Published : 02 Nov 2025, 05:34 PM
রান্নাঘরে ক্যাপসিকাম এখন খুব পরিচিত নাম। সালাদ, ওমলেট, পাস্তা কিংবা সবজি ভাজি যেখানেই দেওয়া হোক- এর উজ্জ্বল রং আর হালকা ঝাল স্বাদ খাবারে আনে অন্যরকম আবেশ।
তবে এই রঙিন সবজি শুধু চোখে নয়, শরীরেও আনে উপকারের ছোঁয়া।
রং ও স্বাদে পার্থক্য
ক্যাপসিকামের চারটি প্রধান রং দেখা যায়- সবুজ, হলুদ, কমলা এবং লাল।
রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘নিউ ইয়র্ক সিটি’র পুষ্টি-পরামর্শক লরেন মিনচেন বলেন, “প্রতিটি রং আসলে একই গাছের বিভিন্ন পরিপক্ব অবস্থার ফল।”
সবুজ: সবচেয়ে আগে তোলা হয়। তাই এগুলো একটু তেতো ও ঘাসের মতো স্বাদযুক্ত।
হলুদ ও কমলা: মাঝামাঝি পাকা অবস্থা। তাই স্বাদে মিষ্টি এবং রংয়ে উজ্জ্বল।
লাল: সবচেয়ে শেষের পাকা অবস্থা। তাই এগুলো সবচেয়ে মিষ্টি এবং ফলের মতো স্বাদযুক্ত।
লাল ক্যাপসিকামে থাকে সবচেয়ে বেশি লাইকোপিন। যা এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। অন্যদিকে সবুজ ক্যাপসিকামে থাকে সবচেয়ে কম ভিটামিন সি।
তাই পুষ্টিগত দিক থেকে লাল ক্যাপসিকামকে সবচেয়ে উপকারী ধরা হয়।
হৃদপিণ্ড ও হজমের জন্য উপকারী
পুষ্টিবিদ লরেন মিনচেন জানান, ক্যাপসিকাম শরীরের স্বাভাবিক ‘ডিটক্স’ প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখে। এতে থাকা আঁশ, লৌহ ও ফোলেইট হৃদযন্ত্র ও হজমতন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখে।
প্রতি ১০০ গ্রাম ক্যাপসিকামে থাকে প্রায় ৬ গ্রাম কার্বোহাইড্রেইট এবং ২.১ গ্রাম আঁশ। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন সি শরীরে উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে পাওয়া লৌহ শোষণে সাহায্য করে।
মিনচেন আরও বলেন, “ক্যাপসিকাম দৈনিক প্রয়োজনীয় ফোলেইটের প্রায় ১৪ শতাংশ দেয়, যা গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে।”
পটাসিয়ামের ভাণ্ডার
নিউ ইয়র্ক সিটি’র আরেক পুষ্টিবিদ ব্রিজিট জিটলিন একই প্রতিবেদনে বলেন, “সব রংয়ের ক্যাপসিকামেই থাকে প্রচুর পটাসিয়াম এবং ভিটামিন এ।”
পটাসিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, হৃদপিণ্ডের কাজকে স্বাভাবিক করে এবং শরীরে অতিরিক্ত পানি জমা প্রতিরোধ করে।
তিনি আরও বলেন, “ক্যাপসিকাম খেলে পেট ফাঁপা বা ফুলে যাওয়ার প্রবণতা কমে। কারণ এটি শরীরের পানি ভারসাম্য রক্ষা করে।”
দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে
একটি মাঝারি আকারের লাল ক্যাপসিকামে থাকে প্রায় ২৩৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ, যা প্রাপ্তবয়স্ক নারীর দৈনিক চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ব্রিজিট জিটলিন বলেন, “ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখে। পাশাপাশি এটি ত্বক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্যও প্রয়োজনীয়।”
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাপসিকামে থাকা জিয়াক্সানথিন নামের ক্যারোটিনয়েডস বয়সজনিত দৃষ্টিশক্তি হ্রাস বা ‘ম্যাকুলার ডিজেনারেশন’ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
এই উপাদান মূলত কমলা ও লাল ক্যাপসিকামে বেশি থাকে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ
লাল ক্যাপসিকামে শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা চাপ কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
লরেন মিনচেন বলেন, “লাল ক্যাপসিকামে প্রচুর ভিটামিন সি এবং ক্যারোটিনয়েডস থাকে, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এগুলো চোখ, ত্বক ও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
একটি মাঝারি লাল ক্যাপসিকামে থাকে দৈনিক প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি-এর প্রায় ১৬৯ শতাংশ! অর্থাৎ এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
হলুদ ও কমলা ক্যাপসিকামেও আছে বিটা ক্যারোটিন, যা ত্বককে সূর্যালোক, দূষণ ও ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়।
ত্বকের বয়সরোধে ভূমিকা
কানেকটিকাটের উদ্ভিজ্জ খাদ্য বিশেষজ্ঞ এমি গরিন বলেন, “জাপানি নারীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ ও হলুদ ক্যাপসিকাম নিয়মিত খেলে চোখের কোণের সূক্ষ্ম বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে।”
ক্যাপসিকামে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এবং ক্যারোটিনয়েডস ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখে এবং বার্ধক্যের ছাপ কমায়। নিয়মিত ক্যাপসিকাম খেলে ত্বক আরও মসৃণ ও উজ্জ্বল হয়।
অতিরিক্ত খেলে ক্ষতিও হতে পারে
লরেন মিনচেন সতর্ক করে বলেন, “যে কোনো খাবারের মতো ক্যাপসিকামও সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। প্রতিদিন একটির বেশি খেলে শরীরে অন্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।”
তাছাড়া, ক্যাপসিকাম ‘নাইটশেইড’ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। যাদের এই শ্রেণির সবজিতে অসহিষ্ণুতা আছে, তারা বেশি পরিমাণে খেলে হজমে সমস্যা, গ্যাস বা প্রদাহ অনুভব করতে পারেন।
তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রতিদিন একটির বেশি ক্যাপসিকাম না খাওয়াই ভালো। যদি কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
আরও পড়ুন
রান্নার পদ্ধতিতে সবজির পুষ্টিগুণ থাকবে অটুট