Published : 03 Jul 2026, 09:12 AM
“সোহান আমাদের দলে না খেললে, আগেই বাদ পড়ত। এভাবে মেরে খেলতে পারত না”- এক আড্ডায় এভাবেই বলছিলেন এবারের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে লেজেন্ডস অব রূপগঞ্জকে নেতৃত্ব দেওয়া শেখ মেহেদি হাসান। যাকে নিয়ে আলোচনা, সেই হাবিবুর রহমান সোহান তখন মাত্র ছয় দিনের মধ্যে দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন। তবে ঝড়ো শুরুর চেষ্টায় ব্যর্থই হয়েছেন বেশির ভাগ ইনিংসে। মেহেদি বলছিলেন তাকে সেই স্বাধীনতা দেওয়ার কথাই।
সোহানের ব্যাটিংয়ের মূল চরিত্রই এটি, ‘মেরে খেলা।’ এভাবে খেলে তিনি হয়তো ধারাবাহিকতা পাননি, তবে দেশের ক্রিকেটে আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন। এই ঘরানার ব্যাটসম্যান যে কমই আছে বাংলাদেশে! প্রশ্নটাও এখন উঠতে শুরু করেছে, জাতীয় দলের ঠিকানা পেতে আরও কতটা পথ তাকে পাড়ি দিতে হবে।
জিম্বাবুয়ে সফরের বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলে জায়গা না পাওয়ার পর প্রশ্নটি আরও উচ্চকিতই হয়েছে। বিশেষ করে, লিটন দাস যখন এই সফরে নেই, সৌম্য সরকারও বাদ পড়েছেন, সাইফ হাসানের পারফরম্যান্স নিয়েও জমেছে সংশয়, সোহানকে বাজিয়ে দেখার একটি মঞ্চ হাতে পারত এই সিরিজ।
প্রায় সাড়ে তিন বছর পর যখন আচমকা সুযোগ পেয়েছেন মোসাদ্দেক হোসেন ও ইয়াসির আলি চৌধুরি, তখনন আকবর আলির নামটাও উঠে আসছে। তিনিও কি সুযোগ পেতে পারতেন? রহস্য স্পিনার আলিস ইসলাম কতটা বিবেচনায় আছেন নির্বাচকদের? প্রশ্নগুলির জবাব দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।
সোহানের দাবিটাই সবচেয়ে জোরাল বলা যায়। এবারের ঢাকা লিগে ১০ ইনিংসে তার সেঞ্চুরি একটি, ফিফটি দুটি। তবে ধারাবাহিকতার নিক্তিতে তো তাকে মাপা যাবে না। ৩৫৯ রান করেছেন ১৪৯ স্ট্রাইক রেটে। ছক্কা মেরেছেন ২৮টি। ৪৫ বলে সেঞ্চুরি করেছেন, ১৫ বলে ফিফটি করেছেন।
গত জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১৮ রান করেছিলেন ১৮৩.১৯ স্ট্রাইক রেটে।
ঘরোয়া ক্রিকেটের চেয়ে একটু উঁচু পর্যায়েও নিজের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ঝলক দেখিয়েছেন সোহান। গত বছর রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে হংকংয়ের বিপক্ষে দোহায় বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে ফিফটি করেন তিনি ১৪ বলে, সেঞ্চুরি ৩৫ বলে। স্বীকৃত ক্রিকেটে যা দেশের দ্রুততম ফিফটি ও শতরানের রেকর্ড।
তবে জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়ার জন্য সেসববে যথেষ্ট মনে করছেন না হাবিবুল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে প্রধান নির্বাচক বললেন, ২৬ বছর বয়সী ব্যাটসম্যানকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আশেপাশের স্তরে আরও পরখ করতে চান তারা।
“তাকে (সোহান) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সামনে ‘এ’ দল ও এইচপি দলের সফর আছে। অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি হবে। এসব জায়গায় আমরা সোহানকে নিচ্ছি। ধীরে ধীরে দেখি, সে কিভাবে কী করে। যদি ভালো করে তখন নিয়ে আসব (জাতীয় দলে)। এই মুহূর্তে এইচপি দলের সফরে থাকবে।”
সোহানের অনেক আগে থেকেই আকবরকে চেনে দেশের ক্রিকেট। ২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের ক্যারিয়ার পরের সময়টায় প্রত্যাশিত পথে এগোয়নি। সেই দলে তার সতীর্থদের দুজন ছাড়া সবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। তিনি এখনও দুয়ারটা খুলতে পারেননি। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে ততটা মেলে ধরতে পারেননি।
