Published : 18 Jun 2026, 06:01 PM
তীব্র গরমের পর, বৃষ্টি মনে এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়। তবে প্রকৃতি যখন বৃষ্টিতে সতেজ হয়ে ওঠে, শরীর তখন এক অদৃশ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে মুখে পড়ে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বৃষ্টির জমে থাকা পানি ক্ষতিকর অণুজীব, ছত্রাক ও মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। ফলে এ সময়ে ঘরে ঘরে সর্দি, কাশি, ডেঙ্গু কিংবা পেটের রোগের প্রকোপ দেখা যায়।
ফুটন্ত পানির বিকল্প নেই
বর্ষাকালে চারপাশের পানির উৎসগুলো খুব দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ে, যা টাইফয়েড, জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ) এবং ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের অন্যতম কারণ।
ভারতের ফোর্টিস হসপিটালস-এর স্বাস্থ্যসেবা-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা, তাদের মেডিকেল নির্দেশিকা ‘মনসুন হেল্থ টিপস’-এ জরুরি বিষয়ে সতর্ক করে উল্লেখ করেন, “বর্ষার দিনে কেবল ফিল্টারের ওপর ভরসা না করে, প্রতিদিন পানি ফুটিয়ে পান করা উচিত।”
ফুটন্ত পানি সব ধরণের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে ধ্বংস করে। চিকিৎসকেরা বাইরে ভ্রমণের সময় ট্যাপের পানির সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার এবং নিজস্ব পানির বোতল সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লুকিয়ে আছে অন্ত্রে
মেঘলা দিনে মেটাবলিজম বা হজম ক্ষমতা কিছুটা ধীর হয়ে যায়। একই সঙ্গে বাইরের কাটা ফল বা রাস্তার খোলা খাবার এই সময়ে সংক্রামক ব্যাকটেরিয়ার ডিপো হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতের পুষ্টি ও সমন্বিত চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. সুদীপ্তা রাও, ‘স্টে সেফ অ্যান্ড ইনফেকশন ফ্রি-২০২৫’ নামক ইউটিউবের এক মেডিকেল সেশনে জানান, মানুষের শরীরের মোট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ৭০ শতাংশই নির্ভর করে তার অন্ত্র বা পাচনতন্ত্রের ওপর।
তিনি পরামর্শ দেন, “এই মৌসুমে রাস্তার ধারের খোলা খাবার এবং বাসি খাবার (বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার বেশি পুরনো মাংস ও ভাত) পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। কারণ আর্দ্র আবহাওয়ায় এগুলোতে দ্রুত ছত্রাক জন্মায়।”
এর বদলে অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়াতে টকদই, ঘোল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে জাম, পেঁপে, ডালিম, আদা ও হলুদের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার পাতে রাখা উচিত।
ভেজা জামা এবং এসি ঘরের মারাত্মক ভুল
হুট করে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার পর অনেকেই সেই ভেজা কাপড়েই অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে ঢুকে পড়েন, যা শরীরের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে।
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ থেকে প্রকাশিত এক স্বাস্থ্য নির্দেশিকায়, চর্মরোগ চিকিৎসকেরা সতর্কবার্তা হিসেবে জানান, বর্ষার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া ছত্রাক বা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের জন্য স্বর্গরাজ্য। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বৃষ্টিতে ভেজার পর ভেজা কাপড়ে কখনই এসি রুমে প্রবেশ করা উচিত নয়। এটি শুধু ত্বকের বা নখের মারাত্মক ফাঙ্গাসের সমস্যা-ই বাড়ায় না, বরং শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমিয়ে ফুসফুসে সংক্রমণ ও তীব্র শ্বাসকষ্টের জন্ম দিতে পারে।
তাই বৃষ্টিতে ভিজলে দ্রুত চুল ও শরীর শুকিয়ে, শুকনো সুতি কাপড় পরা জরুরি।
ঘরের ভেতর ব্যায়াম ও ঘুম
বৃষ্টির কারণে ঘরের বাইরে গিয়ে হাঁটা বা ব্যায়াম করা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে শরীর অলস হয়ে পড়ে। তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সচল রাখতে শারীরিক সক্রিয়তা অপরিহার্য।
থাইল্যান্ডের ব্যাংকক হসপিটাল সিরিরোজ-এর বর্ষাকালীন বিশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিনে বলা হয়েছে, ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ ঠেকাতে এবং শরীরের এন্ডোরফিনস হরমোনের মাত্রা ঠিক রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করা অত্যন্ত জরুরি।
বাইরে বৃষ্টি থাকলে ঘরের ভেতরেই ‘ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ’ বা ইয়োগা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। কারণ ঘুমের সময় শরীর নিজেকে ‘রিচার্জ’ করে ও ক্ষতি পুষিয়ে নেয়।
তাই ‘ইমিউন সিস্টেম’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী রাখতে বর্ষার এই দিনগুলোতে, দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিটোল ঘুমের কোনো বিকল্প নেই, বলে জানান তারা।
মশার কামড় থেকে সাবধান
বর্ষাকাল মানেই চারপাশে বা টবের জমে থাকা পানিতে এডিস ও অ্যানোফিলিস মশার রাজত্ব, যা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ভারতের অ্যাপোলো ২৪৭-এর বর্ষাকালীন নির্দেশিকায় পরামর্শ দেওয়া হয়, ঘরের ভেতর নোংরা বা স্থির পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
এছাড়া বাইরে বের হওয়ার সময় ফুল-স্লিভ বা পুরো হাতা জামা পরা এবং ঘুমানোর সময় মশারি বা মসকিউটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করাই ডেঙ্গু থেকে বাঁচার কার্যকর বৈজ্ঞানিক উপায়।
প্রকৃতির বৃষ্টি যেমন উপভোগের, ঠিক তেমনি সামান্য অসচেতনতা এই আনন্দকে মাটি করে দিতে পারে। তাই পানি ফুটিয়ে পান করা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বা হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা, ঘরের ভেতর হালকা ব্যায়াম এবং পুষ্টিকর তাজা খাবার খাওয়া- এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই পুরো বর্ষাজুড়ে স্বাস্থ্যকর ও প্রাণবন্ত রাখতে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন