১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ২

সামনেই দেখা গেল শহরের উঁচু ধূসর প্রাচীর। বড় রাস্তা সোজা গিয়ে মিলেছে শহরের ফটকে।

আজহার ফরহাদ আজহার ফরহাদ

Published : 14 Aug 2026, 04:20 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

লিটল পিয়ারের শহর দেখা

শীতের একদিন। রোদ ঝলমল করছে। শক্ত মাটির ওপর সাদা তুষার জমে আছে। লিটল পিয়ার বলল, “ও মা, আমি বাইরে খেলতে যাচ্ছি। সাবধানে খেলব।”

মা তার গায়ে তুলাভরা আরও দুটি অতিরিক্ত মোটা জামা পরিয়ে দিলেন। তারপর কানঢাকা একটা টুপি পরিয়ে দিয়ে বললেন, “যাও সোনা, মন ভরে খেলো। তবে পড়ে যেয়ো না যেন!”

লিটল পিয়ার সদর ফটক দিয়ে বেরিয়েই দিল দৌড়। তাকে দেখে মা হেসে ফেললেন। এতগুলো মোটা জামা গায়ে দিয়ে তাকে এমন গোলগাল আর মজার দেখাচ্ছিল যে, পড়ে গেলেও সে কোনো আঘাত অনুভব করবে না!

লিটল পিয়ার গ্রামের রাস্তা ধরে নিচে দৌড়াতে লাগল। “এই, তোরা আয়! খেলতে আয় সবাই!” বন্ধুদের ডাক দিল সে। তার বন্ধুরা সবাই বাইরে রাস্তায় খেলছিল। কেউ ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে তো কেউ পায়ে পায়ে শাটলকক*, আর কেউ নিজের ঘরে দরজায় দাঁড়িয়ে তা দেখছে। ওরা সবাই চেঁচিয়ে বলল, “লিটল পিয়ার, আয় না, আমাদের সঙ্গে খেল!”

কিন্তু লিটল পিয়ার মাথা নাড়ল, “না-না! আমি গ্রামের ওপাশের পুকুরটায় যাচ্ছি রে। পিছলে পড়ার খেলা খেলব!” এ বলেই সে আবার দৌড়।

কিছু দূর গিয়ে সে তার বন্ধু, বড় মাথার বাড়ির সামনে পৌঁছাল। উঠোনের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল, বড় মাথা তার ছোট ভাইকে পিঠে করে দাঁড়িয়ে আছে। লিটল পিয়ার হাঁক দিল, “এই বড় মাথা! আমার সঙ্গে খেলবি? আমি পুকুরে বরফের ওপর পিছলাতে যাচ্ছি!”

বড় মাথাই ছিল লিটল পিয়ারের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। লিটল পিয়ারের চেয়ে সামান্য একটু বড় সে। তারও ছিল গোলগাল, গম্ভীর মুখ। লিটল পিয়ারের মতো তার মাথার চুলও কামানো ছিল। তবে পিয়ারের মাথায় যেখানে ছিল একটিমাত্র ঝুঁটি, বড় মাথার ছিল তিনটি—একটি কপালের ওপর, আর দুটি দুই কানের ঠিক ওপরেই। লিটল পিয়ারের কথা শুনে সে মন খারাপ করে মাথা নাড়ল, “আমি যেতে পারব না রে। মা তো বাজারে গেছে। ছোট ভাইটাকে আমাকেই দেখাশোনা করতে হচ্ছে। আচ্ছা, তুই না হয় আমার সাথেই থাক?”

“এখন না।” লিটল পিয়ার বলল, “রোদ উঠেছে। আমাকে বরফের ওপর পিছলাতে যেতেই হবে।” এ বলে সে আবার দৌড়ে চলল।

গ্রামের শেষ মাথায় এসে লিটল পিয়ার একটা ভদ্র ও মিশুক শূকরের গায়ে প্রায় ধাক্কা খেতেই বসেছিল। সে হেসে বলল, “এই শূকর! কোথায় যাচ্ছ? একটু দেখেশুনে চলো না! আমার সঙ্গে বরফের ওপর পিছলাতে যাবে?”

কিন্তু শূকর তো তার কথার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝল না। তাই লিটল পিয়ার আবার দৌড়ে চলল। সরু পথ ধরে, মাঠ পেরিয়ে, একসময় সে পুকুরের ধারে এসে পৌঁছাল।

আহা, কী মজা! মনে মনে বলল সে। তারপর বরফের ওপর পিছলে যেতে শুরু করল। সে পিছলায় আর পিছলায়। এমন সময় হাওয়া উঠল। হাওয়ার ঝাপটায় সে যেন ছোট্ট একটা নৌকার মতো এদিক-ওদিক ভেসে যেতে লাগল। মাঝে-মাঝে ধপাস করে পড়েও যাচ্ছিল। কিন্তু গায়ে এত জামাকাপড় জড়ানো যে, পড়ে গিয়েও ব্যথা লাগছিল না। তার মনে হলো, “নদীতে ভেসে চলা একটা নৌকা হলে বেশ হতো। অথবা আকাশে উড়ে বেড়ানো একটা ঘুড়ি!—কিন্তু, আহা! ছোট্ট ছেলে হয়ে পুকুরের বরফের ওপর পিছলানোর আনন্দ, এটাই বা কম কীসের!”

ঠিক তখনই গ্রামের দিক থেকে মস্ত শোরগোল শোনা গেল। কয়েকটা বড় ছেলে ছুটতে ছুটতে পুকুরের দিকে আসছে। তাদের পেছন-পেছন ছুটে আসছে একটা কুকুরছানা। পুকুরের ধারে এসে তারা বরফ-জুতো বেঁধে নিল। সেগুলো ছিল চ্যাপ্টা কাঠের টুকরো। প্রত্যেকেরই ছিল মাত্র এক পাটি বরফ-জুতো। এক পায়ে সেটা বেঁধে, অন্য পা দিয়ে বরফ ঠেলে তারা পিছলাতে-পিছলাতে লিটল পিয়ারের দিকে এগিয়ে এলো। সবাই চেঁচাচ্ছিল। কুকুরছানাটিও ঘেউ-ঘেউ করতে করতে তাদের পেছন পেছন ছুটছিল, কখনো আবার বরফের ওপর পিছলে যাচ্ছিল।

এমন সময় একের পর এক রিকশা তার পাশ দিয়ে চলে যেতে লাগল। রিকশায় বসে আছে কী সুন্দর পোশাক পরা লোকজন! অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

এমন সময় একের পর এক রিকশা তার পাশ দিয়ে চলে যেতে লাগল। রিকশায় বসে আছে কী সুন্দর পোশাক পরা লোকজন! অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

সবচেয়ে বড় ছেলেটির হাতে ছিল লম্বা এক লাঠি। লাঠির মাথায় লাগানো ছিল লোহার তীক্ষ্ণ ফলা। সে ফলা বরফে গেঁথে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে বাঁশটা ঠেলে এমন জোরে এগোচ্ছিল যে, চোখের পলকে সে লিটল পিয়ারের সামনে এসে পড়ল। “আমাদের পুকুরে তুমি কী করছ?” সে চেঁচিয়ে বলল, “এটা তোমার মতো ছোট বাচ্চাদের খেলার জায়গা নয়। বাড়ি ফিরে যাও মায়ের কোলে!” কথাটা শুনে লিটল পিয়ারের ভীষণ রাগ হলো। সে ধপাস করে বরফের ওপর বসে পড়ল। তারপর যতটা গর্ব করে বলা যায়, ততটাই গর্বের সঙ্গে সে বলল, “আমিও স্কেটিং করতে পারি!” অন্য ছেলেরাও পিছলে এসে তার চারপাশে বৃত্তাকারে ঘুরল। কুকুরছানাটাও কৌতূহলী হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। লিটল পিয়ার বলেছে যে সেও স্কেটিং করতে পারে—এ কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। “বসে বসে কেউ আবার স্কেটিং করে নাকি!” তারা ধমকের সুরে বলল, “তা ছাড়া, তোমার তো স্কেটিং করার বরফ-জুতোই নেই!”

লিটল পিয়ারের খুব কান্না পেল। কিন্তু সে কাঁদল না। উঠে দাঁড়াল, টুকটুক করে হেঁটে পুকুরের ধারে গিয়ে থামল। তারপর ফিরে তাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “আমি যখন বড় হব, তখন কিন্তু তোমাদের কষে চড় দেব!”