উন্নতির বার্তা অবশ্য দিয়েছেন সম্প্রতি। ঢাকা লিগে ৯ ইনিংসে ফিফটি যদিও করেছেন স্রেফ একটি, তবে ্াসরে ২১৭ রান করেছেন ১১৯.২৩ স্ট্রাইক রেটে। জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টিতে পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে তার স্ট্রাইকরেট ছিল ১৪৯.২৬।
তবে জাতীয় নির্বাচকদের কাছে এখনও বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানের ক্যাটেগরিতে বিবেচিত হচ্ছেন না আকবর। প্রধান নির্বাচক বললেন, ২৪ বছর বয়সী ক্রিকেটারকে কিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে দেখছেন তারা।
“আকবর ভালো খেলছে অবশ্যই। এই মুহূর্তে আসলে উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান অনেকজন আছে। যেহেতু, আমরা (নুরুল হাসান) সোহানকে নিয়ে যাচ্ছি, ওকে বাদ দিলে তখন আকবরের চিন্তা করব।”
“সোহান অনেকদিন ধরে দলের সাথে আছে। এই সময়ে মাত্র একটা ম্যাচ খেলেছে, আরেকটু খেলুক। যদি নিজেকে প্রমাণ করতে না পারে, তখন আমরা অন্য অপশনে যাব।”
আলিস আল ইসলামের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। দেশের ক্রিকেটে খুবই বিরল এক প্রজাতি তিনি। তার পরিচয় রহস্য স্পিনার। তার মূল সমস্যা ছিল ফিটনেস। কয়েক দফায় লম্বা সময় চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে। নিয়মিত মাঠে থাকার সময়ও তার ফিল্ডিং ও ফিটনেসের সীমাবদ্ধতা চোখে পড়েছে। কিন্তু বোলিং দিয়ে বার্তা দিয়েই যাচ্ছেন।
১০ ম্যাচে ২৪ উইকেট নিয়ে সবশেষ ঢাকা লিগের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তিনি। রান জোয়ারের লিগেও ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন মাত্র ৩.৮৩। বিপিএলের গত আসরে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন ওভারপ্রতি ৬.৬৪ রান দিয়ে, গত বিপিএলে ওভারপ্রতি ৬.৩২ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ১৫ উইকেট।
২০২৪ সালে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন। ২০২৫ বিপিএলে দারুণ খেলেও ফের চোটে পড়ে পুরো বছর ছিলেন মাঠের বাইরে। এখন এই চোট সমস্যা নেই। এইচপি ও ‘এ’ দলের জন্য বিবেচনায় আছেন। অস্ট্রেলিয়ায় ‘এ’ দলের সফরে তাকে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে বিসিবির নির্বাচক প্যানেল, “আলিস প্রিমিয়ার লিগ খেলছে। বোলিংও ভালো করেছে। এইচপি ও ‘এ’ দল দুই সফরেই থাকবে।”
জাতীয় দলের পাশাপাশি এইচপি ও ‘এ’ দলের বেশ কিছু সফর ও সিরিজ থাকায় জাতীয় দলের আশেপাশে থাকা ক্রিকেটারদের সুযোগ থাকবে নিজেদের মেলে ধরার। জিম্বাবুয়ে সফরের দল বাছাইয়ের বৈঠকে আলোচনা অনেককে নিয়েও হলেও তাই বড় পরিবর্তন আনতে চাননি প্রধান নির্বাচক।
“আসলে খুব বেশি পরিবর্তন করতে চাইনি এবং খুব বেশি হয়নি। পরিবর্তনগুলো ছোট ছোট, যেমন শামীমের জায়গায় দুইজন ফিরেছে। লিটন নেই, তাই একটা অপশন বেড়েছে। এজন্য খুব বেশি ওদিকে (দলে পরিবর্তন) যাইনি আমরা।”
“একটা বড় গ্রুপ নিয়ে আলাপ করেছি। সামনে দক্ষিণ আফ্রিকায় হাই পারফরম্যান্স দলের সিরিজ আছে, অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আছে, আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘এ’ দল যাবে। ওইখানে তিনটা দল নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আবার জাতীয় দল তো ছিলই।”