১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ১

প্রকাশের প্রায় এক শতাব্দী পরও সাহিত্যের আলোচনায় এটি টিকে আছে।

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ১
‘লিটল পিয়ার’-এর মলাট ও তার লেখক এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

আজহার ফরহাদ আজহার ফরহাদ

Published : 11 Aug 2026, 02:11 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

ভূমিকা

পাঁচ বছরের কোনো শিশু যদি একদিন চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে, তবে সে কী খুঁজতে যায়? শহর? নদী? মেলা? নাকি পৃথিবী? এই প্রশ্নের উত্তরই যেন ‘লিটল পিয়ার’। যুক্তরাষ্ট্রের লেখক এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের (১৯০৪–১৯৮৬) লেখা ক্লাসিক। প্রথম দেখায় বইটি খুবই ছোট। কাহিনিও আশ্চর্য রকমের সাধারণ। নেই কোনো জাদু, নেই রাক্ষস, নেই গুপ্তধনের খোঁজ, নেই দুর্ধর্ষ নায়ক। আছে শুধু গোলগাল, কৌতূহলী আর ডানপিটে ছোট্ট এক ছেলে, যে পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসকে প্রথমবারের মতো দেখে। 

অথচ এই সাধারণ গল্পটিই প্রকাশের প্রায় এক শতাব্দী পরও শিশু-কিশোর সাহিত্যের আলোচনায় টিকে আছে। কারণ, ‘লিটল পিয়ার’ আসলে পৃথিবী আবিষ্কারের গল্প নয়; পৃথিবীকে প্রথমবার বিস্ময়ের চোখে দেখার গল্প। এটি বিশ্ব শিশু-সাহিত্যের এক অনন্য ক্লাসিক। ছোট ছোট আন্তঃসংযুক্ত অধ্যায়ে রচিত এই বইয়ে একটি চীনা শিশুর দৈনন্দিন জীবন, তার কৌতূহল, দুষ্টুমি ও পৃথিবীকে আবিষ্কার করার আনন্দ অসাধারণ মমতায় ফুটে উঠেছে। 

এ বই পড়তে পড়তে খুব দ্রুতই অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে। কেবল পাঠক হয়ে থাকা যায় না; লিটল পিয়ারের পাশে হাঁটা শুরু করতে হয়। বরফের ওপর পিছলে, প্রথমবার শহরের ফটক দেখে থমকে দাঁড়িয়ে, আতশবাজির শব্দে চমকে, নদীর স্রোতে ভেসে, আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে এসে। এ বইয়ের সবচেয়ে বড় জাদু এখানেই—এখানে কোনো জাদু নেই, অথচ পড়তে পড়তে শৈশব নিজেই বিস্ময়ে পরিণত হয়। প্রতিটি অধ্যায় যেন শিশুজীবনের একেকটি স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা। আলাদা করে পড়লেও প্রতিটি গল্পের নিজস্ব আনন্দ আছে; আবার একসঙ্গে পড়লে ধীরে ধীরে এক শিশুর বিস্ময়ভরা পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ছবি গড়ে ওঠে।

শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু বই আছে, যেগুলো পড়া শেষ হলে পাঠকের মনে কোনো চমকপ্রদ ঘটনার স্মৃতি নয়, বরং এক শিশুর সঙ্গে কাটিয়ে আসা কয়েকটি দিনের উষ্ণ অনুভূতি রয়ে যায়। বইটির কাহিনি যেন ধীরে ধীরে মুছে যায়, কিন্তু থেকে যায় তার মানুষগুলো—একটি ছোট্ট ছেলে, তার মা-বাবা, দুই বোন, এক বন্ধু, একটি গ্রাম, একটি নদী, আর পৃথিবীকে প্রথমবার আবিষ্কার করার অদম্য কৌতূহল। ‘লিটল পিয়ার’ সেই বিরল বইগুলোর একটি।

১৯৩১ সালে প্রকাশিত এই বইয়ের রচয়িতা এলিয়েনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর। মার্কিন এ নারী লেখক ও চিত্রকরের সাহিত্যিক পরিচয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার শৈশবের অভিজ্ঞতা। জন্ম চীনের সাংহাইয়ে। বাবার কর্মসূত্রে শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফলে চীনের গ্রামীণ সমাজ, মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিশুদের খেলা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল প্রত্যক্ষ। পরে তিনি সেই অভিজ্ঞতাকেই শিশুদের জন্য গল্পে রূপ দিয়েছেন। তার রচিত ও অলঙ্কৃত বহু বইয়ের মধ্যে ‘লিটল পিয়ার’ই সর্বাধিক পরিচিত এবং দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা পাওয়া বই।

বইটি প্রকাশিত হয় এমন এক সময়ে, যখন ইংরেজিভাষী শিশুদের কাছে চীন ছিল প্রায় অচেনা এক দেশ। কিন্তু ল্যাটিমোর সেই দেশকে দেখিয়েছেন কোনো বিস্ময়কর বা রহস্যময় ভূমি হিসেবে নয়; দেখিয়েছেন এক শিশুর স্বাভাবিক জীবনের ভেতর দিয়ে। তাই ‘লিটল পিয়ার’-এর গ্রাম যেমন চীনের একটি গ্রাম, তেমনি সেটি পৃথিবীর যেকোনো গ্রামের প্রতিচ্ছবিও হয়ে ওঠে। শিশুর আনন্দ, কৌতূহল, অভিমান, দুষ্টুমি, ভয়, বিস্ময়—এসবের তো কোনো দেশ নেই।

ল্যাটিমোরের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তার গল্প বলার ভঙ্গিতে। তিনি শিশুদের উদ্দেশে লেখেন, কিন্তু কখনো তাদের ছোট করে দেখেন না। মাঝেমধ্যে তিনি পাঠককে যেন পাশে বসিয়ে গল্প বলেন, কখনো এমনভাবে দৃশ্য বর্ণনা করেন যে মনে হয় পাঠক নিজেই ‘লিটল পিয়ার’-এর সঙ্গে হাঁটছে। এই সহজ, আন্তরিক এবং কথোপকথনধর্মী ভাষাই বইটিকে আজও সতেজ রেখেছে।

বড় বড় পালতোলা জাহাজ স্রোতের টানে সমুদ্রের দিকে ভেসে যেত। সেসব সে মুগ্ধ হয়ে দেখত লিটল পিয়ার। অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

বড় বড় পালতোলা জাহাজ স্রোতের টানে সমুদ্রের দিকে ভেসে যেত। সেসব সে মুগ্ধ হয়ে দেখত লিটল পিয়ার। অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

বইটি পড়তে পড়তে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি আসলে কোনো শিক্ষামূলক বই নয়, অথচ পাঠক অজান্তেই অনেক কিছু শিখে ফেলে। গ্রামীণ চীনের ঘরবাড়ি, পোশাক, খাবার, খেলাধুলা, বাজার, নদীপথ, যাতায়াত, পারিবারিক সম্পর্ক—এসবই গল্পের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে কোথাও আলাদা করে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সাহিত্যিক সৌন্দর্য নষ্ট না করেই বইটি একটি সময় ও সমাজের জীবন্ত ছবি তুলে ধরে।

তবে ‘লিটল পিয়ার’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার মানবিকতা। গল্পে শিশুর দুষ্টুমি আছে, ভুল আছে, কৌতূহল আছে; কিন্তু কোথাও তাকে নিখুঁত বা আদর্শ শিশু বানানোর চেষ্টা নেই। শহর দেখে মুগ্ধ হয়েও সে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে আপন ঘরে, আপন মানুষের কাছে। বইটির শেষভাগে পরিবারের পুনর্মিলনের যে উষ্ণতা ফুটে উঠেছে, তা এই কাহিনিকে শুধু ভ্রমণগল্পে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং পরিবারের গল্পে পরিণত করে। 

প্রকাশের পর থেকেই ‘লিটল পিয়ার’ পাঠকের ভালোবাসা পেতে থাকে। পরে ‘লিটল পিয়ার’ নিয়ে আরও একাধিক বই লেখা হয়, যা এই চরিত্রটির জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। আজও বইটি নতুন সংস্করণে প্রকাশিত হচ্ছে এবং বিশ শতকের শিশু-ক্লাসিকগুলোর আলোচনায় তার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। 

বাংলা ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশের পেছনে আগ্রহের কারণও এখানেই। আজকের শিশুর চারপাশে রোমাঞ্চ, জাদু ও কল্পবিজ্ঞানের গল্পের অভাব নেই। কিন্তু শিশুর নিত্যকার জীবনের সৌন্দর্য, তার ছোট ছোট আবিষ্কারের আনন্দ, পরিবারের উষ্ণতা এবং পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখার বিস্ময়—এই সহজ অথচ গভীর অনুভূতির গল্প আজ অনেকটাই দুর্লভ। ‘লিটল পিয়ার’ সেই শূন্যতাই পূরণ করে।

গল্পের মূল চরিত্র ‘লিটল পিয়ার’-এর গোলগাল ও মিষ্টি চেহারার সাথে মিল রেখে বাংলায় বইটির নাম রাখা হয়েছে ‘ছোট্ট নাশপাতি’। চীনে শিশুদের ফলের নামে ডাকার ঐতিহ্য রয়েছে। শিশুদের কাছে নামটি সহজবোধ্য ও শ্রুতিমধুর করতে এই শিরোনামটি বেছে নেওয়া হয়েছে। এই অনুবাদে চেষ্টা ছিল মূল রচনার সেই স্বাভাবিকতা, কোমলতা ও কথকতার সুর অক্ষুণ্ণ রাখা। ভাষাকে অযথা অলংকৃত করা হয়নি, আবার আক্ষরিক অনুবাদের শুষ্কতাও এড়ানো হয়েছে। 

আশা, বাংলা ভাষার ছোট্ট পাঠক ‘লিটল পিয়ার’কে নিজেরই একজন বন্ধু বলে মনে করবে। আর বড় পাঠক, এই বইয়ের পাতায় হয়তো ফিরে পাবেন নিজের শৈশবের সেই বিস্ময়কে—যখন পৃথিবী ছিল অনেক বড়, আর আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হতো না।

প্রথম অধ্যায়

লিটল পিয়ার ও তার পরিবার

এক ছিল লিটল পিয়ার। সে থাকত চীনের এক গ্রামে। বাবা, মা আর দুই বোনকে নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসার। গাঁয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল তাদের ছোট্ট বাড়ি। চারদিকে যত দূর চোখ যায়, সবজির খেত। কোথাও বাঁধাকপি, কোথাও শিম, কোথাও পেঁয়াজ। গ্রামের একপাশে অনেক দূর চলে গেছে শহরের বড় রাস্তা। আর অন্যপাশে, বহুদূর বয়ে চলেছে এক নদী।

লিটল পিয়ারের মা প্রায়ই বলতেন, “বাইরে গিয়ে দৌড়াও, খেলো, যত খুশি মজা করো, কিন্তু নদীর বেশি কাছে যেয়ো না। পানিতে ডুবে যেতে পারো।”

লিটল পিয়ার ছিল ভীষণ ডানপিটে। দুই বোনই বলত, “খুব দুষ্টু!”, অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

লিটল পিয়ার ছিল ভীষণ ডানপিটে। দুই বোনই বলত, “খুব দুষ্টু!”, অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

কিন্তু, মাঝে-মাঝে লিটল পিয়ার মায়ের কথা শুনত না। নদীর উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে নিচে বয়ে চলা ঘোলা জলের দিকে চেয়ে থাকতে তার ভারি ভালো লাগত। বড় বড় পালতোলা জাহাজ স্রোতের টানে সমুদ্রের দিকে ভেসে যেত। সেসব সে মুগ্ধ হয়ে দেখত। বড় উইলো গাছটা দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মনে মনে বলত, “যদি এভাবে শক্ত করে ধরে থাকি, তা হলে কোনোদিনই পানিতে পড়ব না।”

লিটল পিয়ার ছিল ভীষণ ডানপিটে। দুই বোনই বলত, “খুব দুষ্টু!” বাবাও তাই বলতেন। কখনো কখনো বিরক্ত হয়ে বলে উঠতেন, “আয়-হায়! কী দুষ্টু ছেলেই না তুমি!” কিন্তু মা বলতেন, “ও তো এখনও খুব ছোট। আরেকটু বড় হলেই ভালো ছেলে হয়ে যাবে। অপেক্ষা করো, দেখবে। মাঝে-মাঝে একটু আধটু দুষ্টুমি করলে, কী হয়েছে?” আসলে, সবাই লিটল পিয়ারকে খুব ভালোবাসত।

তখন লিটল পিয়ারের বয়স ছিল পাঁচ বছর। তার গোলগাল, গম্ভীর মুখ। চোখ দুটো কালো আপেলের বিচির মতো সুন্দর। দেখে মনেই হয় না সে এত দুষ্টু! ন্যাড়া মাথা, শুধু কপালের ঠিক ওপরে গোল করে একটুখানি চুল রাখা। সেই চুল বেণি করে রঙিন সুতো দিয়ে বাঁধা থাকত, ছোট্ট একটা ঝুঁটির মতো। এতেই লিটল পিয়ারকে সবচেয়ে সুন্দর লাগত, অন্তত তার মায়ের তাই মনে হতো।

সে সবসময় ফুলের নকশাদার জ্যাকেটে খুব জমকালো পোশাক পরত। জামার বোতাম লাগানো থাকত সামনে। সঙ্গে থাকত ডোরাকাটা পায়জামা, গোড়ালির কাছে চওড়া কাপড়ের ফিতে দিয়ে বাঁধা।

লিটল পিয়ারের দুই বোনই ছিল খুব লক্ষ্মী। বড় বোনের নাম দাগু, কারণ সে ছিল সবার বড়। আর ছোট বোনের নাম এরগু, কারণ সে ছিল দ্বিতীয়। দুজনেই লিটল পিয়ারের মতো জ্যাকেট আর পায়জামা পরত। তবু দেখলেই বোঝা যেত, তারা ছেলে নয়, মেয়ে। তাদের কানে ছিল ছোট্ট সোনার দুল, আর জামার বোতাম লাগানো থাকত পাশ দিয়ে। দাগুর চুল বাঁধা থাকত লম্বা বেণিতে। এরগুর চুল মাঝখানে সিঁথি কেটে দুদিকে দুটি ছোট বেণি করে বাঁধা হতো। 

দাগু ছিল শান্ত আর কোমল স্বভাবের। ঘরের কাজে সে মাকে সাহায্য করত। লিটল পিয়ার যখন একেবারে ছোট্ট শিশু, তখন দাগুই তাকে পিঠে করে নিয়ে বেড়াত আর ছড়া শেখাত। কিন্তু লিটল পিয়ার একটু বড় হওয়ার পর তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী হয়ে ওঠে এরগু। বয়সে সে লিটল পিয়ারের চেয়ে কেবল দুই বছরের বেশি। তাছাড়া, সেও কম ডানপিটে নয়। ছেলেদের মতোই দৌড়ঝাঁপ করে খেলতে তার খুব ভালো লাগত।

লিটল পিয়ারদের বাড়িটা ছিল গাঁয়ের অন্য সব বাড়ির মতোই, রোদে শুকানো ধুলো-রঙা ইট দিয়ে তৈরি। বাড়িতে ছিল মাত্র একটি ঘর। মেঝে মাটির, আর জানালাগুলো কাগজের। কাগজে আঙুল দিয়ে ফুটো না করলে জানালা দিয়ে বাইরের কিছুই দেখা যেত না। তবে সেই জানালা দিয়ে ঘরে খানিকটা আলো ঢুকত। ঘরে একটিমাত্র দরজা। সে দরজায় আবার ছোট একটি জানালাও ছিল। দরজা দিয়ে বাড়ির সামনের উঠোনে যাওয়া যেত। 

উঠোনের চারপাশ ঘিরে ছিল উঁচু দেয়াল। সেই দেয়ালে রাস্তার দিকে বেরোনোর একটি ফটক ছিল। ফটকের লাল দরজার দুপাশে বসানো ছিল পাথরের দুটি সিংহ। সিংহ দুটির কোঁকড়ানো কেশর। মুখ দেখে মনে হতো, তারা হয়তো হাসছে, নয়তো গর্জন করছে। কোনটা যে ঠিক, লিটল পিয়ার কোনোদিনই বুঝে উঠতে পারত না। 

রাস্তার একেবারে শেষ মাথায়, গ্রামেরও শেষ প্রান্তে ছিল বাড়িটা। ফটকের কাছে দাঁড়ালে তুমি সমতল মাঠ পেরিয়ে নদীর দিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাবে। নদীটা যদিও চোখে পড়বে না, কিন্তু জাহাজগুলোর উঁচু মাস্তুল আর পাল ঠিকই দেখতে পাবে। সেখানে দাঁড়িয়ে নদী, সমুদ্র আর গোটা পৃথিবীর কথা ভাবলে লিটল পিয়ারের মন আনন্দে ভরে উঠত। উত্তেজনায় তার ছোট্ট ঝুঁটিটাও একেবারে খাড়া হয়ে যেত!

বাড়ির ভেতরে আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছু ছিল না। দেয়ালের গা ঘেঁষে ধূসর ইটে তৈরি এক বিরাট চৌকো খাট। খাট ছিল চওড়া, সমান আর বেশ শক্ত। বালিশগুলো লম্বা গোলাকার রোলের মতো, সেগুলোও শক্তই ছিল। তবু লিটল পিয়ার আর তার বাড়ির সবাই গরম লেপ মুড়ি দিয়ে দিব্যি আরাম করে ঘুমোত। ঘরের এক কোণে ইটের চুলা। সেখানেই লিটল পিয়ারের মা রান্না করতেন। খাটের নিচেও ছিল আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা। শীতের সময় সেখানে আগুন জ্বালিয়ে বিছানা গরম রাখা হতো। আর দিনের বেলা সেই বিছানায় বসে ছোট ছোট পা-ওয়ালা একটা নিচু টেবিল পেতে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করত।

তাদের একমাত্র পোষা প্রাণী ছিল একটি হলুদ পাখি। খোলা দরজার পাশে ঝুলে থাকা খাঁচায় সে থাকত। সারাক্ষণ মিষ্টি গলায় গান গেয়ে বাড়ি মাতিয়ে রাখত।

চলবে...