Published : 21 Aug 2026, 01:22 AM
লিটল পিয়ার যেভাবে পটকা ফাটাল
ঠাস্—ঠাস্—ঠাস্! পটকা ফুটছিল। কাঁসর-ঘণ্টা বাজছিল। সারা গ্রামজুড়ে লোকের ভিড়, কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে। চীনা নববর্ষের উৎসব যে শুরু হয়ে গেছে! চীনে টানা দু’সপ্তাহ ধরে চলে নববর্ষের উৎসব। আর এই কটা দিন সকলেরই ছুটি।
“এই সময়টাতেই কত ভালো ভালো খাবার পাওয়া যায়,” এরগুকে বলল লিটল পিয়ার। দুজনে তখন তাদের বাড়ির ফটকের উঁচু দোরগোড়ায়, দুই পাথরের সিংহের মূর্তির মাঝখানে বসে ছিল। গোল গোল চ্যাপ্টা পিঠে মনের সুখে কুটকুট করে খাচ্ছিল। আর রাস্তার আরও খানিকটা দূর থেকে ভেসে আসা পটকার আনন্দময় হুল্লোড় শুনছিল।
এরগু বলল, “ইশ্, নববর্ষের উৎসবটা যদি আর শেষ না হতো রে! এ সময় তো কাউকে কাজ করতে হয় না। আজ রাতে কত সুন্দর আতশবাজি ফুটবে—আর আমাদের সবার গায়ে যে নতুন জামাকাপড়!”
লিটল পিয়ার গর্ব ভরে নিজের নতুন পোশাকের দিকে তাকাল। সরষে রঙের পায়জামা, তার সঙ্গে বেগুনি জ্যাকেট। মাথার টিকির চারপাশে বাঁধা উজ্জ্বল সবুজ ফিতে। গলায় রুপোর হার, সামনে ড্রাগন আকারের একটি বন্ধনী। ওটি সৌভাগ্যের হার। তার মা আশা করেছিলেন, এই হার হয়তো তাকে আর বাড়ি ছেড়ে পালাতে দেবে না।
এরগুর গায়েও নতুন পোশাক। উজ্জ্বল লাল জ্যাকেট আর টকটকে লাল পায়জামা। তার কপালের ওপর থেকে নিচ বরাবর লাল রঙের তিনটি ফোঁটা আঁকা ছিল, কেবল সাজের জন্যই দেওয়া হয়েছিল। তাতে এরগুকে দেখাচ্ছিল ভারি সুন্দর।
ঠাস্—ঠাস্—ঠাস্! রাস্তার আরও খানিকটা দূরে একটানা পটকা ফুটেই চলছিল। হঠাৎ লিটল পিয়ার লাফিয়ে উঠল। “আমি দেখে আসি তো!” চেঁচিয়ে উঠল সে। “আমার পিঠেটা তুমি খেয়ে নিয়ো।”
লিটল পিয়ার ছুটতেই এরগু পেছন থেকে জোরে বলল, “পটকার খুব কাছে যেয়ো না কিন্তু! সাবধানে থেকো, কারণ তোমার গায়ে যে নতুন জামাকাপড়!”
লিটল পিয়ার ছুটে চলল। বাড়ি থেকে যত দূরে যাচ্ছে, গ্রামের মাঝ বরাবর যত এগোচ্ছে, লোকজনও তত বাড়ছে। পথঘাট ছিল সব লোকে লোকারণ্য। সবার মুখে হাসি, সবাই খুশি, ছুটির দিন বলে কথা। লিটল পিয়ার ভিড় ঠেলে পথ করে এগোতে লাগল। খুব সাবধানে পা ফেলছিল যাতে কোনো মুরগির ওপর পা না পড়ে, বা কোনো ছোট্ট শিশুর ওপর হুমড়ি না খায়। গাঁয়ের একেবারে মাঝখানে গিয়ে দেখা গেল, সেখানেই ছিল সবচেয়ে বেশি ভিড়। পথের মাঝখানেই এক লোক পটকা ফাটাচ্ছে। ছোট পটকা, বড় পটকা, মাঝারি পটকা—সব রকমের। কোনো কোনো পটকা আলাদা আলাদা—সেগুলো ফুটছিল পট্ করে! আর যেসব পটকা একসাথে মালার মতো গাঁথা, সেসব ফুটছিল পট্-পট্-পট্-পট্-পট্!
