১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সালভাদর দালি: মোচড়ানো গোঁফের আড়ালে ফুটবল প্রীতি

তার একটি চিত্রকর্ম বাঁচিয়ে দিয়েছিল হারিয়ে যেতে বসা ফুটবল ক্লাবকে।

সালভাদর দালি: মোচড়ানো গোঁফের আড়ালে ফুটবল প্রীতি
সালভাদর দালি (১৯০৪-১৯৮৯)

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Jul 2026, 02:07 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:41 PM

স্পেন তথা গোটা বিশ্বের শিল্পকলার ইতিহাসে সালভাদর দালি এক অবিস্মরণীয় নাম। পরাবাস্তববাদী বা সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এই পুরোধা ব্যক্তিত্বের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অদ্ভুত সব গলে যাওয়া ঘড়ি, উটের মতো লম্বা পা-ওয়ালা হাতি, কিংবা অদ্ভুত কায়দায় মোচড়ানো তার সেই বিখ্যাত গোঁফ। 

দালি মানেই ছিল খামখেয়ালিপনা, অহংকার আর অনন্য প্রতিভার মিশ্রণ। কিন্তু ক্যানভাসের বাইরে, তুলি-রঙের জগতের সমান্তরালে এই বিশ্বখ্যাত শিল্পীর জীবনে একটা অন্যরকম ভালোলাগার জায়গা ছিল, আর সেটি হলো ফুটবল। দালির জীবনে এই খেলাটি জড়িয়ে ছিল তার শৈশব থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত। ফুটবলের মাঠে পরাবাস্তববাদের খোঁজ তিনি পেয়েছিলেন খুব অল্প বয়সেই।

১৯০৪ সালের ১১ মে স্পেনের কাতালুনিয়ার ফিগুয়েরাস শহরে জন্ম নেন দালি। পুরো নাম সালভাদর দালি ই দোমেনেচ। দালির শৈশব আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না। জন্মের মাত্র ৯ মাস আগে তার এক বড় ভাই মারা যান, যার নামও ছিল সালভাদর। বাবা-মা দালির মাঝে সেই প্রয়াত ভাইয়ের ছায়াই দেখতেন, যা দালির মনে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। ছোটবেলা থেকেই একটু অদ্ভুত প্রকৃতির আর জেদি স্বভাবের ছিলেন তিনি। 

তবে ফুটবল খেলার প্রতি তার টান ছিল। কাতালুনিয়ার সমুদ্রসৈকতের অবকাশযাপন কেন্দ্র কাদাকেসে ছুটির দিনগুলোতে দালি তার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, দালির সেই শৈশবের বন্ধুদের মধ্যে দু’জন ছিলেন ভবিষ্যতের ফুটবল দুনিয়ার মহাতারকা। তারা হলেন এমিলিও সাগি বার্বা এবং জোসেপ সামিতিয়ার, যারা পরবর্তীতে স্পেনের বিখ্যাত ক্লাব এফসি বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। সাগি বার্বা বার্সার হয়ে ৪৫৫টি ম্যাচ খেলেন এবং জোসেপ সামিতিয়ার ৩২৬টি গোল করে ক্লাবের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লেখান।\

সালভাদর দালি (১৯০৪-১৯৮৯) তার শিল্পকর্মে ফুটবলকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

সালভাদর দালি (১৯০৪-১৯৮৯) তার শিল্পকর্মে ফুটবলকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

এমন সব প্রতিভাবান বন্ধুদের সঙ্গে যখন দালি খেলতে নামতেন, তখন তিনি মাঠে নিজের একটা আলাদা জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সমকালীন ফুটবলারদের মতো দালি মাঠজুড়ে দৌড়াতে খুব একটা পছন্দ করতেন না কিংবা বলা চলে পায়ে বলের জাদু দেখানোর মতো দক্ষতা তার ছিল না। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন গোলপোস্টের নিচের সেই নিঃসঙ্গ স্থানটি, অর্থাৎ গোলরক্ষকের ভূমিকা। 

দালি মনে করতেন, ফুটবল মাঠের গোলরক্ষক হলো অদ্ভুত এক চরিত্র, যে সবার থেকে আলাদা, যে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই করে গোল বাঁচায়, আর স্টেডিয়ামের হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর উল্লাসের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। সেই সময়কার কিংবদন্তি স্প্যানিশ গোলরক্ষক রিকার্দো জামোরার স্টাইল দালিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। বন্ধুদের ফুটবল খেলার সেই দিনগুলোতেই দালির মনে অবচেতনভাবেই হয়তো আঁকা হয়ে যাচ্ছিল ফুটবলের নানা রূপ।

১৯২০-এর দশকে দালির প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চা শুরু হয় মাদ্রিদের সান ফার্নান্দো অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ। সেখানে তিনি সমকালীন স্প্যানিশ সাহিত্যের দিকপাল ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা লুইস বুনুয়েলের সান্নিধ্যে আসেন। এই সময় থেকেই তার ছবিতে পরাবাস্তববাদের ছোঁয়া স্পষ্ট হতে শুরু করে। তবে শিল্পের খাতিরে ফুটবলকে তিনি কখনো পুরোপুরি ভুলে যাননি। ১৯১৯ সালে যখন তার নিজ শহরের ক্লাব ‘আর্নিও এস্পোর্তিভা ফিগুয়েরাস’ গঠিত হয়, তখন দালি সেখানে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন না ঠিকই, তবে তার প্রথম দিকের কিছু চিত্রকর্মে ফুটবলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। 

১৯২১ সালে তার বন্ধু হোয়ান তোরেসের একটি প্রতিকৃতি আঁকেন তিনি, যেখানে বন্ধুর কোটের কলারে ফিগুয়েরাস ক্লাবের লোগো বা ব্যাজটি স্পষ্ট দেখা যায়। এছাড়া তার আরেক বন্ধু হাউমে মিরাভিতলেসের ফুটবল পোশাক পরা একটি পূর্ণাঙ্গ ছবিও তিনি এঁকেছিলেন, যা দালির প্রারম্ভিক জীবনের অন্যতম ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কাজ।

পরবর্তীতে ১৯৩০ এবং ৪০-এর দশকে দালির খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৯ সালে প্যারিসে সুররিয়ালিস্ট গ্রুপে যোগ দেওয়ার পর তার তৈরি ‘দ্য পারসিস্টেন্স অব মেমোরি’ (গলিত ঘড়ির ছবি) শিল্পকর্মটি তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়। দালি নিজেকে বিশ্ববাসীর কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করতে ভালোবাসতেন যাতে সবাই তার কাজের গভীরতা এবং খামখেয়ালিপনা দুটো নিয়েই আলোচনা করে। তিনি বলতেন, “পাগল আর আমার মধ্যে একটাই পার্থক্য। পাগল ভাবে সে সুস্থ, আর আমি জানি যে আমি উন্মাদ।” 

১৯৭৪ সালে দালি উপহার দেন ‘ট্রিবিউট টু এফসি বার্সেলোনা’ নামের একটি লিথোগ্রাফ ও এচিং শিল্পকর্ম।

১৯৭৪ সালে দালি উপহার দেন ‘ট্রিবিউট টু এফসি বার্সেলোনা’ নামের একটি লিথোগ্রাফ ও এচিং শিল্পকর্ম।

এই উন্মাদনার ছোঁয়া তিনি খেলাধুলার জগতেও নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৬৮ সালে যখন মেক্সিকো অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল, তখন স্প্যানিশ অলিম্পিক দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ পেয়ে তিনি ‘দ্য কসমিক অ্যাথলেট’ নামে একটি ছবি আঁকেন। সেখানে গ্রিক ভাস্কর্য ডিসকোবোলোসের আদলে এক বিশালকায় অলিম্পিক ক্রীড়াবিদকে ফুটিয়ে তোলেন, যার এক হাতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সূর্য বন্দি। খেলাধুলাকে দালি মানব সভ্যতার এক আদিম এবং মহাজাগতিক আবেগ হিসেবে দেখতেন।

ফুটবলের সঙ্গে দালির পরবর্তী বড় সংযোগটি ঘটে ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে। সেসময় স্পেনের অন্যতম জনপ্রিয় ক্লাব এফসি বার্সেলোনা তাদের প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন করছিল। এই উপলক্ষ্যে কাতালুনিয়ার বিশিষ্ট শিল্পীদের কাছ থেকে বিশেষ শিল্পকর্মের অনুরোধ করা হয়। হুয়ান মিরোর মতো শিল্পী খুব সানন্দে বার্সার জন্য ছবি আঁকলেও, দালির ক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। দালি রাজনৈতিকভাবে স্পেনের তৎকালীন স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সমর্থক ছিলেন, যার ফলে বার্সেলোনার তীব্র কাতালান জাতীয়তাবাদী আবেগের সঙ্গে তার কিছুটা দূরত্ব ছিল। তবে ক্লাবের কর্মকর্তাদের নাছোড়বান্দা অনুরোধ এবং বড় অঙ্কের পারিশ্রমিকের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন। 

১৯৭৪ সালে দালি উপহার দেন ‘ট্রিবিউট টু এফসি বার্সেলোনা’ নামের একটি লিথোগ্রাফ ও এচিং শিল্পকর্ম। যদিও দালি প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সামনে বার্সার স্কার্ফ গলায় জড়িয়ে ছবি তুলেছিলেন, তবুও আড়ালে কৌতুক করে বলেছিলেন যে তিনি ফুটবলের তৎকালীন তারকা জোহান ক্রুইফ সম্পর্কে কিছুই জানেন না! ফুটবলকে কেন্দ্র করে দালির এই কাজের পেছনে হয়তো গভীর ভালোবাসা যতটা না ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ব্যবসায়িক ও প্রচারণামূলক কৌশল।

তবে দালির ফুটবল প্রেমের সবচেয়ে মানবিক এবং হৃদয়স্পর্শী উদাহরণটি তৈরি হয়েছিল ১৯৭৭ সালে, যা বার্সেলোনার মতো কোনো বড় ক্লাব নয়, বরং কাতালুনিয়ার একটি সাধারণ মানুষের ছোট ক্লাবকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল। ক্লাবটির নাম ‘ইউই সান্ত আন্দ্রেউ’। সত্তরের দশকে স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগে টানা আট বছর খেলার পর ক্লাবটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। ১৯৭৭ সালের গ্রীষ্মকালে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ রূপ নেয় যে ক্লাবের সভাপতিসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ পদত্যাগ করে। ক্লাবের দেনা শোধ করার মতো কোনো অর্থ ছিল না এবং খেলোয়াড়দের বেতনও বাকি পড়ে গিয়েছিল। 

দালি সেই সংকটের মুহূর্তে ক্লাবটিকে বাঁচাতে একটি ছবি এঁকে দেন, যার নাম রাখা হয় ‘গোল!’।

দালি সেই সংকটের মুহূর্তে ক্লাবটিকে বাঁচাতে একটি

ক্লাবটি যখন বিলুপ্তির পথে, তখন ক্লাবের সহ-সভাপতি ফেলিক্স রোমেরো একটা পরিকল্পনা করেন। তিনি সালভাদর দালির কাছে সাহায্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সান্ত আন্দ্রেউ ক্লাবের একজন সমর্থক তথা পেশাদার ফটোগ্রাফার মানেল মোর ছিলেন দালির ব্যক্তিগত পরিচিত। তার মাধ্যমেই বার্তা পাঠানো হয় দালির কাছে।

সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছিল, ঠিক তখন ১৯৭৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দালি নিজেই ফেলিক্স রোমেরোকে বার্সেলোনার বিলাসবহুল রিৎজ হোটেলে ডেকে পাঠান। সেখানে দালি তার চিরচেনা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলেন, “আজ সকালে যখন আমি বাথরুমে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার মাথায় অনুপ্রেরণা এলো। আজ কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসন সরকার তার অধিকার ফিরে পেয়েছে। সরকার কাতালুনিয়ার জন্য একটি গোল করেছে, আর আমি একটি গোল করব সান্ত আন্দ্রেউয়ের জন্য।” দালি সেই সংকটের মুহূর্তে ক্লাবটিকে বাঁচাতে একটি ছবি এঁকে দেন, যার নাম রাখা হয় ‘গোল!’।

১৯৭৭ সালের ১১ অক্টোবর দালির নিজস্ব জাদুঘরে এই ছবিটির উন্মোচন করা হয় এবং পরদিন সান্ত আন্দ্রেউ ক্লাবের স্টেডিয়ামে সাধারণ দর্শকদের জন্য প্রদর্শন করা হয়। চিত্রকর্মটি তৎকালীন সময়ে প্রায় ৪০ লাখ পেসেতাসে (যা বর্তমান সময়ে প্রায় ২৫ হাজার ইউরোর সমতুল্য) বিক্রি করা হয়। সেই যুগে এই অর্থটি একটি ছোট ক্লাবের জন্য ছিল বিশাল ভাগ্য। এই বিক্রির টাকা থেকে ১০ লাখ পেসেতাস সরাসরি খেলোয়াড়দের বকেয়া বেতন মেটানোর জন্য দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা দিয়ে ক্লাবের সমস্ত ঋণ শোধ করে সেটিকে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা হয়। 

সালভাদর দালির এই একটি মাত্র চিত্রকর্ম সান্ত আন্দ্রেউ ক্লাবটিকে স্প্যানিশ ফুটবলের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। আজ অবধি কাতালান ফুটবলে সান্ত আন্দ্রেউ ক্লাবটি স্থানীয় গর্বের প্রতীক হয়ে টিকে আছে, আর ভক্তরা শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তাদের বাঁচিয়ে দেওয়া সেই পরাবাস্তববাদী ত্রাণকর্তাকে।

১৯৮৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ৮৪ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ফিগুয়েরাস শহরেই এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে শিল্প আর জীবন মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। দালির জীবনে ফুটবল অধ্যায়টি তার আঁকা ক্যানভাসের মতোই রঙিন, বৈচিত্র্যময় এবং চিরকাল স্মরণীয়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, মিডিয়াম ডটকম।