Published : 19 Jul 2026, 08:38 AM
বিশ্বকাপ ফাইনালে অনেক তারকাই নিতে পারেননি চাপ, আবার কেউ অপ্রত্যাশিতভাবে উঠে আসেন পাদপ্রদীপের কেন্দ্রে। প্রতি বিশ্বকাপেই থাকে এমন কিছু গল্প। কেউ হয়ে ওঠেন নায়ক, আবার কেউ খলনায়ক।
১৯৩০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৩ বিশ্বকাপের ২১টিতে হয়েছে ফাইনাল। ১৯৫০ আসরে কোনো ফাইনাল ছিল না। এবারের আসরের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ হবে ২০ জুলাই বাংলাদেশ সময় ১টায় (এএম)।
কিছু ফাইনালে একক নৈপুণ্যে ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছেন কেউ কেউ। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালের আগে তেমন কিছু ম্যাচের কথাই তুলে ধরা হলো-

১৯৬৬: জিওফ হার্স্ট, ইংল্যান্ড
ইতিহাসের এই অধ্যায় শুরুর জন্য হ্যাটট্রিক করে দলকে বিশ্বকাপ জেতানো একমাত্র খেলোয়াড়ের চেয়ে ভালো কে আছে?
১৯৬৬ বিশ্বকাপের স্রেফ পাঁচ মাস আগে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা শুরু করেন জিওফ হার্স্ট। আন্তর্জাতিক ফুটবলে কেবল একটি গোলের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসর শুরু করেন তিনি। গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের শেষ ম্যাচে তারকা স্ট্রাইকার জিমি গ্রেভসের চোটে দুয়ার খুলে যায় তার জন্য। সেই সুযোগ কী দারুণভাবেই না কাজে লাগান তিনি!
কোয়ার্টার-ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচজয়ী গোল করেন। বিশ্বকাপে এটাই তার প্রথম গোল। পরে সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ ইতিহাসে পাকা করে নেন নিজের জায়গা।
ফাইনালের দিন হার্স্টের হ্যাটট্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তার শ্বশুর। হার্স্টের স্ত্রীকে বলেছিলেন সেই কথা। ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে তার ওই কথাই সত্য হয়। তিন গোলে ম্যাচের নায়ক এই স্ট্রাইকার অবশ্য নিজেকে নয়, অ্যালান বলকে ভাবেন ফাইনালের ম্যাচসেরা।
ফাইনালে হেলমুট হলারের গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। এর ১৮ মিনিট পর ওয়েস্ট হ্যাম সতীর্থ ববি মুরের ফ্রি কিক থেকে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান হার্স্ট। দুই ওয়েস্ট হ্যাম ফুটবলারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার গোলের পর ক্লাবটির আরেক ফুটবলার মার্টিন পিটার্স করেন দ্বিতীয় গোল। তাতে নির্ধারিত সময়ে ২-১ ব্যবধানে খেলা শেষ হওয়ার পথে ছিল।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের অন্তিম সময়ে সমতা ফেরায় জার্মানি আর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
ম্যাচের ১০১ মিনিটে হার্স্ট ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন। যেটাকে বিবেচনা করা হয় ফাইনালে সবচেয়ে বিতর্কিত গোল হিসেবে। হার্স্টের শট গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে ক্রসবারে লেগে নিচে পড়ে। তা লাইন পেরিয়ে গিয়েছিল কি-না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লাইন্সম্যান তৌফিক বাহরামোভের মতে বল গোললাইন পার হয়েছিল।
পরে অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে ফাঁকা জায়গায় মুরের পাস পেয়ে গোল করে নিশ্চিত করেন দলের জয় ও নিজের হ্যাটট্রিক। এই গোল নিয়ে হার্স্ট বলেন, “নিজের সবশক্তি দিয়ে বলে লাথি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”