গ্রামের সব ছেলেই লোকটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। হাঁ করে দেখছিল, লোকটি কী করে পটকা ফাটাচ্ছে। লোকটি তাদের বলল, “সরে দাঁড়াও! বেশি কাছে এসো না। পটকার খুব কাছে আসা বিপজ্জনক। গোল হয়ে দাঁড়াও—আরও কিছু দূরে।”
লিটল পিয়ার এত ছোট যে, ভিড়ের ফাঁক গলে এগোতে তার মোটেই অসুবিধা হল না। একটু পরেই সে গোল হয়ে দাঁড়ানো লোকজনের একেবারে সামনের দিকে এসে পৌঁছাল। সেখান থেকে একের পর এক পটকা ফোটানো বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। সে ভারি উৎসাহ নিয়ে দেখতে লাগল। লোকটি এক টুকরো জ্বলন্ত কাঠি দিয়ে একটার পর একটা পটকায় আগুন ধরিয়ে যাচ্ছিল। লিটল পিয়ার মনে মনে ভাবল, “ইশ্, আমিও যদি একটা পটকায় আগুন ধরাতে পারতাম!”
ঠিক তখনই একটি বড় ছেলে লোকটিকে বলল, “আমাকে একটা পটকা ফাটাতে দিন না!” সে মিনতি করে বলল, “আমি একটা বড় পটকা ফাটাতে চাই, যেটা খুব জোরে দড়াম করে ফাটবে।” লিটল পিয়ার মুখ তুলে বড় ছেলেটির দিকে তাকাল। যেসব ছেলে তাকে পুকুর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তাদের মধ্যে এ-ই ছিল সবচেয়ে বড়।
লোকটি যখন ছেলেটিকে বলছিল, “আচ্ছা, তুমি কেবল একটি পটকাই জ্বালাতে পারবে,” তখন লিটল পিয়ার মনে মনে ভাবল, “আমি চাইলে হয়তো আমাকেও একটা পটকা ফাটাতে দেবে। তখন সবাই দেখবে, আমিও যে আর ছোট্টটি নই।”
বড় ছেলেটি দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে মস্ত এক পটকায় আগুন ধরাল। তারপর সে দ্রুত পিছিয়ে গেল। “দড়াম!” শব্দে ফেটে সোজা শূন্যে উঠে গেল সেটি। “বাপ্ রে!” সবাই চেঁচিয়ে উঠল। “কী দারুণ পটকা! আর কী জোরেই না আওয়াজ হলো!”
লিটল পিয়ার লোকটির কাছে গিয়ে বলল, “আমিও কি একটা পটকা ফাটাতে পারি?”
“তুমি যে বড্ড ছোটো।” লোকটি বলল।
বড় ছেলেটি বলল, “তুমি অনেক ছোটো।” বাকি সবাইও বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ও বড্ড ছোট।”
লিটল পিয়ার বলল, “না না, আমি মোটেই অত ছোটো নই। একটা ছোট পটকা তো আমি ফাটাতেই পারি, তাই না!”
লোকটি সস্নেহে হেসে ফেলল। বলল, “আচ্ছা, বেশ। কেবল একটাই জ্বালাতে পারবে। তবে খুব তাড়াতাড়ি করবে, আর খুব সাবধানে।”
বেছে বেছে একেবারে ছোট্ট একটা পটকা নিল লিটল পিয়ার। সবাই যেখানে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তার মাঝখানটিতে পটকাটিকে খাড়া করে রাখল। তারপর ঝুঁকে গিয়ে দম আটকে তাতে আগুন ধরাল। “সবাই পিছিয়ে যাও!” চেঁচিয়ে উঠল সে। কিন্তু উত্তেজনায় নিজেই সে পিছিয়ে যেতে ভুলে গেল! “পটাস্!” শব্দে বাজিটা ফাটলো, আর সোজা ওপরের দিকে উড়ে গিয়ে একদম লিটল পিয়ারের গায়ে লাগল!
“ওহ্!” বলে চেঁচিয়ে উঠল লিটল পিয়ার। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকেও সবাই বলে উঠল, “ওহ্! লেগেছে তোমার? পুড়ে গেছ নাকি?”
“না,” একটু অবাক গলায় বলল লিটল পিয়ার। কিন্তু নিজের জামার দিকে তাকাতেই চোখ কপালে উঠল। তার সবচেয়ে ভালো, একেবারে নতুন বেগুনি জ্যাকেটটার ঠিক মাঝখানে পটকাটা পুড়িয়ে একটা ফুটো করে দিয়েছে!
গ্রামের সব ছেলেই লোকটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। হাঁ করে দেখছিল, লোকটি কী করে পটকা ফাটাচ্ছে। অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।
“ওহ্!” এবার আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল লিটল পিয়ার। “আমার সুন্দর নতুন জ্যাকেটটা!” হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, এরগু তাকে বলে দিয়েছিল পটকার খুব কাছে না যেতে। তার ভারি লজ্জা হল। এমন লজ্জা হল যে, সে কেঁদেই ফেলল।
চারপাশের সবাই তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। “কিচ্ছু হয়নি,” তারা বলল। “তুমি যে পটকা ফাটালে, সেটা কিন্তু ভারি সুন্দর ছিল! আর ফুটোটার জন্য ভাবছ কেন? তোমার মা এমন করে সেলাই করে দেবেন যে, বোঝাই যাবে না।”
তখন লিটল পিয়ারের মনটা একটু ভালো হল। সে ভাবল, একটা পটকা ফাটানোর মতো বড় ছেলে যদি সে হয়েই থাকে, তা হলে কান্না করার মতো অত ছোট্টটি তো সে আর নেই। ভিড়ের মধ্য দিয়ে আবার নিজের পথ তৈরি করে নিল সে, বাড়ির দিকে। এবারও খুব সাবধানে। যাতে কোনো শিশুর ওপর ধাক্কা না লাগে বা কোনো মুরগির ওপর পা না পড়ে। এমন সময় হঠাৎ—ধাক্কা! কে যেন এসে সোজা তার গায়ের ওপর পড়ল। এরগু!
“ওহ্, লিটল পিয়ার!” সে চিৎকার করে বলল, “তোমাকেই তো খুঁজছিলাম! বাবা আমাদের জন্য নববর্ষের উপহার হিসেবে ভারি সুন্দর কিছু নতুন ঘুড়ি এনেছেন। শিগগির চলো, দেখে আসবে!”
এরগু আর লিটল পিয়ার বাড়ি পৌঁছে দেখল, সত্যিই ঘুড়িগুলো সেখানে। একটা দেখতে যেন মস্ত হলুদ প্রজাপতি। আরেকটা যেন প্রকাণ্ড এক সোনালি মাছ। দেখে লিটল পিয়ারের এমন আনন্দ হল যে, নতুন জামাটার কথা সে একেবারেই ভুলে গেল। যখন মা বললেন, “কী যেন পোড়া-পোড়া গন্ধ পাচ্ছি রে?” অমনি লিটল পিয়ারের সব মনে পড়ে গেল।
“আমার নতুন জামাটা,” তার গলার স্বর ধীরে ছোট হয়ে এল। “আমি একটা পটকা ফাটিয়েছিলাম—শুধু একটাই। কিন্তু সেটা আমার নতুন জ্যাকেটটায় একটা ফুটো করে দিয়েছে।”
“ওহ্, লিটল পিয়ার! কী দুষ্টু ছেলেই না তুমি!” চেঁচিয়ে উঠলেন মা। “ভাগ্যিস তোমার জ্যাকেটটাই শুধু পুড়েছে, তুমি পোড়োনি। পটকা ফাটানো খুব বিপজ্জনক। আর কখনো, কক্ষনোই তুমি পটকা ফাটাবে না! অন্তত যতদিন না তুমি অনেক বড় হচ্ছ।”
সেই রাতে নববর্ষ উৎসবের আতশবাজি দেখতে বাড়ির সবাই ফটকের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। গাঁয়ের আকাশজুড়ে তখন কত রঙের সুন্দর আলো ঝলমল করছিল। লিটল পিয়ার আর তার বোনেরা সবাই তাদের সবচেয়ে ভালো নতুন জামাকাপড় পরে সেজেছিল। তবে তুমি যদি খুব ভালো করে লিটল পিয়ারের বেগুনি জ্যাকেটটার দিকে তাকাও, দেখতে পাবে—সেখানে ছোট্ট একটা ফুটো, খুব যত্ন করে সেলাই করা। আকাশে হাউইগুলো শোঁ-শোঁ করে ছুটে যাচ্ছে। তারপর ঝরে পড়ছে আলোর ফুলকি। লিটল পিয়ার সেদিকে চেয়ে রইল। মনে মনে ঠিক করল, যখন সে অনেক, অনেক বড় হবে, তখন দশ লক্ষ পটকা আর বিশ লক্ষ হাউই ওড়াবে!—কিন্তু এখন? এখন তার মনে হল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখার মজাও বুঝি প্রায় ততটাই!
চলবে...
আগের পর্ব
ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ১
ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ২
ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৩