১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৯ | সমাপ্তি

মাঠের বুক চিরে চলে যাওয়া পথটা ধরল সে। দেখতে দেখতে গ্রামটা অনেকখানিই পেছনে পড়ে গেল।

আজহার ফরহাদ আজহার ফরহাদ

Published : 13 Sep 2026, 03:29 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:59 AM

লিটল পিয়ার যেদিন নদীতে পড়ে গেল

গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এক ভীষণ গরমের দিন। রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছিল। সেই রোদের মধ্যেই লিটল পিয়ার একটা শসা খেতে খেতে গাঁয়ের পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে। খালি পা দুটো পুরু হলুদ ধুলোর মধ্যে ঘষটে ঘষটে চলেছে। “আহ্!” একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বলল সে, “কী গরম!—আর আমার বন্ধুরাই বা সব গেল কোথায়?”

পথঘাট একেবারে ফাঁকা। তার কারণ, প্রায় সবাই তখন ঘুমাচ্ছিল। এমন গরমে কারই বা পথে বেরিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে! এমনকি বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্যও যে গরমটা বেশিই। কিন্তু লিটল পিয়ারের আবার সবসময়ই কিছু-না-কিছু করতে ইচ্ছে করে। “আমি জানি, কী করতে হবে,” ভাবল সে। “নদীর ধারে গিয়ে নৌকাগুলো দেখি।”

ঠিক তখনই পথের মোড় ঘুরে একটি শিশুকে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে আসতে দেখল সে। মুহূর্তেই বেশ খুশি হয়ে উঠল লিটল পিয়ার। গাঁয়ের প্রায় অর্ধেকটা সে হেঁটে এসেছে, অথচ একটা শূকর আর কয়েকটা মুরগি ছাড়া এতক্ষণ কারও দেখা পায়নি। কিন্তু শিশুটি একটু কাছে আসতেই সে দেখল—এ তো সেই বড় মাথার ছোট ভাইটা! 

ছোট্ট ছেলেটার পরনে ছিল একটা লাল খাটো অ্যাপ্রোন—হীরার আকৃতির মত দেখতে। এটিই কেবল তার গায়ে ছিল। কারণ, চীনা শিশুরা গ্রীষ্মকালে খুব বেশি পোশাক তো পরে না। মাথাটাও ছিল ন্যাড়া, শুধু কপালের ওপর দিয়ে একগোছা চুল ঝুলছে। ছেলেটা বেশ দ্রুত গুটিগুটি পায়ে ছুটে চলছিল। লিটল পিয়ারের কাছে এসে পড়তেই সে তাকে থামাল। “এভাবে ছুটতে নেই খোকা,” বলল লিটল পিয়ার।

ছেলেটার হাত ধরে তাকে বড় মাথাদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সে। বড় মাথা যে তখন দরজার গায়ে হেলান দিয়ে একেবারে গভীর ঘুমে তলিয়ে। লিটল পিয়ার ছোট ভাইটিকে তুলে দোরগোড়ার ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। নিজের শসাটার যেটুকু বাকি ছিল, সেটাও তার হাতে দিয়ে বলল, “এখানেই থেকো। আবার পালিয়ে গেলে পথ হারিয়ে ফেলতে পারো।” তারপর হঠাৎ তার মাথায় একটা বেশ ভালো বুদ্ধি এল। নিজের গলা থেকে সৌভাগ্যের হারটা খুলে ছেলেটার গলায় পরিয়ে দিলো।

“এবার তুমি নিরাপদে থাকবে,” বলল সে। তার মাথায় আদর করে একটু হাত বুলিয়ে আবার নিজের পথে চলল লিটল পিয়ার। বেশ ভালোই লাগছিল নিজের ওপর। আবার ভাবল, “আমি নদীর ধারে গিয়ে জাহাজ দেখব।” নদীর পথ ধরল সে।

নদী ছিল বেশ দূরে। মাঠের বুক চিরে চলে যাওয়া পথটা ধরল সে। দেখতে দেখতে গ্রামটা অনেকখানিই পেছনে পড়ে গেল। মাথার ওপর তখনও রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছে। সেই রোদের মধ্যেই খালি পায়ে তরতর করে হেঁটে চলেছে লিটল পিয়ার। মাঠগুলোও গ্রামের মতোই একেবারে জনশূন্য। নদীর কাছে এসে পড়ার পর উইলো গাছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দই কানে এলো না।

একটু পরেই সে এসে দাঁড়াল নদীর উঁচু পাড়ে। নিচে নদীর দিকে তাকাল। প্রথমে তাকাল নদীর উজানের দিকে, তারপর ভাটির দিকে। আর সেই পুরো সময়টায় দুহাতে একটা উইলো গাছ শক্ত করে ধরে রাখতে ভুলল না।

নদীতে ভারি স্রোত, পানিও ঘোলা। তার ওপর রোদ পড়ে ছোট ছোট ঢেউগুলো কখনো বাদামি, কখনো নীল হয়ে ঝিকমিক করছে। লিটল পিয়ার যে পাড়ে দাঁড়িয়ে, ঠিক তেমনি উলটো পাড়েও সারি সারি উইলো গাছ। গাছগুলোর বাকল খসখসে, ডালপালা ঝুঁকে পড়েছে পানির ওপর। দুই পাড়ের মাঝখান দিয়ে কত নৌকা যে ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক চলেছে! এখানে যেন সবাই দিব্যি জেগে আছে। লিটল পিয়ারের মনে পড়ল পেছনে ফেলে আসা ঘুমন্ত গ্রামটার কথা। নদীর ধারে এসেছে বলে তার ভারি ভালো লাগল।

অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

কত রকমের যে নৌকা! বড় বড় নৌকা—তাতে মাস্তুল আছে, পাল আছে। আবার ছোট ছোট নৌকা—তাতে ওসব কিছুই নেই। কোনো নৌকায় বিরাট মাছধরার জাল মেলে রাখা, দেখতে যেন মস্ত এক মাকড়সার জাল। আবার মালবোঝাই চ্যাপটা নৌকাও আছে। সেসব নৌকায় কত কী বিক্রি করতে নিয়ে চলেছে লোকেরা! কোনো নৌকায় বাঁধাকপি, কোনো নৌকায় গুটিয়ে রাখা মাদুরের বোঝা, আবার কোনোটায় বস্তা। সেই বস্তাগুলোর ভেতরে যে কত রকম মজার জিনিস থাকতে পারে—ভাবল লিটল পিয়ার।

বড় নৌকাগুলোর সামনের দিকে আঁকা ছিল দুটো করে চোখ—যাতে তারা দেখতে পায়, কোন দিকে যাচ্ছে। নৌকার মালিকেরা তাই খুব সাবধান থাকত, ওই চোখের সামনে যেন কিছু ঝুলে না থাকে। নইলে ছোট ছোট নৌকার ফাঁক দিয়ে চলার সময় তারা পথ দেখবে কী করে!

লিটল পিয়ারের ইচ্ছে হলো, আহা, তারও যদি নিজের একটা নৌকা থাকত! কিন্তু কেমন নৌকা চাই, সেটাই সে ঠিক করতে পারল না। ছোট্ট একটা নৌকা, যেটা সে নিজেই দাঁড় বেয়ে চালাতে পারবে? নাকি তার চেয়ে একটু বড়, যেটা লম্বা লগি ঠেলে চালানো যায়? নাকি পাল-তোলা একটা বড় নৌকা?

শেষ পর্যন্ত লিটল পিয়ার ঠিক করল, বড় হয়ে তার সবচেয়ে বেশি চাই একটা মাছ-ধরা নৌকা। তাহলে সে নিজের খাবারের জন্য মাছ ধরতে পারবে, আবার মাছ নিয়ে শহরে গিয়ে বিক্রিও করতে পারবে। আহা, কী মজাই না হবে! 

উইলো গাছটা শক্ত করে ধরে লিটল পিয়ার নদীতে নৌকাগুলোর আসা-যাওয়া দেখতে লাগল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল—ইশ্, যদি তাড়াতাড়ি বড় হওয়া যেত! এমন সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ল নদীর সবচেয়ে সুন্দর নৌকাটি। ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।

এ যে একটা নৌকাবাড়ি!

