১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৩

হঠাৎ লিটল পিয়ারের মাথায় দারুণ একটা বুদ্ধি এলো। সে রাস্তা ধরে ছুটল।

আজহার ফরহাদ আজহার ফরহাদ

Published : 19 Aug 2026, 03:17 AM

Updated : 16 Sep 2026, 12:58 PM

লিটল পিয়ার যেভাবে লাটিম আর তাংহুলু দুটোই চেয়েছিল

শহর ঘুরে আসার পর বেশ কিছুদিন লিটল পিয়ার ভারি ভালো ছেলে হয়ে রইল। হয়তো বাড়ির সবাইকে অমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিল বলে তার মনে একটু দুঃখও ছিল। সে যাই হোক, সে তখন সত্যিই খুব ভালো হয়ে চলছিল। একদিন মা বললেন, “লিটল পিয়ার, এই নাও কয়েকটা পয়সা। যাও, নিজের জন্য একটা সুন্দর খেলনা কিনে আনো।”

“ধন্যবাদ!” বলে লিটল পিয়ার আনন্দে হাত বাড়িয়ে পয়সাগুলো নিলো। পয়সাগুলোর মাঝখানে ফুটো ছিল। সবকটি একটা সুতোয় গাঁথা। সুতোর মুখটা এমন করে বাঁধা ছিল, যাতে একটাও খুলে পড়ে না যায়। মহা আনন্দে লিটল পিয়ার বেরিয়ে পড়ল। উত্তেজনায় এমন তাড়াহুড়ো যে, উঁচু দোরগোড়ায় প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ে আর কি! রাস্তা দিয়ে তাড়াতাড়ি যেতে যেতে সে পয়সাগুলো গুনতে লাগল—এক, দুই, তিন, চার—চার চারটা পয়সা! এর আগে নিজেকে কখনো এত ধনী বলে মনে হয়েছে কি না, লিটল পিয়ার তা মনে করতে পারল না।

রাস্তার দুপাশে রোদে-পোড়ানো ইটের দেয়াল। দেয়ালের ওপর দিয়ে তাকালে তুমি বাড়িগুলোর ছাদ দেখতে পাবে। কোনো ছাদ ধূসর টালির, কোনোটা খড়ের। দেয়ালের মাঝে মাঝে অনেকগুলো ফটক। সেই ফটক দিয়ে ঢুকতে হয় বাড়ির উঠোনে। ফটকগুলোর দরজাও কত রঙের! কোনোটা লাল, কোনোটা কালো। আবার কখনো-সখনো চোখে পড়ে সবুজ দরজা, তার গায়ে সোনালি রঙের ফোঁটা।

হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠল, “লিটল পিয়ার! লিটল পিয়ার!” লিটল পিয়ার ফিরে তাকাল। তার বন্ধু বড় মাথা নিজের বাড়ির ফটকে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে। “এসো, আমার নতুন লাটিমটা দেখে যাও!” সে চেঁচিয়ে বলল। “এমন সুন্দর লাটিম সারা পৃথিবীতে আর একটাও নেই। আর কী জোরেই না ঘোরে!”

“আ-হা!” বলে উঠল লিটল পিয়ার। সে মুগ্ধ হয়ে লাটিমটার দিকে চেয়ে রইল। সত্যিই তা দেখবার মতো লাটিম—বড়সড়, নাশপাতির মতো গড়ন। রুপালি গায়ে লাল, গোলাপি আর সবুজ রঙের ডোরা।

বড়মাথা গর্ব করে লাটিমটা ঘুরিয়ে দিলো। বনবন করে ঘুরতে লাগল সেটি। ঘুরছে তো ঘুরছেই! দেখতে দেখতে একদল ছেলেমেয়েও এসে জুটল। লিটল পিয়ার চুপিচুপি সেখান থেকে সরে দোকানপাটের রাস্তার দিকে চলল। যেতে যেতে ভাবল, “এমন সুন্দর একটা লাটিম হয়তো আমিও পেয়ে যাব! আমার কাছে যে চার পয়সা আছে।”

মনের আনন্দে গুনগুন করতে করতে লিটল পিয়ার রাস্তা ধরে চলল। প্রথমেই যে দোকানটা তার চোখে পড়ল, সেখানে টিনের জিনিসপত্র বিক্রি হয়। ছোট ছোট টিনের চায়ের কেতলি, টিনের সসপ্যান—কত কী! খোলা দোকানটার সামনে সেগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে ঝুলছে। হাওয়া লাগলেই ঝনঝন করে মজার শব্দ তুলছে। লিটল পিয়ার থেমে গেল। টিনের জিনিসপত্রের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, নিজের একটা চায়ের কেতলি থাকলে বেশ হয়। কিন্তু তারপরই সে নিজের চার পয়সার দিকে তাকাল। লাটিমটার কথা মনে পড়ল। তাই সে আবার হাঁটা দিলো।

“এমন সুন্দর লাটিম সারা পৃথিবীতে আর একটাও নেই। আর কী জোরেই না ঘোরে!”, অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

“এমন সুন্দর লাটিম সারা পৃথিবীতে আর একটাও নেই। আর কী জোরেই না ঘোরে!”, অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

“গরম চেস্টনাট! গরম চেস্টনাট!” গান গাওয়ার মতো সুরেলা উঁচু গলায় হাঁক দিচ্ছিল এক লোক। তার সামনে থালাভরা চেস্টনাট। এইমাত্র কয়লার আগুন থেকে নামানো হয়েছে—গরম, ধোঁয়া উঠছে। সেই মজার গন্ধ নাকে যেতেই আনন্দে লিটল পিয়ার নাক কুঁচকে শুঁকল। কিন্তু তারপর নিজের চার পয়সার দিকে তাকাল। রাস্তার শেষ মাথায় খেলনার দোকানটার কথা মনে পড়ল। তাই সে আবার হাঁটা দিলো।

“তাংহুলু! তাংহুলু!” সামনেই এক লোক হাঁক দিতে দিতে তার দিকে আসছিল। এবার লিটল পিয়ার মুখ হাঁ করে তাকিয়ে সেখানেই থমকে দাঁড়াল।

লোকটার কাছে যে তাংহুলুর ছড়াছড়ি! আর তাংহুলু ছিল লিটল পিয়ারের সবচেয়ে প্রিয় ক্যান্ডি। কাঠিতে গাঁথা আট-দশটা করে লাল ফল। সবগুলো চিনির মিষ্টি সিরাপে ঢাকা। লিটল পিয়ার ফলগুলোর দিকে চেয়ে রইল। তারপর সুতোয় গাঁথা পয়সাগুলো ঝনঝন করে নাড়ল। একটা তাংহুলু যদি পাওয়া যায়, তা হলেই যেন তার আনন্দের আর কিছু বাকি থাকে না!

“কত দাম?” সে লোকটিকে জিজ্ঞেস করল।

“এক কাঠির দাম দুই পয়সা!”

লিটল পিয়ার সুতোর গিঁট খুলল। তার অতি মূল্যবান চার পয়সা থেকে দুটো পয়সা লোকটির হাতে দিল। তারপর তাংহুলুতে একটু একটু কামড় দিতে দিতে খেলনার দোকানের দিকে চলল।

খেলনার দোকানটা ছিল ভারি চমৎকার। সেখানে গোলাপি, সবুজ আর সোনালি রঙে আঁকা কাঠের তলোয়ার। মাটির তৈরি মজার মজার ছোট্ট বাঁদর, তাদের গা আবার মুরগির পালকে ঢাকা। আর ছিল লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো গোল গোল বাক্স।

বাক্সগুলোর গায়ে কী সুন্দর সূক্ষ্ম কারুকাজ! কোনো বাক্স কমলা রঙের, কোনোটা সবুজ তো কোনোটা বাদামি। আর বাক্সগুলোর ভেতরে ছিল ঝিঁঝিঁ পোকা। তারা ডানা নেড়ে কেমন এক অদ্ভুত গানের মতো ছোট ছোট শব্দ করছিল। কাপড়ের তৈরি বাঘও ছিল সেখানে। তাদের মুখে হাসি, আর চোখ দুটি সবুজ কাচের। আর হ্যাঁ—লাটিমও ছিল! কত রঙের যে লাটিম! কোনোটা ডোরাকাটা, কোনোটা আবার একরঙা।

লোকটার কাছে যে তাংহুলুর ছড়াছড়ি! আর তাংহুলু ছিল লিটল পিয়ারের সবচেয়ে প্রিয় ক্যান্ডি, অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

লোকটার কাছে যে তাংহুলুর ছড়াছড়ি! আর তাংহুলু ছিল লিটল পিয়ারের সবচেয়ে প্রিয় ক্যান্ডি, অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।

“এইটা”, দোকানদারকে বলল লিটল পিয়ার। সে এমন একটি লাটিম দেখাল, যেটা বড় মাথার লাটিমটার মতোই বড় আর সুন্দর।

দোকানদার বলল, “লাটিমের দাম চার পয়সা।”

“ও মা! ও মা!” লিটল পিয়ার বলে উঠল, “আমার দু-পয়সা দিয়ে যে একটা তাংহুলু কিনে ফেলেছি! এখন তো আর যথেষ্ট পয়সা নেই।”

দোকানদার বলল, “আরও পয়সা হলে অন্য একদিন এসো না হয়।” কিন্তু হঠাৎ লিটল পিয়ারের মাথায় দারুণ একটা বুদ্ধি এলো। সে রাস্তা ধরে ছুটল। ছুটতে ছুটতে আবার সেই তাংহুলু-ওয়ালার দেখা পেলো।

“আর-একটা তাংহুলু দিন তো!” বলল সে। শেষ দুটো পয়সা লোকটির হাতে দিয়ে আরেক কাঠি মজাদার তাংহুলু ক্যান্ডি কিনে নিলো।

তারপর খুব আনন্দের সঙ্গে দ্রুতপায়ে হেঁটে চলল যতক্ষণ না সে বড় মাথার বাড়িতে এসে পৌঁছাল। বড় মাথা তখন বাড়ির দোরগোড়ায় একা বসে আছে। হাতে তার লাটিম। লিটল পিয়ারের হাতে দুটো তাংহুলু দেখে সে ভীষণ অবাক হলো।

একটা তাংহুলু শেষ হবার পথে, অন্যটায় কামড় বসাবে। বড় মাথা বলে উঠল, “ও লিটল পিয়ার, কী মজাই না খেতে! তাংহুলু আমি সত্যিই ভালোবাসি!”

“আমিও”, বলল লিটল পিয়ার। “তবে যেটা এখনও খাওয়া হয়নি, সেই গোটা তাংহুলু আমি তোমাকে দিয়ে দিতে পারি তোমার লাটিমটার বিনিময়ে।”

বড় মাথা কিন্তু রাজি হলো না তাতে। সে লিটল পিয়ারের চেয়ে একটু বড়। বুদ্ধিও তার একটু বেশি। তাই সে বলল, “আমার এত আদরের মূল্যবান লাটিমটা তোমাকে দিয়ে দিতে পারি না। তবে তুমি যদি তোমার তাংহুলুটা আমার সঙ্গে ভাগ করে খাও, তাহলে আমিও আমার লাটিমটা তোমার সঙ্গে ভাগ করে খেলব।”

তাই হলো। দুজনে পালা করে তাংহুলু খেতে লাগল। খেতে খেতে একসময় সবটা শেষ হয়ে গেল। তারপর পালা করে লাটিম ঘোরাতে লাগল। আর দুজনেরই মন ভরে উঠল আনন্দে।

চলবে…

আগের পর্ব

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ২

ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ১