Published : 10 Mar 2026, 04:01 PM
রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন স্ক্রল করা, সিরিয়াল দেখা, কিংবা শুধু অনিদ্রার কারণে চোখে ঘুম না আসা- যে কোনো কারণেই হোক, ঘুমের ঘাটতি শুধু চোখের নিচে কালো দাগ ফেলে না, এটি পেটও অশান্ত করে।
ফলে হতে পারে গ্যাস, বুকজ্বালা, পেট ফাঁপা— এসব সমস্যা।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “ঘুমের অভাব এবং গ্যাস্ট্রিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে একটা গভীর, দ্বিমুখী সম্পর্ক। ঘুম কম হলে গ্যাস্ট্রিক বাড়ে, আর গ্যাস্ট্রিক হলে ঘুম আরও খারাপ হয়।”
ঘুমের অভাব যেভাবে পেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করে
আমাদের শরীর একটা নিখুঁত ঘড়ির মতো চলে। রাতের অন্ধকারে শরীর হজম প্রক্রিয়া ধীর করে, অ্যাসিড নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং অন্ত্রের গতিবিধি স্বাভাবিক রাখে।
“তবে যখন আমরা রাত জাগা হয় বা ঘুম কম হয়- তখন এই ছন্দ ভেঙে পড়ে। ফলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়, খাদ্য হজম ধীর হয় এবং অন্ত্রের চলাচল বিঘ্নিত হয়”- বলেন ডা. নয়ন।
আরও একটা বড় কারণ হল ‘স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল’। ঘুম কম হলে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়, যা পাকস্থলীর অ্যাসিড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এতে ‘হার্টবার্ন’ তীব্র হয়।
‘পিএমসি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত, দক্ষিণ কোরিয়া’র সিউলে’য়ের ‘ইওয়াহ উইম্যানস ইউনিভার্সিটি’ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মায়ো ক্লিনিক কলেজ অফ মেডিসিন’য়ের যৌথ উদ্যোগে করা গবেষণায় দেখা গেছে- যাদের ঘুমের অভাব রয়েছে, তাদের ‘গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ’ বা ‘অ্যাসিড রিফ্লাক্সে’র উপসর্গ তীব্র হয়।
এমনকি ঘুমের অভাবে অ্যাসিডের প্রতি খাদ্যনালীর সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়— যাকে বলে ‘রিফ্লাক্স হাইপারসেনসিটিভিটি’।
ফলে সামান্য অ্যাসিড উঠলেই বুকে আগুন জ্বলে উঠে।
রাতে দেরি করে খাওয়া, খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া— এসব অভ্যাস অনেকেরই আছে। এর সঙ্গে যদি ঘুম কম হয়, তাহলে সমস্যা আরও বাড়ে।
শুয়ে থাকলে পাকস্থলীর অ্যাসিড সহজেই খাদ্যনালীতে উঠে আসে, কারণ মাধ্যাকর্ষণের সাহায্য পায় না। ঘুমের অভাবে শরীরের পেশি ও স্নায়ুর সমন্বয় নষ্ট হয়, খাদ্যনালীর নিচের ‘ভাল্ভ’ (লোয়ার ইসোফেজিয়াল স্ফিঙ্কটার) দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে অ্যাসিড ওপরে উঠে বুকজ্বালা, টক ঢেকুর, গলায় জ্বালা— এসব উপসর্গ তৈরি করে।
এছাড়া ঘুম কম হলে ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস)’-এর উপসর্গও বেড়ে যায়।
পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া— এসব সমস্যা ঘুমের অভাবে আরও তীব্র হয়। কারণ অন্ত্রের স্বাস্থ্য অনেকাংশে নির্ভর করে স্নায়ুতন্ত্র এবং হরমোনের ওপর, যা ঘুমের সময় নিয়ন্ত্রিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ঘুম ভালো হয় না, তাদের অন্ত্রের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া কমে যায় এবং ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া বেড়ে যায়, যা হজমকে আরও খারাপ করে।
ঘুম না হলে ওষুধেও পুরোপুরি কাজ হয় না
ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “অনেক রোগী শুধু খাবারকে দোষ দেন। তবে ঘুমের অভাব গ্যাস্ট্রিকের একটা বড় অজানা কারণ। যাদের আগে থেকেই আলসার বা রিফ্লাক্স আছে, তাদের ক্ষেত্রে অনিদ্রা উপসর্গকে আরও খারাপ করে।”
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে অন্তত সাত-আট ঘণ্টা ঘুম জরুরি। ঘুম ঠিক না থাকলে শুধু অ্যান্টাসিড বা ‘পিপি আই’ ওষুধ খেয়ে গ্যাস্ট্রিক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘুম ঠিক রাখার সহজ উপায়গুলো
ঘুমানোর অন্তত দুতিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উচিৎ। ভারী, ঝাল, তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ওঠা— এটা দেহঘড়িকে শক্তিশালী করে।
সন্ধ্যার পর ক্যাফিইন (চা, কফি, কোমল পানীয়) এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে।
শোবার আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন কমানো উচিৎ— নীল আলো মেলাটোনিন বা ঘুমের হরমোন কমায়।
ঘর অন্ধকার, শান্ত এবং ঠাণ্ডা রাখতে হবে। প্রয়োজনে হালকা ব্যায়াম বা ধ্যান করা যেতে পারে।
বাম দিকে কাত হয়ে শোয়া অ্যাসিড রিফ্লাক্স কমাতে সাহায্য করে।
যখন ডাক্তার দেখানো জরুরি
ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, এটি শরীরের সার্বিক স্বাস্থ্যের ভিত্তি। যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা এবং তীব্র গ্যাস্ট্রিক উপসর্গ একসঙ্গে থাকে, যেমন- বারবার বুকজ্বালা, বমি, ওজন কমে যাওয়া, গিলতে কষ্ট, রক্তবমি বা কালো মল—তাহলে ‘গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট’য়ের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এগুলো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
আরও পড়ুন
‘অ্যাসিড রিফ্লাক্স’য়ের কারণ হতে পারে যে পানীয়