“এমন একটা নৌকাই যদি আমার থাকত!” নৌকাটা যত কাছে আসছিল, মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতে ভাবছিল লিটল পিয়ার।

লম্বা, চ্যাপটা একটা নৌকা। তার ওপর সত্যি সত্যি ছোট্ট একটা ঘর। ঘরের ছাদে ধোঁয়া বেরোনোর জন্য একটা ফুটো, জানালাগুলো কাগজের। ডেকের এক পাশ দিয়ে এক লোক পায়চারি করছিল আর লম্বা একটা লগি ঠেলে নৌকাটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

লিটল পিয়ার মুগ্ধ হয়ে দেখল, নৌকায় কাপড় শুকোতে দেওয়া হয়েছে। নৌকার ডেকের ওপর বাচ্চারা খেলছিল। দেখতে দেখতে নৌকাটা আনন্দে ভেসে চলল, আর একসময় এসে পড়ল লিটল পিয়ারের একেবারে কাছাকাছি।

হঠাৎ বাচ্চাদের একজনের চোখে পড়ল লিটল পিয়ার। সে তার ভাইবোনদের ডেকে দেখাল। অমনি সবাই ছুটে এসে নৌকার ধারে ভিড় করল। নদীর পাড়ে একলা দাঁড়িয়ে থাকা লিটল পিয়ারকে দেখে তারা হাত নাড়তে লাগল। লিটল পিয়ারের কী যে ভালো লাগল! কিছু না ভেবেই সেও হাত নাড়বে বলে গাছটা ছেড়ে দিল। আর যায় কোথায়!

পিছলে গেল, তার পা দুটো খাড়া পাড়ের ওপর দিয়ে চলল—পিছলে, হড়কে—এবং ঝপাস! নদীর মধ্যে গিয়ে পড়ল লিটল পিয়ার! . . .

ঘোলা বাদামি জল তাকে ঘিরে বনবন করে পাক খেতে লাগল। কোনোমতে ভেসে উঠে লিটল পিয়ার হাঁসফাঁস করতে লাগল, কাশছিল আর মুখ দিয়ে পানি ছিটকে বেরোচ্ছিল। “আয়-হায়!” নৌকার বাচ্চারা চেঁচিয়ে উঠল। “ও ডুবে যাচ্ছে! ও ডুবে যাচ্ছে!”

লিটল পিয়ার যে সাঁতার জানত না। তার ওপর নদীর স্রোতে এত জোর যে তাকে পাড় থেকে টেনে নিয়ে চলল দূরে। বাঁচার জন্য সে দু-হাত ছুড়ে পাগলের মতো পানি চাপড়াতে লাগল। আরেকটু হলেই তলিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় নৌকার সেই লোকটি ছুটে এসে তার লম্বা লগিটা বাড়িয়ে দিলো। 

“ধরো! শক্ত করে ধরো!” চিৎকার করে বলল সে।

কিন্তু লোকটি কী বলছে, লিটল পিয়ার শুনতেই পেল না—তার কানের ভেতর যে পানি! লোকটিকেও সে প্রায় দেখতেই পাচ্ছিল না—চোখের ভেতরেও পানি! মুখে কিছু বলবে, তারও উপায় নেই—এত পানি গিলে ফেলেছে সে! তবু সে দুই হাত ছুড়ে পানিতে ছপছপ করতে লাগল—আর তারপর—তার হাত গিয়ে ঠেকল লগিটায়! অমনি শক্ত করে চেপে ধরল সে। প্রাণপণে তা আঁকড়ে ধরল। লোকটি তাকে টেনে নৌকার কাছে নিয়ে এলো। তারপর তুলে নিলো নিরাপদে ডেকের ওপর।

অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

কিছুক্ষণ লিটল পিয়ার সেখানেই পড়ে রইল। ভাবছিল, সে কি সত্যিই ডুবে গেছে, না এখনো বেঁচে আছে! আর তার মনে হচ্ছিল—হয়তো সে আর কোনোদিনই বাড়ির কাউকে দেখতে পাবে না।

একসময় সে চোখ মেলল। চেয়ে দেখে, তার মাথার ওপর গোল হয়ে ঘিরে আছে কতগুলো মুখ। সে এখন সেই নৌকাবাড়ির ওপর। চারপাশে সেই ছেলেমেয়েরা, যারা একটু আগে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাকে দেখে হাত নেড়েছিল। পাশে সেই লোকটিও, যে তাকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। আর আছে তাদের মায়ের স্নেহভরা মুখ। কী হয়েছে দেখতে ছোট্ট ঘরটা থেকে তিনিও তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছেন।

লিটল পিয়ার ওদের দিকে চেয়ে হাসল। সবাই তখন তাকে ঘিরে কত কথাই না বলতে লাগল—কী আশ্চর্য, ছেলেটা ডুবে গেল না! তার ফুল-আঁকা জামাটাও তাদের ভারি পছন্দ হলো, আর তার টিকিতে বাঁধা সবুজ ফিতেটাও।

“তুমি আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে?” বাচ্চারা জিজ্ঞেস করল।

তাদের মা বললেন, “তা কী করে হয়! ও তো ডাঙা থেকে এসেছে। বাড়ির সবাই এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভাবছে, ছেলেটা গেল কোথায়! পরের ঘাটে পৌঁছলেই ওকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।” 

নৌকাবাড়ি নদী বেয়ে এগিয়ে চলল। লিটল পিয়ার রোদে বসে গা শুকোচ্ছিল। ছেলেমেয়েরা তাকে গোল হয়ে ঘিরে বসেছে। নদীতে তাদের দিন কীভাবে কাটে, কত গল্পই না শোনাল তারা! আবার ডাঙার কথাও তাদের জানতে ইচ্ছের শেষ নেই। একটার পর একটা প্রশ্ন করতে লাগল লিটল পিয়ারকে। 

“আমরা তো কখনো ডাঙায় থাকিনি,” বলল তারা। “এই নৌকাটাই চিরকাল আমাদের বাড়ি।” এবার লিটল পিয়ারও গল্প জুড়ে দিলো। নিজের গ্রামের কথা বলল, বাড়ির সবার কথা বলল, বন্ধুদের কথা বলল, এমনকি তার ক্যানারি পাখিটার কথাও বাদ গেল না। বলতে বলতে কেমন যেন বাড়ির জন্য মনটা টানতে লাগল তার। আহা, সবাইকে যদি আবার দেখতে পেত! কিন্তু নৌকা চলেই যাচ্ছে। ব্যস্ত নদীর বুক দিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলেছে সামনে। আর লিটল পিয়ারকে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে দূরে—আরও দূরে।

অনেকটা যাওয়ার পর শেষমেশ তারা পরের ঘাটে এসে পৌঁছল, নৌকাবাড়ি থামল। লিটল পিয়ারকে নামিয়ে দেওয়া হলো ডাঙায়। নতুন বন্ধুদের বিদায় বলতে তার ভারি মন খারাপ হলো। পাড় বেয়ে পথটা ওপরে উঠে গেছে। লিটল পিয়ার সেই পথ ধরে খানিকটা উঠে দাঁড়াল। তারপর চেয়ে রইল নৌকাটার দিকে। নৌকা ভেসে চলল নদীর অনেকটা দূর পর্যন্ত। ছেলেমেয়েগুলো তখনও তার দিকে হাত নাড়ছে। কিন্তু লিটল পিয়ার এবার দু-হাতে একটা গাছ শক্ত করে ধরে রইল—আবার নদীতে পড়ে যেতে চায় না সে! একসময় নৌকাটি নদীর একটি বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। লিটল পিয়ার এবার বাড়ির পথ ধরল।

দূরে, মাঠের ওপারে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। লিটল পিয়ার হাঁটল আর হাঁটল, হাঁটতেই থাকল। বাড়ির পথ যে অনেক! নৌকাটা তাকে নদী বেয়ে এক-দুই মাইল দূরে নিয়ে এসেছিল। 

“আয়-হায়,” মনে মনে বলল লিটল পিয়ার, “শিগগিরই তো অন্ধকার হয়ে যাবে!” 

ক্লান্ত পা দুটোকে তাই আরেকটু জোরে চালাল সে। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, যদি আবার সেই বন্ধু লোকটির মতো কোনো দয়ালু মানুষের দেখা পাওয়া যেত—যে তাকে একদিন শহরে নিয়ে গিয়েছিল! কিন্তু নদীর ধারের পথ একেবারে ফাঁকা। মাঠও ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। লিটল পিয়ারের মনে হলো, এই গোটা দুনিয়ায় বুঝি সে ছাড়া আর একটি মানুষও নেই।

সে হাঁটল আর হাঁটল, হাঁটতেই থাকল। 

অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষণ। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার। অনেকটা পথ যাওয়ার পর অবশেষে সামনে গ্রামের আবছা অবয়ব চোখে পড়ল তার। গ্রামের কাছে যেতেই কুকুরগুলো তাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। “ঘেউ ঘেউ কোরো না!” লিটল পিয়ার চেঁচিয়ে বলল। “আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তো লিটল পিয়ার!” 

নিজেদের বাড়ির ফটকের কাছে এসে সে দেখল, দু-পাশের পাথরের সিংহ দুটোকে আজ ভারি ভয়ংকর দেখাচ্ছে। “এরা এখন আর হাসছে না, গর্জাচ্ছে,” মনে মনে ভাবল সে। তারপর জোরে বলল, “আমাকে কামড়াবে না। আমি লিটল পিয়ার!” এই বলে উঠোন পেরিয়ে এক ছুটে বাড়ির দরজায় গিয়ে পৌঁছল। 

“দরজা খোলো!” চেঁচিয়ে উঠল সে। “আমি লিটল পিয়ার!” 

অমনি ঝট করে দরজা খুলে গেল। “লিটল পিয়ার!” মা, দাগু আর এরগু—তিনজনেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। তারপর সবাই মিলে তাকে জড়িয়ে ধরল। 

আহা, আবার নিজের বাড়িতে ফিরে এসে লিটল পিয়ারের কী যে আনন্দ! আর তাকে ফিরে পেয়ে বাড়ির সবারই বা কী আনন্দ!

“কোথায় ছিলে তুমি?” সবাই একসঙ্গে বলে উঠল। “সারা বিকেল ধরে আমরা তোমাকে খুঁজেছি। এখনও লোকেরা লণ্ঠন নিয়ে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।”

লিটল পিয়ার তখন সব খুলে বলল—কী করে সে গ্রাম ছেড়ে নদীর দিকে গিয়েছিল, কী করে নদীতে পড়ে গিয়েছিল, আর কী করেই-বা তাকে উদ্ধার করা হলো। সব শুনে মা তার জন্য গরম খাবার তৈরি করতে গেলেন। দাগু চুলায় কেতলি চাপাল। আর এরগু ছুটল সারা গ্রামে খবর দিতে—লিটল পিয়ার ফিরে এসেছে!

একটু পরেই উঠোনে অনেক মানুষের পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। দেখতে-দেখতে ছোট্ট ঘরটা লোকে ভরে গেল। লিটল পিয়ারের বাবা এসেছেন। তার সঙ্গে এসেছেন সেই লোকেরাও, যারা এতক্ষণ তার সঙ্গে লিটল পিয়ারকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এরগুও ফিরে এসেছে—দৌড়ে এসে হাঁপাচ্ছে, চোখ দুটো আনন্দে ঝলমল করছে। আশপাশের যত প্রতিবেশী আর কাছের বন্ধু, তারাও সবাই এসে হাজির। বড় মাথাও এসেছে। উত্তেজনায় তার চোখমুখ চকচক করছে। সঙ্গে তার ছোট্ট ভাইটি—সে দিব্যি একটা তাংহুলুর খাচ্ছে। তার গলায় তখনও লিটল পিয়ারের দেওয়া সেই সৌভাগ্যের হারটি ঝুলছে।

লিটল পিয়ার তাকে বলল, “হারটা তোমার কাছেই রেখে দাও। তুমি তো এখনও খুব ছোট, তোমার যদি কিছু একটা হয়ে যায়! কিন্তু আমি এখন বড় ছেলে। আমি আর কোনোদিন এভাবে পালিয়ে যাব না।”

শুনে সবাই খুব খুশি হলো। কেউ লিটল পিয়ারের মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিলো, কেউ একটু চাপড়ে দিলো। আর বড় মাথার ছোট্ট ভাইটি তার তাংহুলুর যেটুকু বাকি ছিল, সেটুকুই লিটল পিয়ারকে দিয়ে দিলো।

সবাই বলল, “তুমি যখন দুষ্টুমি করতে, তখনও আমরা তোমাকে খুব ভালোবাসতাম। আর এখন যদি ভালো ছেলে হয়ে থাকো, তা হলে তোমাকে আরও বেশি ভালোবাসব।”

“এখন থেকে আমি সবসময় ভালো ছেলে হয়ে থাকব,” খুব জোরে মাথা নেড়ে কথা দিলো লিটল পিয়ার। এরগু তার ছোট্ট ভাইটির দিকে চেয়ে রইল। হঠাৎ কেন যেন তার বেশ মন খারাপ হলো। 

সে আস্তে করে বলল, “লিটল পিয়ার বড় হয়ে যাচ্ছে।”

সমাপ্ত

আগের পর্ব

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ১

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ২

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৩

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৪

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৫

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৬

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৭

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৮