Published : 27 May 2026, 11:54 AM
সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে হঠাৎ টের পান জিব জ্বলছে। ভাত খেতে বসলে মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঠিক নেই। ঝাল বা টক কিছু খেলে তো কথাই নেই, মুখের ভেতরে যেন আগুন জ্বলে ওঠে।
অনেকে ভাবেন, এটা হয়ত গরমের কারণে বা একটু বেশি মসলাদার খাবার খাওয়ার কারণে হচ্ছে। তবে সেটা নাও হতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “জিবে জ্বালাপোড়া বা ফাটল দেখা দেওয়া অনেক সময় শরীরের পুষ্টি ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন, কোনো সংক্রমণ বা রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। তাই বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া মোটেও উচিত নয়।”
জিব কেন ফেটে যায়?
জিবের ওপর চিড়ে যাওয়ার মতো দাগ বা ফাটল, এটি কারও কারও ক্ষেত্রে জন্মগত বা বংশগত বৈশিষ্ট্য হতে পারে। পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে পরের প্রজন্মেও দেখা দিতে পারে। তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়।
“বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লালাগ্রন্থির কার্যকারিতা কমে গেলে বা বিশেষ কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জিবের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যায়। তখন এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়”, বলেন ডা. নয়ন।
পুষ্টির ঘাটতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। শরীরে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, আয়রন বা লোহা, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন ‘বি ১ ‘ বা জিংকের অভাব হলে জিবে পাতলা, লাল, মসৃণ বা ফাটাভাব হতে পারে।
যারা প্রতিদিন ঠিকমতো খাবার খান না, অতিরিক্ত ডায়েট করেন বা দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্টিতে ভুগছেন, তাদের এই সমস্যা বেশি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
নারীদের ক্ষেত্রে কারণটা আলাদা হতে পারে
নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের ওঠানামা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে মাসিকের সময়, গর্ভাবস্থায়, সন্তান জন্মের পর বা মেনোপজের সময় এই হরমোনের পরিবর্তন মুখের ভেতরেও প্রভাব ফেলে।
ডা. নয়ন বলেন, “মুখ শুকিয়ে যাওয়া, স্বাদের পরিবর্তন, জিবে অস্বাভাবিক জ্বালা বা অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, এগুলো তখন দেখা দিতে পারে।”
“অনেক নারী মাসিকের আগে বা মাসিক চলাকালে জিবে ব্যথা, মুখে ঘা বা জ্বালাপোড়ার কথা জানান। বেশিরভাগ সময় তারা ভাবেন এটা হয়ত দাঁতের সমস্যা। তবে এর পেছনে থাকে হরমোনের প্রভাব। তাই লক্ষণ দেখলে কারণ খোঁজাটা জরুরি”, পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।
পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে কোনো রোগ
জিবের সমস্যাকে অনেকেই নিছক মুখের রোগ ভাবেন। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, এটি অনেক সময় শরীরের গভীরের কোনো রোগের প্রথম বাহ্যিক লক্ষণ হতে পারে।
ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তশূন্যতা, অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রিক রিফ্লাক্স, কিডনি বা বৃক্ক অথবা লিভার মানে যকৃতের কিছু জটিলতা, ‘অটো ইমিউন’ রোগ, সোরায়সিস এমনকি জোগ্রেন সিনড্রোমের মতো রোগেও মুখ শুকিয়ে গিয়ে জিব ফেটে যেতে পারে।
মানসিক কারণও প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিদ্রা জিবে জ্বালাপোড়া বাড়িয়ে দিতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে 'বার্নিং মাউথ সিনড্রোম' দেখা যায়, যেখানে জিবে আগুন ধরে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। অথচ দেখতে গেলে তেমন কোনো ক্ষত নেই।
“এই অবস্থা চেনা এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা করা দরকার”, মন্তব্য করেন ডা. নয়ন।
এছাড়া মুখে ছত্রাকে সংক্রমণ বা ভাইরাসের সংক্রমণেও জিবে প্রদাহ তৈরি করতে পারে।
দাঁতের ধারালো ভাঙা অংশ, ত্রুটিপূর্ণ কৃত্রিম দাঁত বা ধাতব ফিলিং, জিবের একই জায়গায় বারবার ঘষা লেগে ঘা তৈরি করে।
অতিরিক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার, ধূমপান, পান-জর্দা, অ্যালকোহল বা অতিরিক্ত মসলাদার খাবারও জিবে ফাটল ও জ্বালার কারণ হতে পারে।
এমনকি কিছু টুথপেস্ট বা কসমেটিক পণ্যে অ্যালার্জির কারণে জিবে জ্বালা হওয়ার ঘটনাও বিরল নয়।
যা করতে পারেন
সমস্যার শুরুতেই কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে উপকার পাওয়া সম্ভব। প্রতিদিন প্রচুর পানি পান করতে হবে। মুখগহ্বর আর্দ্র রাখা জরুরি।
ডা. নয়ন বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে কিছুদিনের জন্য ঝাল, টক এবং অতিরিক্ত গরম খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। ধূমপান এবং পান-জর্দার মতো তামাকজাত দ্রব্য থেকে যত দ্রুত সম্ভব বিরত থাকতে হবে।”
নিয়মিত দাঁত ও জিব পরিষ্কার রাখা উচিত। তবে অতিরিক্ত শক্তি দিয়ে ব্রাশ করা যাবে না। খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ডিম, মাছ, দুধ, শাকসবজি, মৌসুমি ফল, বাদাম ও ডাল প্রতিদিনের পাতে রাখার চেষ্টা করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক বিশ্রামও কম জরুরি নয়।
ঘরোয়া যত্নে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সমস্যা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
খাওয়া বা গেলার সময় কষ্ট হলে, জিব বা মুখ থেকে রক্ত পড়লে, মুখের ভেতরে সাদা বা লাল দাগ দেখা দিলে, হঠাৎ ওজন কমতে থাকলে বা জ্বালা বাড়তেই থাকলে, দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
জিব শুধু স্বাদ নেওয়ার অঙ্গ নয়। শরীরের ভেতরে কী ঘটছে, সেটাও এই ছোট্ট অঙ্গটি আগেভাগে জানিয়ে দেয়। তাই এসব সংকেত অবহেলা না করে, সময় মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
আরও পড়ুন
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পানীয়