Published : 30 Nov 2025, 03:21 PM
শীত এসেছে মানেই বাজারে রঙিন সবজির ছড়াছড়ি— গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম, টমেটো, ব্রকলি, মূলা, ওলকপি, শিম, বিট, মটরশুঁটি— সব মিলিয়ে যেন এক উৎসব।
যেন শীতের সময় পুষ্টির ভাণ্ডার ভরাতে প্রকৃতি সবকিছু দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে।
শীতের শুষ্ক ও ঠাণ্ডা আবহাওয়াতে অনেকেই সর্দি-কাশিতে ভোগেন, ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে, শক্তি কমে যায়। তাই এ সময় প্রয়োজন বেশি পরিমাণ ভিটামিন–সি, ভিটামিন–এ, লৌহ, আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
আর এই সব পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় শীতের রঙিন সবজিগুলো থেকে।
শীতের সবজির রঙিন বৈচিত্র্য
ভিন্ন রংয়ের সবজি ভিন্ন পুষ্টির পরিচায়ক।
যেমন- কমলা রংয়ের গাজরে থাকে বিটা-ক্যারোটিন, গাঢ় সবুজ পালংশাকে থাকে লৌহ এবং ফোলেইট। আবার বেগুনি রংয়ের পাতাকপিতে থাকে অ্যান্থোসায়ানিন নামের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট- জানান বারডেম হাসপাতালের পুষ্টি বিভাগের সাবেক প্রধান ও পুষ্টি কর্মকর্তা আখতারুন নাহার আলো।
এই রঙিন সবজিগুলো একসঙ্গে খাদ্যতালিকায় থাকলে শরীর সহজেই প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুলো পূরণ করতে পারে। বিশেষ করে শীতে যেহেতু ঠাণ্ডাজনিত রোগ, শুষ্কতা ও ক্লান্তি বেড়ে যায়, তাই এসব সবজি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে দারুণ সহায়ক।
গাজর: চোখের স্বাস্থ্য ও ত্বকের বন্ধু
এই সবজির উজ্জ্বল কমলা রংয়ের মূল উৎস বিটা-ক্যারোটিন, যা শরীরে ভিটামিন–এ তে রূপান্তরিত হয়।

ভিটামিন–এ চোখের দৃষ্টি ভালো রাখে, ত্বককে রক্ষা করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
“শীতে ত্বক শুষ্ক হয়, তাই গাজর খেলে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে”- বলেন রূপবিশেষজ্ঞ ফারহানা রুমি।
যাদের রাতকানা সমস্যা আছে, দীর্ঘসময় স্ক্রিনে কাজ করেন বা শুষ্ক ত্বকের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য গাজর বিশেষভাবে উপকারী।
প্রতিদিন আধা কাপ সেদ্ধ গাজর বা একটি মাঝারি আকারের কাঁচা গাজর খাওয়া যথেষ্ট।
ফুলকপি ও ব্রকলি: ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক সবজি
ফুলকপি ও ব্রকলি দুটোই ‘ক্রুসিফেরাস ভেজিটেইবল’ ঘরানার অংশ, যেখানে পাওয়া যায় সালফোরাফেন নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

গবেষণায় দেখা যায়, এই উপাদান শরীরের ক্ষতিকর কোষের বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করে। এদের মধ্যে প্রচুর ভিটামিন–সি, ভিটামিন–কে, ক্যালসিয়াম ও আঁশ থাকে, যা হজম ভালো রাখে এবং হাড়–জোড় মজবুত করে।
ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে এসব সবজি বিশেষ উপযোগী।
প্রতিদিন আধা কাপ ভাপানো বা হালকা রান্না করা ফুলকপি বা ব্রকলি খেলে উপকার পাওয়া যায়।
পালংশাক: লৌহের শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
শীতের পালংশাকে থাকে লৌহ, ফোলেইট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন–এ এবং সি।

