Published : 25 Aug 2026, 04:23 AM
এরগু যেভাবে তার ঘুড়ি হারাল আর
লিটল পিয়ারকেও প্রায় হারাতেই বসেছিল
নববর্ষের উৎসব চলছিল। একদিন এরগু লিটল পিয়ারকে বলল, “চলো না, আমাদের নতুন ঘুড়িগুলো নিয়ে মাঠে যাই। আজ কী সুন্দর হাওয়া বইছে! দেখবে, ঘুড়িগুলো কত উঁচুতে উঠবে।” শুনেই আনন্দে লাফিয়ে উঠল লিটল পিয়ার। এমন সুন্দর, এমন বিরাট ঘুড়ি তার কখনো ছিল না। আকাশে উড়লে ঘুড়িটা কেমন দেখাবে, তা দেখার জন্য আর তর সইছিল না।
দুজনে ঘুড়ি নিয়ে মাঠের দিকে রওনা দিতেই ফটক থেকে মা ডেকে বললেন, “সাবধানে যেও তোমরা! এরগু, লিটল পিয়ারকে দেখে রেখো। আর লিটল পিয়ার, তোমার ঘুড়িটা যেন হারিয়ে বসো না আবার!”
গ্রাম ছাড়িয়ে ওরা মাঠের দিকে চলল। মা ফটকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন, মুখে তার মুচকি হাসি। চীনা মায়েরা তাদের বাচ্চাদের ঘুড়ি ওড়ানো পছন্দ করেন। বিশ্বাস করেন, ঘুড়ির সুতো বেয়ে ভালো আত্মারা আকাশ থেকে নেমে আসে তাদের কাছে, আর দুষ্ট আত্মারা তাদের ছেড়ে উড়ে পালায় আকাশের দিকে।
ওরা হেঁটে যাচ্ছিল আর মনের সুখে বকবক করছিল। মাঠের একেবারে মাঝখানে এসে থামল। এরগু চারদিকে তাকিয়ে বলল, “এই জায়গাটা বেশ হবে রে। কাছাকাছি কোথাও গাছপালা নেই, ঘুড়িগুলোও জড়িয়ে যাবে না। আর দেখো তো, এখানে হাওয়াটা কী দারুণ বইছে! আমাদের ঘুড়ি আজ অনেক উঁচুতে উড়বে দেখো।”
গ্রাম ছাড়িয়ে ওরা মাঠের দিকে চলল। মা ফটকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন, মুখে তার মুচকি হাসি। অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।
এরগুর ঘুড়িটা, সেই মস্ত হলুদ প্রজাপতি, প্রায় এরগুর নিজেরই সমান বড়। কিন্তু লিটল পিয়ারের ঘুড়ি, প্রকাণ্ড সেই সোনালি মাছ, সে তো বিরাট এক ব্যাপার! এতই বড় যে, ঘুড়িটা বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তুমি যদি লিটল পিয়ারকে দেখতে, তবে ঘুড়ির আড়ালে যে একটা ছোট্ট ছেলেও আছে, তা বুঝতেই পারতে না। তারপর ওরা যেই না সুতো ছাড়তে শুরু করেছে, অমনি ঘুড়ি দুটো এমন ঝাঁকুনি দিয়ে টান খেতে লাগল, মনে হলো হাওয়া বুঝি ঘুড়ি দুটোকে কেড়েই নেবে! এরগু আর লিটল পিয়ার শক্ত করে ঘুড়ির কাঠি ধরে রইল। এক মুহূর্তের জন্যও হাত আলগা করল না। খুব সাবধানে একটু একটু করে সুতো ছাড়তে লাগল।
দেখতে দেখতে হলুদ প্রজাপতিটা অনেক উঁচুতে উঠে গেল আকাশের। “ওহ্! ওহ্!” আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল এরগু। “কী সুন্দর দেখাচ্ছে! লিটল পিয়ার, তুমি যে বড্ড ধীরে ওড়াচ্ছ। তাড়াতাড়ি করো, তোমার ঘুড়িটাকেও আমারটার মতো উঁচুতে তুলে দাও। তা হলে ওরা দুজন নিজেদের মধ্যে গল্প করতে পারবে।”
লিটল পিয়ার কোনো জবাব দিতে পারল না। ঘুড়ির সুতো ধরে রাখতেই যে তার সব দম ফুরিয়ে যাচ্ছে! হাওয়া এমন জোরে টানাটানি করছিল যে, লিটল পিয়ার প্রায় পড়েই যায় আর কী! শেষে মাটিতেই বসে পড়ল সে। সুতোটা শক্ত করে ধরে ভাবতে লাগল, এভাবে চললে একটু পর সেও ঘুড়ির সঙ্গে উড়ে যাবে না তো! তবু ধৈর্য ধরে বাকি সুতোটুকু একটু একটু করে ছাড়তে লাগল লিটল পিয়ার।
কিন্তু লিটল পিয়ারের ঘুড়ি, প্রকাণ্ড সেই সোনালি মাছ, সে তো বিরাট এক ব্যাপার! অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।
ওদিকে এরগু মাঠজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল। ছুটতে ছুটতে বারবার কাঁধের ওপর দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেখছিল নিজের ঘুড়িটাকে। মস্ত হলুদ প্রজাপতি সেই ঘুড়িটা আকাশের বুক চিরে কী দ্রুতই না ভেসে চলেছে! “ওহ্, লিটল পিয়ার!” সে চেঁচিয়ে উঠল। “কী মজা! আমার যে মনে হচ্ছে, আমি নিজেই যেন উড়ছি!” আর ঠিক তখনই সে থেমে গেল হঠাৎ। তার চোখ-মুখ সব গোল হয়ে গেল। কারণ, এ কী দেখছে সে! বেচারা লিটল পিয়ার তার ঘুড়ির সুতো প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে আছে, আর বাতাস সেই প্রকাণ্ড ঘুড়িটাকে টানতে টানতে আকাশের আরও ওপরে, আরও দূরে নিয়ে যাচ্ছে—সঙ্গে লিটল পিয়ারকেও! তার পায়ের আঙুলগুলো মাটি ছেড়ে উঠে গেছে, তবু সে ঘুড়ির সুতো শক্ত করে ধরেই আছে।
“ওহ্, লিটল পিয়ার!” চিৎকার করে উঠল এরগু। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে তার নিজের সুন্দর হলুদ প্রজাপতিটিকে ছেড়ে দিয়ে ছোট ভাইকে বাঁচাতে ছুটল। বাতাস লিটল পিয়ারকে এমন দ্রুত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল যে, এরগুর মনে হল, সে বুঝি কিছুতেই আর তার ছোট ভাইটিকে ধরতে পারবে না! বাতাস ঘুড়িটাকে ওড়াচ্ছে, লিটল পিয়ারকে ওড়াচ্ছে—কিন্তু এ কী! এরগুকেও!
পেছন থেকে বাতাসের ধাক্কা পেয়ে এরগু ছুটল খুব জোরে। ছুটতে ছুটতে শেষমেশ লিটল পিয়ারের জ্যাকেটটা ধরে ফেলল সে—অবশেষে ধরে ফেলল লিটল পিয়ারকেই! আর তারপর দুজনেই ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল। “ওমা, এবার আমরা দুজনেই উড়ে যাব না তো!” মনে মনে ভাবল এরগু। কিন্তু না, দুজন মিলে এখন তারা বাতাসের চেয়েও যে শক্তিশালী। যেখানে ছিল সেখানেই স্থির হয়ে রইল ওরা। তারপর এরগু আর লিটল পিয়ার দুজনে মিলে আবার কাঠিটার চারপাশে সুতো গোটাতে লাগল। সাবধানে, খুব সাবধানে আকাশ থেকে ঘুড়িটাকে নামিয়ে আনল নিচে।
বাতাস লিটল পিয়ারকে এমন দ্রুত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল যে, এরগুর মনে হল, সে বুঝি কিছুতেই আর তার ছোট ভাইটিকে ধরতে পারবে না! অলংকরণ: এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোর।
অবশেষে সেই প্রকাণ্ড সোনালি মাছ ঘুড়িটা যখন মাটিতে এসে পড়ল এবং লিটল পিয়ার সুতোর শেষটুকু গুটিয়ে নিচ্ছিল, তখন এরগু আকাশের দিকে তাকাল। বহুদূরে তার প্রজাপতি ঘুড়িটা একটি হলুদ বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল। দেখে তার মনটা ভারি খারাপ হয়ে গেল। “তবু খুশি, লিটল পিয়ারটাকে তো পেলাম,” মনে মনে ভাবল সে, “আর একটু হলেই তো হারিয়ে বসতাম!”
বাড়ি ফিরে এলে মা জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা লক্ষ্মী বাচ্চা হয়ে ছিলে তো?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা খুব ভালো ছিলাম!” এরগু আর লিটল পিয়ার দুজনেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। “আমি আমার ঘুড়ি হারাইনি!” বলল লিটল পিয়ার। “আর আমি লিটল পিয়ারকে দেখেশুনেই রেখেছি!” বলল এরগু।
আর বাতাসের মধ্যে এত ছোটাছুটি ও খেলাধুলা করে তাদের এমন খিদে পেয়েছিল যে, নৈশভোজে তারা পেট ভরে খেল—ভুট্টার আটায় তৈরি ভাজা খাবার, শিমের অঙ্কুর আর গরম গরম চা।
চলবে...
আগের পর্ব
ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ১
ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ২
ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৩
ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৪