Published : 18 Sep 2026, 12:34 AM
সৌদি আরবের অনুরোধে চীন গোপনে ইরানকে বলেছে, তারা যেন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের থামায়। গত সপ্তাহে ইরান-সমর্থিত এই হুতিরা নতুন করে সামরিক তৎপরতা শুরু করার পর চীনকে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে সৌদি আরব।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত অন্তত তিন ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানি এই সূত্ররা বলেছেন, লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হতে শুরু করায় সমুদ্রপথে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও নৌ-পরিবহনব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন সৌদি আরব সহায়তার জন্য চীনের দ্বারস্থ হয়েছে।
চীন প্রকাশ্যে সব পক্ষকে সংযম রক্ষা করা, সংলাপ এবং বাণিজ্যিক নৌ-চলাচল নিরাপদ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইরানকে দেওয়া তাদের গোপন বার্তাটি ছিল বেশ কড়া।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে সংঘাত এড়াতে চায়। তাই চীন যেসব আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে যাতে সংঘাত না ছড়ায়; সেজন্য ইরানকে হুতিদের ওপর তাদের প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
ইরানি সূত্ররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ খবর জানালেও চীনের এই বার্তা ঠিক কীভাবে ইরানকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করেননি। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির চীন সফরকালে এই প্রসঙ্গ তোলা হয়েছিল কিনা; সেটিও জানা যায়নি।
তবে সূত্ররা বলেছেন, বেইজিংয়ের চাপের জবাবে তেহরান স্পষ্ট করে বলেছে, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
সূত্ররা আরও জানান, হুতিদের লাগাম টানতে ব্যর্থ হলে চাপ আরও বাড়ানোর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে কোনও অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না সে বিষয়ে চীনা কর্মকর্তারা কোনও ইঙ্গিত দেননি বা কোনও হুমকিও দেননি।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা ইয়েমেন বা লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়ুক, তা বেইজিং দেখতে চায় না। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া কোনও পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত কোনও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে হামলার নিশানা বানানো যাবে না। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে এমন পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যা সমাধানের জন্য তাগাদা দিচ্ছে চীন।
রয়টার্সের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরব সরকারের সংবাদমাধ্যম দপ্তর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। দেশটি ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা। বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা মোট অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন; যার পরিমাণ দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
পশ্চিম এশিয়ায় কাজে নিয়োজিত পশ্চিমা এক ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক বলেন, ইরানকে চাপ দিয়ে হুতিদের লাগাম টেনে ধরানোর মতো ক্ষমতা হাতে গোনা যে কয়েকটি বিশ্বশক্তির দেশের আছে, চীন তাদের অন্যতম।
ইরানি সূত্র ও পশ্চিমা দেশগুলো বলেছে, ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সুন্নি ধর্মীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে হুতিদের উত্থান ঘটে। পরে ইরান তাদের অর্থ, আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিধর বানিয়েছে। বর্তমানে এই গোষ্ঠী পশ্চিম এশিয়ায় তেহরানের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিরোধী ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অন্যতম শক্তিশালী অংশ।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। তার ওপর লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের নতুন হুমকি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র বলেছেন, ইরান ও এর মিত্ররা এখন পুরো পশ্চিম এশিয়ার সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার দুই প্রান্তে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। আর চীন ওই অঞ্চলের দুটি সমুদ্রপথের ওপরই সমানভাবে নির্ভরশীল।
ওয়াশিংটনের ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেছেন, চীন হয়ত ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরোধিতা করে। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
চীন যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান বাস্তবিক কোনও পদক্ষেপ নেবে কি না, ইরানি সূত্রগুলো তা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে থাকা ইরানের জন্য চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় নাজুক হয়ে পড়া ইরানের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং তেল শিল্প টিকিয়ে রাখতে দেশটির যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা দেওয়ার অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা গুটিকয়েক দেশের মধ্যে আছে চীন।
তাছাড়া চীন অতীতে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাবের নজিরও দেখিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বৈরি সম্পর্কে থাকা দুই দেশ ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ২০২৩ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল চীন। তবে ইরানের ওপর চীনের প্রভাব খাটানোর কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে।