Published : 03 Jul 2026, 08:51 AM
খনা কে ছিলেন? শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও কেন খনা আমাদের জনজীবনে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের অনেকখানি অতীতে ফিরে তাকাতে হয়। প্রাচীন বাংলার সেই বিদুষী নারী, যিনি একাধারে জ্যোতিষ, গণিত ও হোরাশাস্ত্রে অসামান্য পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছিলেন, তাকে ঘিরে জনশ্রুতির যেমন শেষ নেই, তেমনই তার জীবনদর্শন নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ।
লক্ষণীয়ভাবে, আজও বাংলার কৃষকের লাঙলের ফলায় কিংবা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় খনার বচনগুলো যেন ধ্রুবসত্যের মতো অনুরণিত হয়। খনার সেই কালজয়ী বচনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এক গভীর ব্যবহারিক জ্ঞান।
যেমন- “ষোলো চাষে মূলা, / আট চাষে তুলা, / চার চাষে ধান, / বিনি চাষে পান।” আবার ঋতু ও শরীরের অবস্থাভেদে তিনি বলেছিলেন, “মাঘের শীত বাঘের গায়, / ক্ষীণের শীত সর্বদায়।” প্রকৃতির ইঙ্গিত বুঝতেও তার জুড়ি ছিল না, যেমন- “ব্যাঙ ডাকে ঘনঘন, / শীঘ্রই বৃষ্টি হবে জেনো।”
খাদ্যাভ্যাস নিয়েও তার সতর্কবার্তা ছিল স্পষ্ট, “বারো মাসে বারো ফল, / না খেলে রসাতল।” এমনকি বৃষ্টির প্রভাব নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম, “যদি বর্ষে আঘনে, রাজা যান মাগনে। / যদি বর্ষে পৌষে, কড়ি হয় তুষে। / যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।”
বাস্তুশাস্ত্র বা ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রেও তার নির্দেশ ছিল বাস্তবসম্মত, “দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা, / পুব দুয়ারী তাহার প্রজা, / পশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাই, / উত্তর দুয়ারীর খাজনা নাই।” কৃষকের আনন্দ ও প্রকৃতির সংযোগ তিনি এঁকেছেন এই ভাষায়, “ভাদ্র আশ্বিনে বহে ঈশান, / কাঁধ কোদালে নাচে কৃষাণ।”
কৃষি ও প্রকৃতি নিয়ে এমন তথ্যঋদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয় বচন প্রাচীনকালের আর কোনো পণ্ডিতের ভাণ্ডারে পাওয়া যায় না। অথচ সমকালীন সমাজে এক নারীর প্রজ্ঞা এতখানি সারবত্তাপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের ইতিহাসে খনার নাম প্রায় উহ্যই রয়ে গেছে। কোথাও তার উল্লেখ থাকলেও তা দায়সারাভাবে করা হয়েছে।
খনার প্রকৃত জন্মস্থান, পিতামাতা বা জন্মকাল নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত ইতিহাস নেই। কেউ মনে করেন, খনা কোনো একক ব্যক্তি নন, বরং একদল সমমনা প্রাজ্ঞ মানুষের যৌথ কণ্ঠস্বর, যা কালক্রমে একটি নামে সংহত হয়েছে। তবে প্রশ্ন জাগে, অস্তিত্বহীন কেউ কি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জনমানুষের মিথ বা লোকশ্রুতির কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারেন?
খনার নাম নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে ‘জ্ঞানী’ শব্দ থেকে খনা এসেছে। কিংবদন্তি বলে, শুভ ক্ষণে জন্ম হওয়ার কারণে তার নাম হয়েছিল খনা। আবার এমন গল্পও প্রচলিত যে, মিহির তার জিহ্বা কেটে দেওয়ায় তিনি উড়িয়া ভাষায় ‘বোবা’ অর্থে ‘খনা’ নামে পরিচিত হন। কারও মতে ‘ক্ষণ’ থেকে ‘খন’ হয়ে খনা নামটি এসেছে, কারণ তার বচনে তিথি ও দিনক্ষণের অপরিসীম গুরুত্ব ছিল। অন্য একটি মতে তার প্রকৃত নাম ছিল ‘লীলাবতী’।
খনাকে নিয়ে যেমন অজস্র মিথ রয়েছে, তেমনি সেই মিথগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে তৎকালীন সমাজের পুরুষতান্ত্রিক আস্ফালন ও নারী-অবদমন। খনা ছিলেন শোষিত প্রাকৃতজনের কণ্ঠস্বর এবং জগৎ ও জীবন ব্যাখ্যায় তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেকটা ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী ও নিরীশ্বরবাদী। তার জিহ্বা কর্তনের করুণ কিংবদন্তি সেই বিদ্রোহী চেতনারই এক নির্মম সামাজিক পরিণতি হিসেবে দেখা হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, খনা কি চার্বাক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, নাকি তিনি নিজেই ছিলেন সেই দর্শনের একজন অনুসারী?
পূরবী বসুর ‘কিংবদন্তি খনা ও খনার বচন’ গ্রন্থে পাঁচটি প্রধান কিংবদন্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমটি অনুযায়ী, তিনি চব্বিশ পরগনার দেউলি গ্রামে অটনাচার্যের কন্যা ছিলেন। তার একটি বচনেও এর সমর্থন মেলে, “আমি অটনাচার্যের বেটি, গণতে গাঁথতে কারে বা আঁটি।”
তিনি বড় হয়েছিলেন চন্দ্রকেতুগড়ে। দ্বিতীয় কিংবদন্তি বলে, উজ্জয়িনীর জ্যোতির্বিদ বরাহ তার পুত্র মিহিরের আয়ু মাত্র এক বছর গণনা করে তাকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। মিহির ভাসতে ভাসতে সিংহলে পৌঁছান এবং সেখানে বড় হয়ে সিংহলরাজকন্যা লীলাবতীকে বিয়ে করেন।
তৃতীয় মতে, রাক্ষসেরা সিংহল দখল করে লীলাবতীকে লালন-পালন করেছিল। তবে অনেকে মনে করেন, এই ‘রাক্ষস’ শব্দটি আসলে বাংলা বা গৌড় অঞ্চলকেই নির্দেশ করে, কারণ কলহনের ‘রাজতরঙ্গিণী’তেও গৌড়কে রাক্ষসরাজ্য বলা হয়েছে।
চতুর্থ কিংবদন্তি অনুযায়ী, বরাহ, মিহির ও খনা দীর্ঘ সময় মেহেরপুরে অতিবাহিত করেছিলেন এবং মিহিরের নাম থেকেই শহরটির আদি নাম ছিল মিহিরপুর। পঞ্চম কিংবদন্তিতে দ্বাদশ শতকের বিখ্যাত গণিতবিদ ভাস্করাচার্যের কন্যা লীলাবতীর প্রসঙ্গ আসে। যদিও এই ঐতিহাসিক লীলাবতী বীজগণিতে পারদর্শী ছিলেন, তবে জিহ্বা বিচ্ছিন্ন কিংবদন্তির খনার সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
ভাষাবিদদের মতে, খনার বচনের বর্তমান ভাষা চারশো বছরের বেশি পুরোনো নয়। তবে ডক্টর আলী নওয়াজ মনে করেন, বচনগুলোর কৃষিতাত্ত্বিক সূত্র বিশ্লেষণ করলে এর রচনাকাল সপ্তম শতকের আগে, সম্ভবত গুপ্তযুগে হতে পারে। ডক্টর বোরহান বুলবুল তার ‘ডাক ও খনার বচন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, খনার বচনে ‘ইনাম’ বা ‘বখশিস’-এর মতো আরবি-ফারসি শব্দের উপস্থিতি রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মুসলিম শাসনামলেও এই বচনগুলো বাংলার জনপদে মুখে মুখে চর্চিত ও পরিবর্তিত হয়েছে, যা অনেকটা চর্যাপদের ভাষা-বিবর্তনের মতোই একটি প্রক্রিয়া।
খনার মৃত্যু নিয়ে অবশ্য মতভেদ কম। রাজা বিক্রমাদিত্য খনার প্রজ্ঞা দেখে তাকে প্রধান সভাপণ্ডিত করতে চেয়েছিলেন। এতেই অপমানিত ও ঈর্ষান্বিত হয়ে বরাহ ও মিহির খনার জিহ্বা কেটে তাকে হত্যা করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে এ ঘটনাকে নিছক উপকথা মনে হলেও, তা সেকালের সমাজে অব্রাহ্মণের বেদপাঠের ‘অপরাধে’ জিহ্বা কেটে নেওয়ার সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করা হয়।
খনার বচনের ভৌগোলিক বিস্তারও বিস্ময়কর। আসাম থেকে কেরালা পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তার বচন আক্ষরিক বা ভাবানুবাদে প্রচলিত। উড়িষ্যার মানুষ আজও খনার বচন গেয়ে থাকেন এবং প্রত্যেকেই এটিকে নিজেদের দেশীয় সম্পদ মনে করেন।
খনার বচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য যেখানে ধর্ম ও ঈশ্বরে আচ্ছন্ন, খনা সেখানে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তার প্রায় তিন শতাধিক বচনের মধ্যে মাত্র একটিতে ঈশ্বরের উল্লেখ পাওয়া যায়। এমনকি স্বাস্থ্যবিষয়ক বচনেও কোনো অলৌকিকতার বদলে অভিজ্ঞতানির্ভর জ্ঞান প্রধান হয়ে উঠেছে এবং তা নারীনিন্দা বা পুরুষতান্ত্রিক সংকীর্ণতা থেকে প্রায় মুক্ত।
অনেকেই অনুমান করেন, খনা চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। চার্বাক দর্শনের মূল কথা হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সত্যকে গ্রহণ করা এবং ঈশ্বর বা পরলোককে অস্বীকার করা। তাদের বিখ্যাত উপদেশ ছিল, “ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ”। অর্থাৎ ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচো। খনাও ঠিক একইভাবে বলেছেন, “সোমে ও বুধে দিয়ো না হাত, / ধার করিয়া খাইয়ো ভাত।”
এই দুই বচনের জীবনদর্শন অভিন্ন, বর্তমানের জীবনকে অস্বীকার না করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও বেঁচে থাকার আনন্দকে আঁকড়ে ধরা। ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি খনার তীব্র কটাক্ষও লক্ষ্য করা যায় তার এই বচনে- “বামুন, বাদল, বান, / দক্ষিণা পেলেই যান।” সম্ভবত এই বিদ্রোহী অবস্থানের কারণেই ইতিহাসে তিনি দীর্ঘকাল উপেক্ষিত থেকেছেন।
খনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সূত্র মেলে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার চন্দ্রকেতুগড়ে। সেখানে আজও একটি প্রাচীন ঢিবি স্থানীয় মানুষের কাছে ‘খনা-মিহিরের ঢিবি’ নামে পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন জনবসতি। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ১৯০৬ সালের প্রতিবেদন এবং ১৯৪০ সালের ইস্টার্ন ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ম্যাগাজিনের নিবন্ধেও চন্দ্রকেতুগড়কেই খনা ও মিহিরের বাসভবন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এখানকার স্থানীয় কৃষিরীতি ও ঘরবাড়ি নির্মাণের অভ্যাসের সঙ্গে খনার বচনের অদ্ভুত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এমনকি সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া গুপ্তযুগীয় মুদ্রায় সম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও রানির বিবাহদৃশ্য খনার কাল নির্ণয়ে নতুন মাত্রা যোগ করে। এসব তথ্যপ্রমাণ থেকে ধারণা করা যায় যে, খনা সম্ভবত চব্বিশ পরগনা অঞ্চলেরই মানুষ ছিলেন এবং তার সময়কাল ছিল গুপ্তযুগের কাছাকাছি।
খনার জন্ম, ভাষা কিংবা স্বামী-শ্বশুরের পরিচয় নিয়ে পরস্পরবিরোধী অনেক মত থাকলেও, তিনি বাংলার ইতিহাসের এক অনন্য বিদুষী কিংবদন্তি। তাকে ঘিরে থাকা বিতর্ক ও বিভ্রান্তি দূর করতে আরও গভীর ও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রাম, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, যুক্তি আর যাপিত জীবনের প্রতিটি চড়াই-উতরাইয়ে খনার বচন আজও মিশে আছে। আর সেই বচনের মাধ্যমেই খনা আমাদের চেতনায় প্রতিনিয়ত আরও বেশি মূর্ত ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন।