নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার
ত্বকের শুষ্কতা রোধে ব্যবহার করা যায় ওটস, মধু, শিয়া বাটার, অ্যালোভেরা বা দুধ।
শীতের আগেই ত্বকে ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করে।
বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ার কারণে ত্বকের স্বাভাবিক তেল ও জলীয় অংশ হারিয়ে খসখসে, প্রাণহীন ও শুষ্ক হয়ে পড়ে। এই সময়ে ত্বকের কোমলতা ধরে রাখতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
তবে বাজারচলতি হরেক রকম দামি কেমিকেলযুক্ত ক্রিম বা লোশনের বিকল্প হিসেবে রান্নাঘরের কিছু সাধারণ উপাদান ব্যবহার করে ঘরেই কার্যকর প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার তৈরি করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোতে অবস্থিত ‘আর্ট অব স্কিন এমডি’-এর প্রতিষ্ঠাতা, বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিজ্ঞানী এবং কসমেটিক সার্জন ডা. মেলানি পাম, সৌন্দর্য ও রূপচর্চা-বিষয়ক সাময়িকী ‘অ্যালুর’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ত্বকের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক স্তর বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ মেরামত নিয়ে বলেন, “ঐতিহ্যগত বা সাধারণ ময়েশ্চারাইজারগুলো যেখানে ত্বকে কেবল সাময়িক আর্দ্রতা জোগান দেয়, সেখানে প্রাকৃতিক উপাদানগুলো ত্বকের নিজস্ব স্তরকে ভেতর থেকে পুনর্গঠন ও মেরামত করে।”
ফলে ত্বক দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে এবং বাইরের পরিবেশের ক্ষতিকর ধুলাবালি বা ‘অ্যালার্জেন’ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান-বিষয়ক সাময়িকী ‘ওলিভা স্কিন ক্লিনিক জার্নাল’ এবং চর্মরোগ সংস্থা ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ডার্মাটোলজি’-র নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নির্দেশিকায় জানানো হয়, রান্নাঘরের উপাদান দিয়ে ৪টি সহজ প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার বা ‘হাইড্রেইটিং প্যাক’ তৈরি করা যায়।
মধু ও ওটমিলের আর্দ্রতা রক্ষাকারী প্যাক (শুষ্ক ও খসখসে ত্বকের জন্য)
‘ওলিভা ক্লিনিক জার্নাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, মধু হল একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক ‘হিউমেক্ট্যান্ট’ যা বাতাস থেকে পানি কণা টেনে ত্বকের গভীরে আটকে রাখতে পারে। অন্যদিকে ওটমিলে থাকা বিশেষ প্রদাহরোধী উপাদান শীতকালীন চুলকানি ও ত্বকের লালচেভাব দ্রুত উপশম করে।
তৈরির নিয়ম: ১ টেবিল-চামচ মিহি ওটমিল গুঁড়ার সঙ্গে ২ টেবিল-চামচ খাঁটি মধু এবং সামান্য কুসুম গরম পানি মিশিয়ে একটি ঘন পেস্ট তৈরি করতে হবে। মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর আলতো মালিশ করে ধুয়ে ফেলতে হবে।
এটি শুষ্ক মরা চামড়া দূর করে ত্বককে নরম ও উজ্জ্বল করে তোলে।
কাঁচা দুধ ও অ্যালোভেরা জেল (স্বাভাবিক ও তৈলাক্ত ত্বকের জন্য)
কাঁচা দুধে থাকে ‘ল্যাকটিক অ্যাসিড’, যা মৃদু এবং প্রাকৃতিক ‘আলফা-হাইড্রক্সি অ্যাসিড’। এটি ত্বকের কালচে ছোপ দূর করে। অ্যালোভেরা জেল ত্বককে চর্বিযুক্ত বা চিটচিটে না করেই গভীর জলীয় পুষ্টি বা ‘কুলিং ইফেক্ট’ জোগায়।
তৈরির নিয়ম: ২ টেবিল-চামচ তাজা অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে ১ টেবিল-চামচ কাঁচা দুধ খুব ভালো করে মিশিয়ে একটি তরল ময়েশ্চারাইজিং লোশন তৈরি করতে হবে।
রাতে ঘুমানোর আগে এটি তুলা দিয়ে মুখে মেখে ১৫ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেললে সকালে সুন্দর ও সতেজ ত্বক পাওয়া যায়।
গ্লিসারিন ও গোলাপ জলের সেরাম (সব ধরনের ত্বকের জন্য)
‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ডার্মাটোলজি (এএডি)’র চিকিৎসকদের মতে, শীতকালীন রূপচর্চায় গ্লিসারিনকে শক্তিশালী ময়েশ্চারাইজার বলা চলে।
এটি ত্বকের একদম বাইরের স্তর বা ‘স্ট্রাটাম কর্নিয়াম’কে আর্দ্রতা দেওয়ার পাশাপাশি চামড়া ফাটা ও রুক্ষতা রোধ করে। আর গোলাপ জল ত্বকের পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখে।
তৈরির নিয়ম: একটি পরিষ্কার কাচের বোতলে ১ ভাগ খাঁটি ভেজিটেবল গ্লিসারিনের সঙ্গে ৩ ভাগ গোলাপ জল এবং কয়েক ফোঁটা লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে ভালো করে ঝাঁকিয়ে নিতে হবে।
প্রতিবার মুখ ধোয়ার পর বা গোসলের ঠিক পর ত্বক যখন হালকা ভেজা থাকে, তখন এই ঘরোয়া সেরামের ৪-৫ ফোঁটা পুরো মুখে ও হাতে মেখে নিতে হবে।
নারিকেল তেল ও শিয়া বাটারের লোশন (অতিরিক্ত শুষ্ক হাত ও পায়ের জন্য)
‘এএডি’র ক্লিনিকাল নির্দেশকা অনুযায়ী, ‘কোল্ড-প্রেসড নারিকেল তেল’ এবং শিয়া বাটার হল প্রাকৃতিকভাবে এশেনশল ফ্যাটি অ্যাসিডম ও ভিটামিন ‘ই’-তে ভরপুর। যা হাত, পা ও গোড়ালির ফাটা চামড়া দ্রুত নিরাময় করে।
তৈরির নিয়ম: সমপরিমাণ নারিকেল তেল এবং শিয়া বাটার একটি পাত্রে নিয়ে হালকা গলিয়ে নিতে হবে।
মিশ্রণটি ঠান্ডা হলে চামচ দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে একটি ফুলকো ক্রিম তৈরি করে কৌটায় সংরক্ষণ করা যায়।
প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে হাত-পায়ে এই ‘বডি বাটার’ মালিশ করলে শীতের শুষ্কতা দূরে রাখা সম্ভব হয়।
বিশেষ সতর্কতা
ডা. মেলানি পাম, এক সাক্ষাৎকারে পাঠকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, “প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও অ্যালার্জির ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই মুখে লাগানোর আগে অবশ্যই কানের লতি বা হাতের ত্বকে একটি ছোট ‘প্যাচ টেস্ট’ করে নেওয়া বাধ্যতামূলক।”
এছাড়া ঘরে তৈরি ময়েশ্চারাইজারে কোনও ‘প্রিজারভেটিভ’ বা সংরক্ষক থাকে না বলে এগুলো একসঙ্গে বেশি পরিমাণে তৈরি করলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অল্প পরিমাণে তৈরি করে চার-পাঁচ দিনের মধ্যে ব্যবহার করে ফেলতে হবে।