এই শাক রক্তস্বল্পতা কমাতে, ক্লান্তি দূর করতে এবং হাড় শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, যা শীতকালে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও যারা কম রক্তশূন্যতায় ভোগেন, তাদের খাদ্যতালিকায় পালংশাক থাকা জরুরি। প্রতিদিন এক কাপ রান্না করা শাকই যথেষ্ট।
বিট: রক্তশূন্যতা ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়

এর লাল রং আসে বিটালাইন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থেকে, যা শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করতে সহায়তা করে- জানান আখতারুন নাহার আলো।
এতে থাকে লৌহ একং ফলিক অ্যাসিড— এগুলো রক্তস্বল্পতার জন্য খুবই কার্যকর। বিট রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও ভালো কাজ করে।
যাদের ত্বক নির্জীব, রক্তের হিমোগ্লোবিন কম বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য বিট উপকারী। প্রতিদিন আধা কাপ ভাপানো বা সালাদে মেশানো বিটই যথেষ্ট।
টমেটো: ভিটামিন–সি এবং লাইকপিনের ভান্ডার
এই লাইকপিন ত্বক উজ্জ্বল করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং কোষকে সুরক্ষা দেয়।

এছাড়া টমেটো ভিটামিন–সি–সমৃদ্ধ, যা কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায় এবং ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে সহায়ক।
“যাদের ত্বক নির্জীব, রোদেপোড়া দাগ রয়েছে তাদের জন্য টমেটো খুব উপকারী বলেন” ফারহানা রুমি।
প্রতিদিন একটি মাঝারি টমেটো বা আধা কাপ রান্না করা টমেটো যথেষ্ট।
শিম ও মটরশুঁটি: শক্তির উৎস
শীতের শিম ও মটরশুটি প্রোটিন, আঁশ ও বি–ভিটামিনে ভরপুর। এগুলো দীর্ঘসময় পেট ভরা রাখে, রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শরীরকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তি দেয়।

যারা ওজন কমাতে চান, ডায়াবেটিস আছে বা জিমে ট্রেনিং করেন তাদের জন্য এসব সবজি বিশেষ উপকারী।
“প্রতিদিন আধা কাপ শিম বা মটরশুঁটি খাওয়া উপযোগী”- বলেন, পুষ্টি-বিশেষজ্ঞ আখতারুন নাহার আলো।
বাঁধাকপি ও লাল বাঁধাকপি: হজমশক্তি ও ত্বকের সুরক্ষা
ভিটামিন–সি, ক্যালসিয়াম ও আঁশ সমৃদ্ধ এই সবজি। হজমশক্তি বাড়ায়, গ্যাস্ট্রিক কমায় এবং লিভার বা যকৃতে জন্য উপকারী।

লাল বাঁধাকপিতে থাকে অ্যান্থোসায়ানিন, যা শরীরের প্রদাহ কমায় এবং ত্বককে বয়সের ছাপ থেকে রক্ষা করে।
যাদের গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ত্বকের বয়সের ছাপের সমস্যা আছে তাদের জন্য বাঁধাকপি খুব কার্যকর। প্রতিদিন আধা কাপ রান্না করা বাঁধাকপি নিরাপদ।
কাদের জন্য কোন সবজি বেশি উপকারী
প্রতিদিন কতটুকু সবজি খাওয়া উপকারী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম সবজি খাওয়া উচিত।
শীত-মৌসুমে সহজেই এই পরিমাণ পূরণ করা সম্ভব, কারণ মৌসুমি সবজি স্বাদেও ভালো এবং সহজপাচ্য।
তবে সকল সবজি একসঙ্গে না খেয়ে দিনে দুতিন বেলার খাবারে ভাগ করে খেলে শরীর সহজে পুষ্টি গ্রহণ করে।
অল্প তেল, কম মসলা দিয়ে রান্না করা সবজি বা ভাপে কিংবা সালাদে খাওয়া সবচেয়ে ভালো- পরামর্শ দেন আখতারুন নাহার আলো।
আরও পড়ুন