বড় ছেলেরা তখনও পুকুরের ওপর বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে স্কেটিং করছিল । লিটল পিয়ার বিষণ্নভাবে বাড়ির পথ ধরল। হঠাৎ সে থেমে গেল। না, এখন বাড়ি গেলে চলবে না। এমন সুন্দর দিনে ঘরে ফিরে যেতে তার একটুও ইচ্ছে করছিল না। বাইরে দেখার মতো কত কিছুই না আছে! সে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর মাঠ পেরিয়ে বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগল। 

বড় রাস্তা সত্যিই অনেক উঁচু। তুমি যদি এর এক পাশে দাঁড়াও, দেখতে পাবে না অন্য পাশে কী রয়েছে। কিন্তু যখন পথ বেয়ে বড় রাস্তার ওপর উঠে পড়বে, অন্য পাশে নিচের সমতল মাঠগুলোর দিকে তাকাতে পারবে। আরও অনেক দূরে, ধুলো-রঙা ছোট ছোট ঘর-বাড়ির অন্যান্য গ্রামগুলোকেও দেখতে পাবে।

বড় রাস্তা মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে কত দূর যে গেছে! এক গ্রাম ছেড়ে আরেক গ্রামে ঢুকেছে, আবার সেখান থেকে বেরিয়ে আরও দূরে চলে গেছে—তবু যেন তার শেষ নেই। লিটল পিয়ার জানত, এই রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলে একসময় শহরে পৌঁছানো যাবে। সে শুধু ভাবল, ইশ্! পা দুটো যদি এত ছোট না হতো! বড় রাস্তার দুপাশে সারি-সারি গাছ। আগে পিচগাছের সারি, তার ঠিক পেছনে উইলো গাছের সারি। বসন্তে গাছগুলো নিশ্চয়ই অপূর্ব সুন্দর দেখায়! কিন্তু এখন তো শীতকাল। ঠান্ডা হাওয়া বড় রাস্তা বেয়ে ছুটে এসে ডালপালাগুলো কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

লিটল পিয়ারের খিদে পেতে শুরু করল। কিন্তু পথে যে কত কী দেখবার! দেখতে দেখতে, হাঁটতে হাঁটতে, সে যে কতক্ষণ আগে খেয়েছিল, সেই কথাই ভুলে গেল। এমন সময় একের পর এক রিকশা তার পাশ দিয়ে চলে যেতে লাগল। রিকশায় বসে আছে কী সুন্দর পোশাক পরা লোকজন! লিটল পিয়ার অবাক হয়ে ভাবল, যারা এই রিকশাগুলো টেনে নিয়ে যায়, তারা এমন জোরে দৌড়ায় কী করে?

লিটল পিয়ার বলেছে যে সেও স্কেটিং করতে পারে—এ কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। “বসে বসে কেউ আবার স্কেটিং করে নাকি!” অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

লিটল পিয়ার বলেছে যে সেও স্কেটিং করতে পারে—এ কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। “বসে বসে কেউ আবার স্কেটিং করে নাকি!” অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

তার ওপর আবার কোনো কোনো রিকশায় কত ভারী বোঝা! একটি রিকশায় বসে ছিল একজন মোটাসোটা ভদ্রলোক। তার সঙ্গে ছিল কতগুলো পুঁটুলি। আরেকটি রিকশায় একটি গোটা পরিবার—একজন মা আর তার তিনটি ছেলে-মেয়ে। তবু যারা রিকশা টানছিল, তারা এমন বেগে ছুটে চলল যে, দেখতে দেখতে লিটল পিয়ার অনেক পেছনে পড়ে রইল। 

এরপর যেতে লাগল ঘোড়ার গাড়ি। আবার কত পথিক চলেছে, কাঁধে বোঝা ঝোলানো বাঁশ নিয়ে। বাঁশের দুই প্রান্তে ঝুলছে বোঝা। ঘোড়ার গাড়িগুলোর দিকে লিটল পিয়ার বড় সাধ করে চেয়ে রইল। আহা, যদি একবার কোনো একটায় সে চড়তে পেত! গাড়িগুলো ছিল বেশ সুন্দর। বড় বড় দুটো কাঠের চাকা, দুপাশে কাঠের আচ্ছাদন, আর ওপরে নীল কাপড়ে ঢাকা গোল ছাউনি। গাড়োয়ান সামনের খোলা জায়গায় আরাম করে পা গুটিয়ে বসে থাকে। তার হাতে লম্বা চাবুক। কখনো কখনো সে সেই চাবুকটি আলতো করে নেড়ে ঘোড়াগুলোকে তাড়ায়। চাবুকের আগায় বাঁধা থাকে লাল রঙের ঝালর। গাড়িগুলো ধীরে চলছিল বটে, তবু তারা লিটল পিয়ারের চেয়ে অনেক দ্রুত এগিয়ে গেল।

লিটল পিয়ার ধীরে ধীরে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে অবাক হচ্ছিল, শহরটা আর কত দূরে। এমন সময় এক লোক তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালেন। “কোথায় যাচ্ছ, ছোট্ট পথিক?” লোকটি বললেন, “এত বড় রাস্তা দিয়ে একা-একা চলার জন্য তুমি তো খুবই ছোট!”

লোকটি ছিলেন লম্বা, বয়সে তরুণ। দয়ালু চেহারা তার। গায়ে দীর্ঘ নীল রঙের পোশাক, তার ওপর কালো সাটিনের ওয়েস্টকোট। মাথায় ছোট্ট গোল কালো টুপি, আর টুপির মাথায় বোনা সুতোর গোল একটি বোতাম।

লিটল পিয়ার তার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “আমি আপনার সঙ্গেই তো যাচ্ছি।”

“কিন্তু আমি তো শহরে যাচ্ছি। তোমার এই ছোট্ট পা নিয়ে অত দূর যাওয়া খুব কঠিন।”

লিটল পিয়ারের মুখ অমনি ভারী হয়ে গেল। “আমি কোনো দিন শহর দেখিনি”, সে বলে উঠল, “সূর্য ডোবার আগে কি শহর দেখে আবার ফিরে আসতে পারব না?”

দয়ালু লোকটি জিজ্ঞেস করলেন তার বাড়ি কোথায়, এবং যখন লিটল পেয়ার তাকে শেগু গ্রামের কথা বলল তিনি খুব বিস্মিত হলেন। “সে তো অনেক দূর! তুমি এতখানি পথ হেঁটে এসেছ! আমরা তো এখন শহরের আরও কাছে এসে পড়েছি।” এই বলে তিনি লিটল পিয়ারকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন, আর বললেন, “চলো, তোমাকে আমার সঙ্গে শহরে নিয়ে যাই। সেখানে পৌঁছে আমার এক বন্ধুর গাড়িতে করে তোমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেব।”

লিটল পিয়ারের ভারি আনন্দ হলো। লম্বা লোকটির কাঁধে বসে তার মনে হলো, যেন প্রায় সারা পৃথিবীটাই সে দেখতে পাচ্ছে। এ যে এক মস্ত অভিযান! মনে মনে সে ভাবতে লাগল, এরগু যখন জানবে, তার ভাই একজন ভ্রমণপথিক হয়েছে, তখন সে যে কী গর্বই না করবে!

সূর্য তখন ডুবতে বসেছে। কিন্তু লিটল পিয়ার যে এখন বাড়িতে থাকার কথা, সে কথা তার আর মনেই নেই। অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

সূর্য তখন ডুবতে বসেছে। কিন্তু লিটল পিয়ার যে এখন বাড়িতে থাকার কথা, সে কথা তার আর মনেই নেই। অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

ঝুন্ ঝুন্, ঝুন্ ঝুন্, ঝুন্ ঝুন্! গলায় ঘণ্টা বাঁধা একটা গাধা টুকটুক করে হেঁটে গেল। তার দুই পাশে ঝুলছিল রঙিন জিনের থলে। পিঠে বসে এক লোক। লোকটি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, “একবার চড়বে নাকি?”

“আমি তো চড়েই আছি!” লিটল পিয়ার জবাব দিল। সে তার নতুন বন্ধুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। গাধার গলায় ঘণ্টা ঝুন্ ঝু্ন্ করতে করতে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল, আর সে হেসেই চলল।

সূর্য তখন ডুবতে বসেছে। কিন্তু লিটল পিয়ার যে এখন বাড়িতে থাকার কথা, সে কথা তার আর মনেই নেই। তার ঘুম পাচ্ছিল, খিদেও পেয়েছিল। তবু তার মনে একটাই কথা ঘুরছিল, “আমি পৃথিবী দেখছি!”

শেষে লম্বা লোকটি বলল, “দেখো! ওই যে বড় শহর!” লিটল পিয়ার এক ঝটকায় সোজা হয়ে বসল। তারপর তাকিয়ে দেখল। খুব দূরে নয়, সামনেই দেখা গেল শহরের উঁচু ধূসর প্রাচীর। বড় রাস্তা সোজা গিয়ে মিলেছে শহরের ফটকে। ফটকটি ছিল এক বিরাট খিলানদ্বার। তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে বাঁকানো টালির ছাদওয়ালা একটি মিনার। লিটল পিয়ার আর তার সঙ্গী যতই কাছে এগোতে লাগল, শহরের প্রাচীর ততই উঁচু বলে মনে হতে লাগল। আর ফটকে ঢুকতে যাবে, এমন সময় মনে হলো, ফটকের ওপরের মিনারটি যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে।

শহরের প্রাচীরের ভেতরে রাস্তাগুলো লোকে লোকারণ্য। গাড়ি, রিকশা আর ফেরিওয়ালাদের ভিড়ে চারদিকে ভারি কোলাহল। তারা পথে পথে ঘুরে তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করছে।

রাস্তার মাঝখান দিয়েই সবাই চলেছে। ফুটপাত বলে সেখানে কিছু ছিল না। পথের ধারের দোকানগুলোয় সামনেটা খোলা। চলতে চলতেই ভেতরের সব চোখে পড়ে। কোথাও খাবারের দোকান, কোথাও ঝুড়ির, কোথাও লন্ঠনের, কোথাও রেশমের। এমন কত রকমের দোকানের কথা তোমার মনে আসতে পারে, যা কল্পনা করতে পারো, সবই যেন সেখানে আছে। দোকানের ভেতর আলো জ্বলছে। সামনে লাল-সোনালি সাইনবোর্ড আর ব্যানারগুলো দুলছে। চারদিকে এমন কোলাহল, এত আলো ছিল যে, লিটল পিয়ার চোখ মিটমিট করে তাকাল। সে হয়তো বলতে চেয়েছিল, “শহরটা আমার ভারি ভালো লেগেছে।” কিন্তু তার বদলে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, “আমার যে ভীষণ খিদে পেয়েছে!”

দয়ালু লোকটি তাকে একটি দোকানে নিয়ে গেলেন। সেখানে গোল গোল থালায় ধোঁয়া-ওঠা গরম ডাম্পলিং পাহাড়ের মতো সাজানো। আরেক দিকে বড় বড় থালাভরা কত রকমের মজাদার পাকানো রুটি। লিটল পিয়ার পেট ভরে খেল। যতখানি তার পক্ষে খাওয়া সম্ভব, ততখানিই খেল। তারপর অমনি গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।

সেই রাতেই বেশ দেরি করে একটা গাড়ি কড়মড় শব্দ করতে করতে শেগু গ্রামে এসে ঢুকল। গাড়োয়ান প্রথম বাড়িটার সামনে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোনো ছোট ছেলে হারিয়ে গেছে কি না! বাড়ির লোকজন উত্তেজনায় ছুটে বাইরে এলো। “মিস্টার হুয়াংয়ের ছেলে লিটল পিয়ার আজ বাড়ি থেকে পালিয়েছে!” তারা বলে উঠল, “সেই-ই হবে হয়তো!” এই বলে তারা গাড়ির ভেতরে উঁকি দিল। দেখে কী আশ্চর্য! সেখানে গরম লেপে জড়ানো লিটল পিয়ার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।

গাড়োয়ানকে তারা লিটল পিয়ারদের বাড়ি দেখিয়ে দিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই লিটল পিয়ার মায়ের কোলে ফিরে এলো। চারদিকে তার আপনজনেরা। ছোট্ট ঘরটিতে যতজন ধরে, ততজন প্রতিবেশীও এসে জড়ো হয়েছে। বাবা বললেন, “পালিয়ে গিয়েছিলে, খুব দুষ্টুমি করেছ।” আর মা বললেন, “আহা! দুষ্টুমি তো সে ভালোই করেছে। কিন্তু তাকে ফিরে পেয়েছি যখন, তখন এবার আর তাকে মারব না।”

তারপর সবাই লিটল পিয়ারকে ঘিরে ধরল। আর তাকে কত প্রশ্নই না করতে লাগল।

“ও লিটল পিয়ার”, এরগু উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “শহরে তুমি কী কী দেখলে?”

লিটল পিয়ারের চোখে তখনও ঘুম। ঘুম-জড়ানো গলায় সে আস্তে বলল, “আমি…কিছু ডাম্পলিং খেয়েছিলাম।”

* শাটলকক (Jianzi): পালক লাগানো ছোট একটি খেলনা। চীনে এটি পা দিয়ে আকাশে ভাসিয়ে রাখার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলায় ব্যবহৃত হয়।

চলবে…

আগের পর্ব  

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ১