Published : 12 Jan 2026, 02:03 PM
সুন্দরবনের সৌন্দর্য এতটাই মুগ্ধকর যে, বারবার ভ্রমণের পরেও একঘেয়ে লাগে না।
“ডিসেম্বরের শুরুতে সুন্দরবনে ছিল আমার তৃতীয়বারের মতো ভ্রমণ। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিবারই আমার মনে হয়; আমি যেন প্রথমবারের মতো নতুন করে সুন্দরবনকে চিনছি, স্পর্শ করছি, আবিষ্কার করছি। প্রকৃতির এই অরণ্য-সাম্রাজ্য আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। এবারের ভ্রমণটি হয়তো সময়ের কারণে, কিংবা হয়তো প্রকৃতির খেয়ালে ছিল একেবারেই অন্যরকম, অসাধারণ”- এভাবেই মনেরভাব প্রকাশ করেন ভ্রমণ-পিয়াসু আমিনা মুন্নি।
তার মুখ থেকেই জানা গেল সুন্দরবন ভ্রমণের আদ্যোপান্ত।

শীতের শুরুতে এসে আকাশ আর প্রকৃতি যেন শীতের আগমনের আগেই নিজেকে শেষবারের মতো নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছিল। ঝকঝকে নীল আকাশ, তুলোর মতো শুভ্র মেঘ, আর সেই আলো–ছায়ার খেলা সুন্দরবনকে করে তুলেছিল আরও স্বচ্ছ, প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর অবিশ্বাস্যভাবে সুন্দর।
ভ্রমণ শেষে মনে হল বছরের এই সময়টাই যেন সুন্দরবন দেখার জন্য প্রকৃতির পক্ষ থেকে সেরা উপহার।
ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন কাকডাকা ভোরে কুয়াশা ঢাকা পথ মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে প্রায় কিলো দুয়েক তৃণভূমি পারে হয়ে আমরা পৌঁছলাম জামতলা বিচে।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য মুগ্ধ করার পাশাপাশি এখানে গেলে দেখা মিলবে বছরের পর বছর কী করে আজও সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে বুক আগলে আমাদের রক্ষা করে চলেছে।
কটকা অফিস পাড়া লাগোয়া মনোমুগ্ধকর সৈকতের সুন্দর মোহনীয় রূপ এককথায় অবর্ণনীয়।

বনের গভীরে কচিখালীর ঘন জঙ্গল পেড়িয়ে সরু খাল দিয়ে আমরা যখন নৌকায় করে যাচ্ছিলাম, সু্র্য তখন খানিকটা পশ্চিম আকাশে। ঘন জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে সূ্র্যের তীর্যক আলো বনকে করে তুলেছিল অদ্ভুত রহস্যময়। ঠিক যেন গা ছমছমে এক অনুভূতি।
পথিমধ্যে মাঝে মধ্যেই দেখা মিল ছিল চিত্রা হরিণের দলের। কি অপূর্ব সুন্দর তাদের দেখতে! সুনসান পথ ধরে এগোতে এগোতে প্রায়ই মনে হচ্ছিল বনের নিস্তব্ধতা আমাদের চারপাশে পাক খেয়ে রহস্যের ঘোমটা ফেলছে। যেন বাঘ মামা আশপাশেই কোথাও ধাপটি মেরে আছে। এই তাড়া করলো বলে।
অত্যন্ত ভীতিকর সেই নীরবতা সাথে করেই বনের পায়ে হাঁটা পথে আমরা টাইগার পয়েন্ট ঘুরে ফিরলাম।

পরের গন্তব্য ডিমের চর। যার নাম দিয়েছি আমি দিয়েছি মায়াদ্বীপ! পড়ন্ত বিকেলের গোধূলি লগ্নে লাল কমলা নীল সাদার অদ্ভুত মিশেলে নৈসর্গিক আকাশ আমাদের কিছু সময়ের জন্য থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করল।
সাথে সাগর তীরে ক্রমাগত আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ছন্দ। সৈকতের ঠাণ্ডা পানিয়ে পা ভিজিয়ে সুর্যাস্ত দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, সময়টাও না হয় কিছু সময়ের জন্য জিরিয়ে নিক আমাদের সাথে।
সূর্যাস্তের সে নরম আলোতে সুন্দরবন যেন নিজের আরেকটি রহস্যময় রূপে ধরা দিল। খানিকটা বিষণ্ণ, একটু শান্ত, আর অদ্ভুত এক মায়ায় ভরা। তবে রোমাঞ্চের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও পিছু ছাড়ছিল না। বাঘের অদৃশ্য উপস্থিতি যেন প্রতিটি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছিল এই রাজ্যের প্রকৃত মালিক সে-ই।

তবুও সুন্দরবনের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি বাঁক একেকটা গল্পের মতো মনে হচ্ছিল, আর চোখের সামনে হরিণের উপস্থিতি, পুরো বনের প্রাণকে যেন জীবন্ত করে তুলছিল।
সাঁঝবেলায় আকাশ জুড়ে উঁকি দিয়েছিল এক ফালি চাঁদ। শুভ্র নরম আলোয় ভরা সেই চাঁদ আমাদের যাত্রাকে করে তুললো আরও প্রশান্তিময়। চাঁদের কোমল আলোয় আশ্চর্যভাবে মায়াবী হয়ে ওঠা আকাশ যেন নিজেই আমাদের দিকে হাসছিল। রাত গভীর হতে না হতেই সাক্ষী হলাম আরেক বিষ্ময়কর অভিজ্ঞতার।
মাঝরাতে লঞ্চের ছাদে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল পুরো আকাশটা যেন আমাদের খুব কাছে নেমে এসেছে। তারা ভরা সেই আকাশে ঝিঁকিমিকি আলো, লুকোচুরি, ছুটোছুটি, সে যে কতটা বিস্ময় জাগানিয়া!

এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য জীবনে দেখতে সত্যি বুঝি ঈশ্বরের কৃপা থাকতে হয়।
প্রকৃতির চমক তখনও কিছুটা বাকী ছিল। পরদিন কোনও রকম নোটিশ ছাড়াই হল এক পশলা বৃষ্টি। আর বৃষ্টি শেষ হতে না হতেই সুন্দরবনের মাঝে হুট করে ধরা দিল নীল আকাশ জুড়ে বাঁধানো অপূর্ব সুন্দর এক রংধনু।
যেন প্রকৃতি নিজেই আমাদের জন্য তুলি দিয়ে এঁকে দিলতার সবচেয়ে রঙিন হাসিটা।
নীল আকাশ বুকে জড়ানো সেই রংধনু এতটাই সুন্দর, এতটাই স্বচ্ছ, যে চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। যেন প্রকৃতি আমাদের উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো বলল— ‘এই সৌন্দর্য কেবল তোমাদের জন্যই।’

সুন্দরবনে আমরা আরও গিয়েছিলাম সমুদ্রের মাঝখানে মাথা তুলে দাঁড়ানো ছোট্ট একটু দ্বীপ দুবলার চরে। সেখানে বছরের মাত্র কয়েকটা মাস জেলেরা অস্থায়ীভাবে আবাস তৈরি করে থাকে। তখন সেখানে গড়ে উঠে শুটকি পল্লী। শুনেছি এখানকার রাস মেলা খুব জমজমাট করে আয়োজন করা হয়। রাস মেলার সময়টাতে এই দ্বীপ দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। সেখানে মেলে বাহারি সব পণ্য আর ও মজার সব খাওয়া-দাওয়া। থাকে বিনোদনের নানান আয়োজন।

সুন্দরবনে আমরা আরও ঘুরেছি, হিরন পয়েন্ট, আন্ধারমানিক, হাড়বাড়িয়া ও করমজলে। করমজলে রয়েছে কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র। কুমিরের সাথে সাথে সেখানে দেখা মিলবে হরিণ আর বানরেরও।
এবার আসি সুন্দরবনে খাবারের। সুন্দরবন ভ্রমণের অন্যতম অংশ কিন্তু খাওয়া দাওয়া। যে কোনো লঞ্চেই যান না কেন; খাবারে বৈচিত্র্য আর স্বাদ আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
আমাদের ভ্রমণের তিনবেলার খাবার তালিকাতে ছিল চুইঝাল দিয়ে গরুর মাংস, খিচুড়ি, নদীর থেকে তোলা বিভিন্ন জাতের টাটকা মাছের ঝোল, বারকিকিউ, ছিল নানান পদের ভর্তা আর শাক।

লঞ্চের বাবুর্চির অসাধারণ রান্নার সত্যি যেন জুড়ি মেলাভার। এই বিপুল ভূরিভোজের বিষয়টি কিন্তু সুন্দরবন ভ্রমণের অন্যতম অনুষঙ্গ। এটি ছাড়া সুন্দনবন ভ্রমণ প্রায়ই অসম্পূর্ণ।
প্লাস্টিক বিহীন সুন্দরবন
এবারের সুন্দরবন ভ্রমণের সুন্দর অন্যতম যে বিষয়টি চোখে পড়েছে তা হল প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেটের অনুপুস্থিতি!
লঞ্চের কর্মচারীদের মারফত জানতে পারলাম বনকে দূষণ ও প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে বন কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড উভয়েই এই বিষয়ে বেশ সতর্ক ভূমিকা রাখছে।

প্রয়োজন আরও সচেতনতার
দেশে কিংবা দেশের বাইরে, ভ্রমণের সময় পর্যটকদের আরও সচেতন আচরণ করা প্রয়োজন। যত্রতত্র ময়লা না ফেলা, বনে জঙ্গলে বা প্রাকৃতিক যে পরিবেশে গেলে অহেতুক চেঁচামেচি বা শোরগোল না করা বা উচ্চ ভলিউমে গান বাজানো, একজন ভ্রমণকারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব এটি।
আমাদের নিজেদের যেমন এই বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। তেমনি অন্যদেরকেও এই ধরনের কাজ করতে দেখতে বিরত থাকতে অনুরোধ করতে হবে।
এইবারের সুন্দরবন ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি আলো–ছায়ার খেলা, প্রতিটি পথ—আমার মনে এক অনির্বচনীয় শান্তি আর বিস্ময় রেখে গেছে। সুন্দরবন শুধু ভ্রমণ নয়—এ এক অভিজ্ঞতা, এক অনুভূতি, এক গভীর প্রশান্তি। এই বনের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখলে হয় না, এটিকে অনুভব করতে হয়।

পড়ন্ত বিকালে সুন্দরবনকে পেছনে ফেলে যখন মংলা বন্দরে ফিরে আসছি, তখনও মন পড়ে রয়েছে বনে গহীনে যেখানে নেই কোন কোলাহল, নেই কোন যান্ত্রিকতা, কিংবা তাড়াহুড়ো।
ফেরার পথে দৃষ্টিসীমায় যতদূর চোখ যায়, সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে জীবনান্দের মতো করে বললাম, ‘আমি আবার আসিব ফিরে…’
খরচপাতি
সাধারণত সুন্দরবন ভ্রমণের খরচ ট্যুর প্যাকেজের মধ্যেই থাকে। তবে প্যাকেজভেদে খরচের কিছুটা পার্থক্য হতে পারে।
বাজেট প্যাকেজ: নন-এসি কেবিন ও সাধারণ খাবারসহ দুই রাত তিন দিনের ট্যুর প্যাকেজে জনপ্রতি আনুমানিক ৭,০০০ থেকে ৯,৫০০ টাকা খরচ হয়।
স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজ: তুলনামূলক উন্নত থাকার ব্যবস্থা ও খাবারসহ এই প্যাকেজে জনপ্রতি খরচ প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৪,০০০ টাকা।
প্রিমিয়াম বা লাক্সারি প্যাকেজ: এসি কেবিন, উন্নত সার্ভিস ও বিশেষ সুবিধাসহ এই ধরনের প্যাকেজে জনপ্রতি খরচ হয় প্রায় ১৬,০০০ থেকে ২২,০০০ টাকা বা তার বেশি।
প্যাকেজে সুবিধাসমূহ: এই প্যাকেজগুলোর মধ্যে সাধারণত আরও কিছু সুবিধা থাকে যা ভ্রমণকারীরা পেয়ে থাকেন।
জাহাজে থাকা ও যাতায়াত, প্রতিদিন তিন বেলা খাবার, প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড, বন বিভাগের অনুমতিপত্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন স্পট দেখার সুযোগ পান ভ্রমণকারীরা।
যাতায়াত ব্যয়: যদি ট্যুর প্যাকেজে ঢাকা থেকে যাতায়াত অন্তর্ভুক্ত না থাকে, তবে আলাদাভাবে যাতায়াত ব্যয় যোগ হয়।
ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে বাস বা ট্রেনে জনপ্রতি আনুমানিক খরচ ১,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মতো।
অতিরিক্ত খরচ: ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কেনাকাটা, বিশেষ কেবিন সুবিধা বা অন্যান্য ঐচ্ছিক সেবার জন্য অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সুন্দরবন ভ্রমণের খরচ পর্যটকের পছন্দ, প্যাকেজের ধরন এবং ভ্রমণের সময়ের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
তবে গড়ে একজন পর্যটকের জন্য তিন দিনের সুন্দরবন ভ্রমণে মোট খরচ ৮,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
আরও পড়ুন