Published : 07 Sep 2025, 05:02 PM
অফিস থেকে ফিরে এসেও কি মনে হয় মাথা এখনও অফিসের কাজ নিয়েই ব্যস্ত? দিনের কাজ শেষ হলেও অনেকেই ‘ওয়ার্ক মোড’ থেকে বের হতে পারেন না।
তবে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাজের মতো বিশ্রামও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থেরাপি প্রতিষ্ঠান ‘টেক রুট থেরাপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও মনোবিশেষজ্ঞ সাবা এইচ. লুরি রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “আমরা যখন কাজে থাকি তখন মস্তিষ্ক সারাক্ষণ সক্রিয় থাকে, হাজারও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই কাজ শেষে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য সচেতনভাবে নিজেকে বদলে নেওয়া জরুরি।“
কাজ শেষের একটি রুটিন তৈরি
অফিসের কাজ শেষ করার পরও অনেকেই মনে করেন মেইল দেখে একবার বা আগামীকালের প্রেজেন্টেশনের খসড়া করে ফেলি। অথচ এভাবে চিন্তাভাবনা চলতে থাকলে মস্তিষ্ক বুঝতেই পারে না যে কাজ শেষ হয়ে গেছে।
দিনের শেষে একটি ‘শাট-ডাউন’ রুটিন তৈরি করার পরামর্শ দেন, সাবা লুরি।
তার কথায়, “কম্পিউটারের সব উইন্ডো বন্ধ করে ল্যাপটপ গুটিয়ে রাখা বা এর ওপরে প্রতীকীভাবে কিছু ঢেকে দেওয়া এসব ছোট কাজ মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে আজকের মতো কাজ শেষ।”
গবেষণা বলছে, এ ধরনের প্রতীকী পদক্ষেপ স্নায়ুতন্ত্রকে এক ধরনের আরাম দেয়। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্টভাবে অফিস শেষ করার অভ্যাস তৈরি করলে ‘ওয়ার্ক ইউ’ থেকে ‘হোম ইউ’তে সহজে রূপান্তর সম্ভব।
গোসল— শরীর ও মনকে সতেজ করা
কাজ শেষে অনেকের মাথা এখনও ঘুরপাক খায় নানান দায়িত্বে। এ সময় গরম পানিতে গোসল হতে পারে এক কার্যকর উপায়।
সাবা লুরির মতে, “গোসল শুধু পরিষ্কার হওয়ার জন্য নয়, এটি মানসিকভাবে এক প্রকার রূপান্তর তৈরি করে। একদিকে দিন শেষের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে, অন্যদিকে মস্তিষ্ককে জানান দেয় এখন বিশ্রামের সময়।”
বাইরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে, গোসল শেষে নতুন পোশাক পরা মস্তিষ্ককে বলে দেয় আর কাজের মেজাজে নেই বরং অন্য এক পরিবেশের জন্য প্রস্তুত।
আবার যারা বিশ্রাম নিতে চান, তাদের জন্য গরম পানিতে গোসল আর নরম পায়জামা হতে পারে দিনের সেরা আরামদায়ক মুহূর্ত।
সম্পর্কিত আরও প্রতিবেদন
চাপও হতে পারে জীবন বদলে দেওয়ার জ্বালানি
অফিসের কাজ বাসায় নিলে, পরিবার যাবে চুলায়
‘আজ কী করলাম’ তালিকা তৈরি করা
অনেকের অভ্যাস দিন শেষে শুধু যা হয়নি তার কথাই ভাবা। এতে অযথা চাপ বাড়ে।
সাবা লুরি- বরং উল্টোটা করার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, “দিন শেষে একটি ‘আই ডিড ইট লিস্ট’ বা ‘যা যা করা হল’ সেটার তালিকা তৈরি করতে হবে। এতে অর্জন চোখে পড়বে। আর পরের দিনের কাজ লিখে রাখলে মস্তিষ্ক এক ধরনের বুকমার্ক তৈরি করতে পারে। ফলে ঘুমানোর আগে আর কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না।”
মনোবিজ্ঞান-ভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক অর্জন লিখে রাখা মানসিক চাপ কমায়, ঘুম উন্নত করে এবং আত্মতৃপ্তি বাড়ায়।
শারীরিক পরিবর্তন
শুধু মানসিক রুটিন নয়, কিছু শারীরিক কাজও কাজের চাপ থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে। যেমন- বাড়ি ফিরে পোশাক বদলে ফেলা, হাঁটা, কিংবা শুধু হাত ধুয়ে নেওয়া।
সাবা লুরি বলেন, “এসব ছোট কাজ আসলে স্নায়ু তন্ত্রকে জানিয়ে দেয় কাজের সময় শেষ হয়েছে।”
অনেক কর্মজীবী নারী-পুরুষের অভিজ্ঞতাও তাই বলে। অফিস শেষে হাঁটা বা প্রিয় গান শোনা শুধু বিনোদন নয়, কাজ থেকে বিশ্রামে ফেরার জন্য এক প্রকার মানসিক ‘সুইচ’ হিসেবে কাজ করে।
সময়ের সীমা তৈরি এবং মানা
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল সময়ের সীমা। অফিস থেকে ফিরেও ফোনে ইমেইল চেক করা, হঠাৎ কাজের ফোন ধরতে হওয়া, এসব বিশ্রামের সময় কেড়ে নেয়।
সাবা লুরি বলছেন, “কোনো নির্দিষ্ট সীমা ঠিক করা, যেমন- সন্ধ্যা ৬টার পর আর অফিসের ইমেইল দেখবেন না, বা সপ্তাহের একটি দিন সম্পূর্ণ কাজমুক্ত রাখবেন।”
যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- যারা নির্দিষ্ট সময়ের পর অফিসের কাজ বন্ধ রাখেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য তুলনামূলক ভালো থাকে।
এই অভ্যাস শুধু মানসিক প্রশান্তি আনে না, দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতাও বাড়ায়।
কেন জরুরি এই অভ্যাসগুলো?
সাবা লুরি মনে করেন, “যখন নিজেদের কাজ থেকে সত্যিকার অর্থে দূরে সরতে দেই তখন স্নায়ুতন্ত্র সতর্ক অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের পর্যায়ে চলে আসে। এটি শুধু তাৎক্ষণিক প্রশান্তি নয় বরং মস্তিষ্ক ও শরীরকে নতুন করে প্রস্তুত করার সুযোগ।”
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়- কাজ ও বিশ্রামের ভারসাম্য ঠিক থাকলে ‘বার্নআউট সিন্ড্রোম’ বা কর্মক্ষয়জনিত মানসিক সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
আরও পড়ুন