ৪ নিয়ম
ক্ষতিগ্রস্ত রক্ষাবলয় পুনরায় সচল ও মজবুত করতে চর্মরোগ চিকিৎসকেরা ৪টি নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দেন।
রূপচর্চার রুটিন সহজ করা: ত্বকের যত্নে ‘লেস ইজ মোর’ বা অল্প যত্নই কার্যকর সূত্র মেনে চলতে হবে।
অতিরিক্ত স্ক্রাব, ব্রাশ বা ‘কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েটর’ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ত্বক পরিষ্কার করার জন্য সর্বদা ৪.০ থেকে ৫.০ পিএইচ সমৃদ্ধ মৃদু ও কোমল ক্লিনজার ব্যবহার করা উচিত।
প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ তেলের ব্যবহার: ২০১৭ সালের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে যে, কিছু সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক তেল ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং সুরক্ষাবলয় মেরামতে সরাসরি সাহায্য করে।
এর মধ্যে জোজোবা অয়েল, নারিকেল তেল, কাঠবাদামের তেল এবং আর্গান অয়েল রয়েছে। এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ও প্রদাহরোধী হিসেবে কাজ করে।
তবে ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করে নেওয়া নিরাপদ।
সেরামাইড যুক্ত ক্রিম বেছে নেওয়া: ‘স্ট্র্যাটাম কর্নিয়াম’-এর সুস্থতায় ‘সেরামাইডস’ নামক উপাদান অপরিহার্য।
ত্বকের পণ্য সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাপানের ‘কাও কর্পোরেশন’-এর করা ২০১৮ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, সেরামাইড সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার বা সেরাম ব্যবহার করলে ত্বকের শুষ্কতা, চুলকানি এবং একজিমার তীব্রতা দ্রুত কমিয়ে সুরক্ষাপ্রাচীরকে পুনরায় শক্ত করে তোলে।
হিউমেক্ট্যান্ট ও অক্লুসিভ ময়েশ্চারাইজার: শুষ্ক ত্বক থেকে পানি উবে যাওয়া রোধ করতে ‘পেট্রোলাটাম’ যেমন- খাঁটি ভ্যাসলিন, বেশ কার্যকর, যা প্রায় ৯৯ শতাংশ পানি ধরে রাখতে পারে।
পাশাপাশি হিউমেক্ট্যান্ট উপাদান, যেমন হাইলুরোনিক অ্যাসিড, গ্লিসারিন এবং মধু সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত, যা বাতাস থেকে পানি শুষে নিয়ে ত্বককে দীর্ঘ সময় আর্দ্র ও শিশিরস্নাত রাখে।
