Published : 23 Nov 2025, 05:03 PM
২১ নভেম্বর শুক্রবার সকালে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীসহ সারা দেশে অনেকের বাড়িতে ফাটল দেখা গেছে। এই ঘটনা অনেককে আতঙ্কিত করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফাটলের কারণ বুঝে সঠিক পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী এবং ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের লেকচারার মো. রাকিব হাসান এ বিষয়ে জানিয়েছেন বিস্তারিত।
ফাটল ধরার সম্ভাব্য কারণসমূহ
ভূমিকম্পে বাড়িতে ফাটল দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।
এই বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে নিম্নলিখিত উপাদানগুলোর ওপর-
বাড়ির বয়স: পুরানো কাঠামোতে ভূমিকম্পের কম্পন সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে। ফলে সামান্য কম্পনেও ফাটল দেখা দিতে পারে।
নির্মাণের মান: নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করলে দুর্বলতা বাড়ে। যেমন- অপর্যাপ্ত সিমেন্ট বা রডের ব্যবহার কাঠামোকে দুর্বল করে।
ফাউন্ডেশনের শক্তি: মাটিতে ভিত্তি দুর্বল থাকলে ভূমিকম্পে বাড়ি বেশি দোলে, যা ফাটলের কারণ হয়।
ভূমিকম্পের মাত্রা ও কেন্দ্রস্থল: কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি হলে কম্পন তীব্র হয়।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী এই ভূমিকম্পকে ‘ফোরশক’ বা বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, “১৮৯৭ সালের ৮.১ মাত্রার ভূমিকম্পের পর এ অঞ্চলে বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে গবেষণায় বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা দেখা যাচ্ছে। এটি ২০০ থেকে ৩০০ বছরের চক্রে ঘটে।”
ফাটলের ধরনসমূহ
ভূমিকম্পে সৃষ্ট ফাটল দুই ধরনের হতে পারে, যা ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে:-
চুলের মতো ক্ষুদ্র ফাটল (হেয়ারলাইন ক্র্যাক): এগুলো সাধারণত প্লাস্টারে দেখা যায় এবং গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করে না। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, যাতে এগুলো বড় না হয়।
কাঠামোগত ফাটল: এতে দেয়াল, পিলার বা বিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের ফাটল বিপজ্জনক এবং অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ পরিদর্শন দরকার।
ফাটল দেখা দিলে করণীয়
রাকিব হাসান বলেন, “ভূমিকম্পের পর ফাটল দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করুন।”
আর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে-
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: বড় ফাটল থাকলে ভবন সাময়িকভাবে খালি করুন। গ্যাস লাইন, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পানির পাইপ পরীক্ষা করুন, যাতে অতিরিক্ত ঝুঁকি না হয়।
বিশেষজ্ঞের সহায়তা: ‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার’ বা কাঠামোগত প্রকৌশলী দিয়ে ফাটল পরিদর্শন করান। প্রয়োজনে রেট্রোফিটিং বা শক্তিবৃদ্ধির প্রস্তাব নিন।
বিল্ডিং ডিজাইনারের পরামর্শ নিন। যদি সেই বিল্ডিং ডিজাইনারের সঙ্গে যোগাযোগ না হয়, তাহলে ভবনের ডিজাইনের কাগজপত্র নিয়ে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনারের কাছে যান। তাদের পরামর্শ নিন।
ক্ষুদ্র ফাটলের জন্য সাধারণ প্লাস্টার মেরামত যথেষ্ট। কাঠামোগত ফাটলে স্টিল জ্যাকেটিং বা ফ্রেম স্ট্রেংথেনিং-এর মতো উন্নত পদ্ধতি প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো: গুরুতর ক্ষতি হলে স্থানীয় প্রশাসন, রাজউক বা দমকল বিভাগকে অবহিত করুন।
ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং প্রস্তুতি
ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। যার মধ্যে ১৫ লাখ একতলা-দোতলা এবং ছয় লাখ চার থেকে ছয়তলা।
এই তথ্য জানিয়ে অধ্যাপক আনসারী সতর্ক করে বলেন, “৫.৭ মাত্রায় যে ক্ষতি হয়েছে, ৭ মাত্রায় ভূমিকম্প হলে অনেক ভবন ভেঙে পড়বে। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন ভূমিকম্প হলে দুতিন লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে এবং শতকরা ৩৫ ভাগ ভবন ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।”
তিনি ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধ্বসের উদাহরণ টেনে জানান- একটি ভবন ধ্বসেই কতটা ক্ষতি হয়।
ইতিহাসেও ভয়াবহ কিছু ভূমিকম্পের দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৭৬২ সালের ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’ ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ মাত্রার, যার অভিঘাত পৌঁছেছিল চট্টগ্রাম, ফেনী ও কুমিল্লা পর্যন্ত।
১৮৯৭ সালে আসামে ঘটে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার আরও একটি বড় ভূমিকম্প। এরপর ১৯১৮ সালে সিলেটের বালিসিরা উপত্যকায় ৭ দশমিক ৬। আর ১৯৩০ সালে আসামের ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়।
অধ্যাপক আনসারী পরামর্শ দেন- “প্রতিবছর প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলী ও স্থপতি তৈরি হন। ভবন নির্মাণবিধির ওপর প্রকৌশলীদের তিন মাসব্যাপী, স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।”
বাংলাদেশে ৪০ থেকে ৫০টি প্রতিষ্ঠান ভবন তদারকের ভালো সক্ষমতা আছে। তাদের দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
রাজউক, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও সিটি করপোরেশন আমাদের ভবনের অনুমোদন দেয়।
তবে দেশে প্রায় ৫০টি তদারকের ভালো সক্ষম প্রতিষ্ঠান আছে, যারা শুধু ভবন নির্মাণের কাজ করে থাকে। তাদের দক্ষতা অনেক বেশি।
“আমাদের পাশের দেশ ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ভবন তদারকের কাজ করছে। আমাদের দেশেও এটা করতে হবে”- বলেন এই অধ্যাপক।
তাই এখনই ভবনগুলো পরীক্ষা করা দরকার।
এই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, এবারের ভূমিকম্পকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। যাতে ভবিষ্যতে বড় ক্ষতি এড়ানো যায়।
আরও পড়ুন