Published : 19 Jul 2026, 10:19 PM
ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ঢাকার মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালের বাতিল হওয়া লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়া হবে কি না, এ সপ্তাহেই সে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী হাসপাতালের সংস্কার করার কথা জানিয়ে লাইসেন্স ফিরে পেতে গত ২৪ জুন আপিল করেছিল আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ। সেই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালটি পরিদর্শন করে।
প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ। সোমবারের মধ্যে পরিদর্শন প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন লাইসেন্সের বিষয়ে এ সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার উপপরিচালক এবং প্রতিনিধি দলের সদস্য ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বলেন, “আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে ওই হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখেছি। আগামীকাল প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে, তার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না। লাইসেন্স ফেরত দেবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।”
তবে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুসারে তারা হাসপাতালের প্রয়োজনীয় ‘সংস্কার’ করেছেন। লাইসেন্স ফিরে পাওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী।
কোরবানির ঈদের আগের দিন ২৭ মে ভোরে ওই হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতক মারা যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সে সময় বলেছিল, ঘটনার সময় ওই ওয়ার্ডে ১১ জন মা ও ৬ নবজাতক ভর্তি ছিলেন। রাতে কিছু সময় এসি বন্ধ রাখার পর পুনরায় চালু করা হলে কয়েকজন নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ৬ নবজাতকেরই মৃত্যু হয়। পরিবারের আবেদনের পর ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার কথা বলে।
এর আগে ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এক সংবাদ সম্মেলনে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের কথা জানান।
তিনি সেদিন বলেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ৪ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় অধিদপ্তর। কিন্তু নোটিসের যে জবাব ও ব্যাখ্যা আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষের দিয়েছে, তা সন্তোষজনক না হওয়ায় মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিনেন্স অনুযায়ী হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
ওই অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে এর বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ ছিল। সে অনুযায়ী ২৪ জুন আপিল করে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ।
আদ-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আপিলের ফল কী আসে তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে অনেকের।
গত ১৩ জুন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, লাইসেন্স বাঁচাতে হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ টাকা নিয়ে তার পেছনে ঘুরেছে।
তিনি বলেন, “এই যে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে আমার পেছনে; আল্লাহর রহমতে আপনাদের দোয়ায় কোনো টাকার প্রতি লোভ হয় নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আপনি যা করবেন, আমি পূর্ণ সমর্থন দেব। আমি লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছি।”
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের দুদিন পর ১৫ জুন সংবাদ সম্মেলনে এসে অভিযোগ নাকচ করেন আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন।
তিনি বলেছেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদি দাবি করে থাকেন, আদ-দ্বীন হাসপাতাল তার পেছনে কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে, তাহলে সেই অভিযোগের প্রমাণ তাকেই দিতে হবে।”
হাসপাতালটির লাইসেন্স বিষয়ে গত ১৩ জুলাই আবার কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন। পরিদর্শনে সন্তোষজনক অগ্রগতি পাওয়া গেলে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।”
হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসছে কিনা–সেই প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেদিন বলেন, “ছয়টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে সমালোচনার মুখে পড়তে হত। তাই ঘটনার পরই সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের আইসিইউসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত ত্রুটি দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং কর্তৃপক্ষ সেগুলো সংস্কারের কাজ করছে বলে জানিয়েছে।”
তার ভাষ্য, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনো হাসপাতালটিকে কোনো চূড়ান্ত ছাড় দেয়নি। পুনরায় পরিদর্শনের পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এদিকে লাইসেন্স ফিরে পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, “আমরা হাসপাতালের আমূল সংস্কার করেছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি দল হাসপাতাল পরির্দশন করেছে। আশা করি, তাদের প্রতিবেদন জমার পরই আমরা ইতিবাচক ফলাফল জানতে পারব।’’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কমিটির প্রতিবেদন পেলেই আমরা একটি সভা করব। তারপর ওই হাসপাতালের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জানান হবে।”
আরও পড়ুন
লাইসেন্স ফেরত চায় আদ-দ্বীন হাসপাতাল, পরিদর্শনে যাবেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা