ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৭
বাবা বাড়ি ফিরলেন একেবারে নতুন একটা খাঁচা নিয়ে। আর খাঁচার ভেতরে—একটি ছোট্ট হলুদ পাখি!
ক্যানারি পাখিটা যেভাবে উড়ে গেল
“চিঁ-চিঁ-চিঁ!” দরজার কাছেই খাঁচার মধ্যে বসে গান গাইছিল ক্যানারি পাখিটা। “চিঁ-চিঁ!” বলতে বলতে সে একবার তার বসার ডাল থেকে দোলনায় লাফিয়ে যাচ্ছে, আবার দোলনা থেকে ফিরে আসছে ডালে।
দোরগোড়ায় বসে লিটল পিয়ার মুখ তুলে পাখিটার দিকে চেয়ে ছিল। “ইশ্, তুমি যে কী বলছ, যদি বুঝতে পারতাম!” বলল সে।
“চিঁ-চিঁ!” জবাব দিল পাখিটা। মাথাটা একদিকে কাত করে কৌতূহলী চোখে নিচে লিটল পিয়ারের দিকে চেয়ে রইল।
“ও তো আমার সঙ্গেই কথা বলছে!” ভাবল লিটল পিয়ার। অমনি তাড়াতাড়ি উঠে একটা টুল টেনে নিয়ে এলো খাঁচার কাছে। তারপর এর ওপর চড়ল, যাতে পাখিটাকে আরও ভালো করে দেখতে পায়।
“কী বলছ তুমি?” জিজ্ঞেস করল সে। “তোমার কি খিদে পেয়েছে? কিন্তু তোমার তো বাটি ভরা খাবার! এত দানা পড়ে আছে, একটাও তো খাওনি!”
“চিঁ-চিঁ,” বলেই চলল পাখিটা।
“তা হলে বুঝি তেষ্টা পেয়েছে,” ভাবল লিটল পিয়ার। অন্য বাটিটায় উঁকি দিয়ে দেখল সে। কিন্তু না, সেখানেও তো ঢের পানি। “তোমার কোনো সমস্যাই হতে পারে না, বোকা পাখি!” একটু কড়া গলায় বলল লিটল পিয়ার। “খাবার আছে, পানি আছে, আর এমন সুন্দর একটা খাঁচাও তো আছে।”
কিন্তু এবার ক্যানারি পাখিটা এমন দুঃখী গলায় “চিঁ” করে উঠল যে, লিটল পিয়ার বুঝতে পারল—পাখিটা নিশ্চয়ই কিছু একটা চাইছে।
রোদ ঝলমল করছিল বাইরে। গরমকালও প্রায় এসে গেছে। গ্রামের চারপাশের মাঠ তখন গজিয়ে ওঠা শাকসবজিতে সবুজ হয়ে উঠেছিল। লিটল পিয়ার টুল থেকে নেমে দরজার মুখে এসে দাঁড়াল। রোদ-ভরা উঠোনের ওপারে চেয়ে দেখল খোলা ফটক দিয়ে বাইরের পৃথিবীটা। যেখানে সে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছে সবুজ মাঠ। আর সেই মাঠ ছাড়িয়ে বহু দূরে, নদীর ধারে সারি সারি সবুজ উইলো গাছ।
দুনিয়াটা যে কত বিশাল, কত সুন্দর!
আকাশের অনেক উঁচুতে ছোট ছোট সাদা মেঘ অলসভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। এমন সময় একঝাঁক পায়রা উড়ে গেল। লিটল পিয়ার যখন ওদের তাকিয়ে দেখছিল তার কানে বেজে উঠল সুর।
ওসব ছিল পোষা পায়রা। মালিকেরা ওদের ছেড়ে দিত আকাশে উড়ে বেড়াতে। তবে ছেড়ে দেওয়ার আগে পায়রাগুলোর লেজে বেঁধে দিত নলখাগড়ার তৈরি ছোট ছোট অদ্ভুত বাঁশি। পায়রারা যখন আকাশে উড়ে বেড়াত, বাতাস এসে সেই বাঁশিগুলোতে আপনিই সুর তুলত।
“আহা, পায়রাগুলোর কী মজাই না হচ্ছে!” মনে মনে ভাবল লিটল পিয়ার। সে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না ওরা একটি বাঁকানো ছাদের আড়ালে উড়ে চলে গেল। আর দেখা গেল না। লিটল পিয়ার আবার ফিরে তাকাল খাঁচার ভেতরের ছোট্ট পাখিটার দিকে। হঠাৎ যেন সব বুঝে গেল সে।
“এবার বুঝেছি তুমি কী চাও,” বলল লিটল পিয়ার। “তুমি উড়ে চলে যেতে চাও, তাই না!”
“চিঁ-চিঁ-চিঁ!” ভারি উত্তেজিত হয়ে ডেকে উঠল ক্যানারি। লিটল পিয়ার আবার টুলটার ওপর উঠে পড়ল। তারপর খাঁচার দরজা টেনে ওপরে তুলল।
“ফিরে এসো কিন্তু!” বলল সে। কিন্তু ক্যানারি পাখিটার তখন আর তর সইছিল না। মাঠের ওপর দিয়ে উড়ে আকাশে চলে যাওয়ার এমনই তাড়া ছিল তার যে, একবার “চিঁ” বলে বিদায় জানাতেও একটুখানি অপেক্ষা করল না ও।
সেদিন বিকেলের নাশতা খেতে বাড়ির সবাই যখন জড়ো হচ্ছিল, দাগু বলছিল, “পাখিটাকেও তো খাবার দিতে হবে।” কিন্তু খাঁচার দিকে তাকাতেই সে দেখল, খাঁচা খালি। “ওমা! আমাদের ক্যানারি কোথায় গেল?” চেঁচিয়ে উঠল দাগু।
লিটল পিয়ার বলল, “ও তো উড়ে চলে গেছে।”
“ওরে দুষ্টু ছেলে, তুমি কি পাখির খাঁচার দরজাটা খুলে দিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ,” একটু চিন্তিত হয়ে বলল লিটল পিয়ার, “কারণ ও-ই তো যেতে চেয়েছিল।”
“ও কি আর কখনো আমাদের কাছে ফিরে আসবে?” জিজ্ঞেস করল এরগু।
“আমি তো ওকে ফিরে আসতে বলে দিয়েছিলাম,” বলল লিটল পিয়ার।
ছোট্ট পাখিটা চলে যাওয়ায় বাড়ির সবারই খুব মন খারাপ। রোজ ছেলেমেয়েরা খালি খাঁচাটার দিকে তাকাত, তারপর আকাশের দিকে চেয়ে থাকত—পাখিটা বুঝি এই ফিরে আসছে!
একদিন বাবা বাড়ি ফিরলেন একেবারে নতুন একটা খাঁচা নিয়ে। আর খাঁচার ভেতরে—একটি ছোট্ট হলুদ পাখি! দেখেই ছেলেমেয়েরা আনন্দে লাফাতে লাগল।
“চিঁ-চিঁ-চিঁ!” গান ধরেছে সেই ছোট্ট পাখিটা।
“ও ফিরে এসেছে!” আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল লিটল পিয়ার।
“এ তো সেই পাখিটাই!” চেঁচিয়ে বলল এরগু।
কে জানে, হয়তো সত্যিই সেই পাখিটাই ছিল!
চলবে...
আগের পর্ব