১৯৭৮: মারিও কেম্পেস, আর্জেন্টিনা
ঘরের মাঠে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক লম্বা ও লিকলিকে গড়নের লম্বা কালো চুলের অধিকারী অদম্য মারিও কেম্পেস। লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রথম শিরোপা জয়ের ইতিহাসে তিনি অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। যেমনটা ছিল টুর্নামেন্ট জুড়ে তাদের স্বাগত জানাতে কাগজের কুচি বাতাসে উড়ানোর সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্য।
সেই সময়ের ২৩ বছর বয়সী কেম্পেস ক্লাব ফুটবলে খেলতেন স্পেনের ভালেন্সিয়ার হয়ে। টুর্নামেন্টের শুরুতে সুবিধা করতে পারেননি তিনি। প্রথম গ্রুপ পর্বে জালের দেখা পাননি তিনি। দ্বিতীয় পর্যায়ের গ্রুপ পর্বে পোল্যান্ড ও পেরুর বিপক্ষে দুই ম্যাচেই করেন জোড়া গোল। সঙ্গে স্বাগতিকরা নিশ্চিত করে ফাইনাল।
এরপর আসে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনাল। যা অনায়াসে যেতে পারত ডাচদের দিকে। তা হয়নি আর্জেন্টিনার ওই ১০ নম্বর জার্সিধারীর জন্য। প্রথমার্ধে তিনিই এগিয়ে নেন স্বাগতিকদের।
সমতা ফিরিয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। ১০৪তম মিনিটে নেদারল্যান্ডসের পেনাল্টি বক্সে আরও একবার দাপট দেখান কেম্পেস। দুটি চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে নেওয়া তার প্রথম শট ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক, পরে দুই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে ফিরতি শটে জাল খুঁজে নেন তিনি।
নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট আগে দানিয়েল বের্তোনির গোলে অবদান রাখেন কেম্পেস।

১৯৮২: মার্কো তারদেল্লি, ইতালি
মিলানের বিশ্ব-বিখ্যাত থিয়েটার লা স্কালায় হয়তো আপনি আনন্দের এমন চিত্রনাট্য খুঁজে পেতে হিমশিম খাবেন, যা ১৯৮২ আসরের ফাইনালে সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ইতালিকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেওয়ার পর দুই হাত ঝাঁকিয়ে গোল উদযাপন করতে করতে ছুটে চলা মার্কো তারদেল্লির মুখের হাসির সাথে তুলনীয় হতে পারে।
সান্তিয়াগো বের্নাবেউতে গুরুত্বপূর্ণ মিডফিল্ডার জানকার্লো আন্তোনিওনিকে ছাড়াই মাঠে নামে ইতালি। তার অনুপস্থিতিতে এগিয়ে আসেন তারদেল্লি। তার দারুণ পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ব্রায়ান গ্ল্যানভিল তার ‘দা স্টোরি অব দা ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ে বর্ণনা করেন, ‘মাঝমাঠের চালিকাশক্তি’ হিসেবে।
বক্সের অন্য প্রান্ত থেকে বাড়ানো বলে প্রথম স্পর্শে নিয়ন্ত্রণে নিলেন তারভেল্লি এবং চমৎকার ফিনিশিংয়ে খুঁজে নিলেন জাল। এর পরেই তৈরি হলো সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্য। উদযাপনে মেতে তিনি ছুটে চললেন, আর সেই মুহূর্তের তীব্র উচ্ছ্বাস তার মুখে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল।

১৯৯০: গিডো বুকভাল্ট, পশ্চিম জার্মানি
কোনো গোল না করেও হওয়া যায় ফাইনালের নায়ক। রোমে ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই নায়ক গিডো বুকভাল্ট। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা এই ডিফেন্ডার দিয়েগো মারাদোনাকে ম্যাচে আটকে রাখতে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
কার্ড সমস্যায় ফাইনালে শিরোপাধারী আর্জেন্টিনার হয়ে নামতে পারেননি গোলের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা ক্লাদিও কানিজিয়াসহ চার ফুটবলার। ব্রাজিল ও ইতালির বিপক্ষে গোল করে দলকে ফাইনালে নেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল কানিজিয়ার।
আর্জেন্টিনার হুমকি আরও কমিয়ে রাখার জন্য মারাদোনাকে কড়া পাহাড়ায় রাখার সিদ্ধান্ত নেন জার্মানি কোচ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। ডিফেন্ডারদের প্রতি তার বার্তা ছিল, “মারাদোনার কাছে যখন বল থাকবে, তখন চারজন খেলোয়াড় তাকে ঘিরে ধরবে।” তার এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন বুকভাল্ট। পুরোটা সময় মারাদোনাকে ‘ম্যান-মার্কিং’ করে রেখেছিলেন তিনি।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে একই কাজ করার চেষ্টায় ছিলেন লোথার মাথাউস। তবে, স্রেফ একবার তাকে ফাঁকি দেন মারোদানো। আর্জেন্টিনাকে জয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে ওই একটা মুহূর্তই কেবল তার প্রয়োজন ছিল। ১৯৯০ আসরের ফাইনালে সেই সুযোগ পাননি মারাদোনা। তাতে আর্জেন্টিনার কেউ সেদিন লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি।

২০০২: রোনালদো, ব্রাজিল
১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে দল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় রোনালদোকে। সেই ম্যাচে হারের পর ২০০২ সালে ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার দ্বিতীয় সুযোগ কাজে লাগাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। সেমি-ফাইনালে তুরস্কের বিপক্ষে জয়সূচক গোলের পর ফাইনালে ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ইয়োকোহামা ইন্টারন্যাশন্যাল স্টেডিয়ামে তিনি করেন জোড়া গোল।
বিশ্বকাপে সেবার দারুণ ছন্দে ছিলেন জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান। তবে ফাইনালে জাল অক্ষত রাখতে পারেননি তিনি। রিভালদোর শট ঠিকঠাক ফেরাতে পারেননি তিনি, আলগা বল পেয়ে জাল খুঁজে নেন রোনালদো। ১২ মিনিট পর, আরও এক গোল করে স্কোরলাইন করেন ২-০।
ক্লেবারসনের দেওয়া পাস রিভালদো ছেড়ে দিলে সোজাসুজি পেয়ে যান রোনালদো। বলটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচু শটে কানকে পরাস্ত করে নিশ্চিত করেন ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা। সঙ্গে ৮ গোল করে জেতেন গোল্ডেন বুট।

২০১৪: মারিও গোৎজে, জার্মানি
মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভিষেকের পর, ২০১১ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১৯ বছর ৬৮ দিন বয়সে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন মারিও গোৎজে। দারুণ খেলতে থাকা এই ফুটবলার ছিলেন ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির স্কোয়াডে।
শুরুটাও করেন দারুণ। দলের প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে আদায় করেন পেনাল্টি, দ্বিতীয় ম্যাচে ঘানার বিপক্ষে করেন এক গোল।
এমন দারুণ শুরুর পরও সেমি-ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে পুরোটা সময় বেঞ্চে ছিলেন গোৎজে। ফাইনালেও শুরুর একাদশে পাননি জায়গা। তবে, ৮৮ মিনিটে মিরোস্লাভ ক্লোসার বদলি নেমে ১১৩ মিনিটে করেন ফাইনালের একমাত্র গোলটি।
আন্দ্রে শুরলের করা ক্রস বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দারুণ এক ভলিতে বল জালে পাঠান।
এই দারুণ গোলের পরও কখনও বিশ্বকাপে জার্মানির কোনো ম্যাচের শুরুর একাদশে ছিলেন না গোৎজে। ৮ বছরের বিরতির পর খেলেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। বদলি হিসেবে দুই ম্যাচে মাঠে নামেন তিনি।