২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮ কার্তিক ১৪৩৩

আম খেলে কি মোটা হয়?

কীভাবে কখন খাওয়া হচ্ছে- সেটার ওপর নির্ভর করবে চর্বি জমবে নাকি খরচ হবে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 May 2026, 05:38 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:36 PM

বাজারে আমের মৌসুম শুরু হতে না হতেই পরিচিত একটি দৃশ্য দেখা যায়। কেউ থালা ভরে আম কাটছেন, পাশে বসে আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন— খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ওজন বাড়ার ভয়ে খাচ্ছেন না।

‘ডায়েট’ করছেন এমন মানুষদের কাছে আম যেন এক নিষিদ্ধ ফল।

তবে এই ভয়টা কতটা বাস্তব? আম কি আসলেই ওজন বাড়ায়? নাকি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি ভুল ধারণাই আমাদের এই সুস্বাদু ফল থেকে দূরে রাখছে?

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “আমকে অনেকেই শুধু 'মিষ্টি ফল' হিসেবে দেখেন। আসলে এটি একটি পুষ্টিকর ফল, যেখানে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, আঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পটাসিয়াম।”

এই উপাদানগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বক ভালো রাখে এবং হজমে সাহায্য করে।

 মিষ্টি মানেই মোটা— এই ধারণাটাই আসলে ভুল

আম নিয়ে ভয়ের মূল কারণ খুঁজতে গেলে একটা জায়গায়ই বারবার আসতে হয়, সেটা হল এর মিষ্টি স্বাদ।

অনেকের মাথায় একটা সহজ সমীকরণ গেঁথে আছে- মিষ্টি মানেই চিনি, চিনি মানেই ‘ফ্যাট’, ‘ফ্যাট’ মানেই মোটা।

তবে বিজ্ঞান বলছে, এই সমীকরণ অতিসরলীকৃত এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুল। সব মিষ্টি খাবার সমানভাবে ক্ষতিকর নয়।

বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে পরিমিত ও সঠিক নিয়মে আম খেলে বরং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশকের আম সংক্রান্ত পুষ্টিবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করে।

‘ফুড অ্যান্ড ফাংশন জার্নাল’য়ে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়, আম ক্ষুধা কমিয়ে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। যারা নিয়মিত আম খেয়েছেন, তাদের ওজন বাড়েনি বরং রক্তে শর্করার ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করেছে।

সান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটি, ২০২২ সালে পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক গবেষণার জন্য স্থূলতায় ভুগছেন এমন কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে দুটি দলে ভাগ করে। এক দলকে প্রতিদিন ১০০ ক্যালরি সমপরিমাণ তাজা আম এবং অন্য দলকে সমান ক্যালরির কম চর্বিযুক্ত কুকিজ বা বিস্কুট ১২ সপ্তাহ ধরে খেতে দেওয়া হয়।

ফলাফলে দেখা গেছে, যারা আম খেয়েছিলেন তাদের শরীরের ওজন বা চর্বির কোনো বৃদ্ধি ঘটেনি। উল্টো তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা এবং শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমেছে। অপরদিকে, কুকিজ খাওয়া অংশগ্রহণকারীদের ওজন এবং ট্রাইগ্লিসারাইড বৃদ্ধি পেয়েছিল।

একটি মাঝারি আকারের আমে প্রায় ৯০ থেকে ১৩০ ক্যালোরি থাকে। সেই তুলনায় একটি চকলেট বার বা এক গ্লাস কোলা বা কোমল পানীয়তে থাকে অনেক বেশি।

আম কি ওজন বাড়ায়?

ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “শুধু আম খেলে সরাসরি ওজন বাড়ে না। ওজন বাড়া বা কমা নির্ভর করে সারা দিনে মোট কতটুকু ক্যালোরি গ্রহণ করলেন এবং শরীর কতটুকু খরচ করল— সেটার ওপর। শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করলে ওজন বাড়বেই— সেটা আম হোক, ভাত হোক বা অন্য যে কোনো খাবার।”

আমে ক্যালোরি আছে, এটা সত্যি। তাই অতিরিক্ত খেলে তা শরীরে চর্বি হিসেবে জমতে পারে। তবে পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি ওজন বাড়ানোর কোনো কারণ নয়।

সমস্যা হয় তখন, যখন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির পুষ্টিবিজ্ঞানীদের তথ্যানুসারে এই চিকিৎসক জানান, একসঙ্গে তিন-চারটি আম খাওয়া, দুধ বা চিনি মিশিয়ে আমের মিষ্টি বা ম্যাঙ্গো শেইক বা আমের জুস বোতলে বোতলে পান করা— এই অভ্যাসগুলো ক্যালোরি একলাফে অনেক বাড়িয়ে দেয়। তখনই ওজন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এছাড়া, দুপুরে বা রাতে পেট ভরে ভাত-রুটি খাওয়ার পর অতিরিক্ত হিসেবে দুতিনটি আম খেলে শরীরে ক্যালরি উদ্বৃত্ত হয়। এই বাড়তি ক্যালরিই চর্বি হিসেবে জমা হয়।

 ডায়েটে থাকলেও আম খাওয়া যায়, শর্ত একটাই

অনেকে ভাবেন, ডায়েটে থাকলে আম একদম বাদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারণা ভুল। অনেক পুষ্টিকর ডায়েট পরিকল্পনাতেও ফল হিসেবে আম রাখা হয়। শর্ত শুধু একটাই, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দিনে একটি মাঝারি বা অর্ধেক বড় আম খেতে পারেন, যদি বাকি খাবার ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।

ডা. নয়ন বলেন, “আমের জুস নয়, আস্ত ফল খেতে হবে। কারণ জুসে আঁশ থাকে না, ক্যালোরি বেশি থাকে। মিষ্টি বা ভারী খাবারের সঙ্গে আম না মেশানোই ভালো।”

 কখন খাবেন, কখন খাবেন না

আম খাওয়ার সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। সকালের নাস্তার পর, দুপুরের খাবারের পর হালকা ডেজার্ট বা মিষ্টান্ন হিসেবে বা বিকেলের নাস্তায় আম খাওয়া ভালো। এই সময়গুলোতে শরীর সক্রিয় থাকে, ক্যালোরি খরচ হয়।

রাতে ঘুমানোর আগে আম এড়িয়ে চলতে হবে। রাতে শরীরের ক্যালোরি খরচ কম থাকে, তাই তখন বাড়তি শর্করা শরীরে জমে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

“ডায়াবেটিস রোগীদের একটু বাড়তি সতর্কতা দরকার। আমে প্রাকৃতিক ফ্রুকটোজ থাকায় রক্তে শর্করা বাড়তে পারে। তবে সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরিমাণ ঠিক করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ”- বলেন এই চিকিৎসক।

শুধু ওজনের হিসাব করতে গিয়ে আমের যে অসাধারণ পুষ্টিগুণ, সেটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। আমে থাকা ‘ভিটামিন এ’ চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, ‘ভিটামিন সি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, আঁশ হজমশক্তি উন্নত করে।

ত্বক উজ্জ্বল হয়, শরীরে শক্তি আসে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়।