ছোট্ট নাশপাতি | এলিনর ফ্রান্সেস ল্যাটিমোরের ক্লাসিক | পর্ব ৬
লিটল পিয়ার আর বড় মাথা নিজেদের বানানো নৌকা দুটি নিয়ে পাল্লা দিত—কার নৌকা আগে যায়!
লিটল পিয়ার যেভাবে কাঁচা পিচফল খেলো
সেদিন ছিল বসন্তের এক উষ্ণ দিন। বড় রাস্তার ধারে পিচগাছগুলোতে ফুল ফুটে ঝরে গেছে। এখন গাছগুলো ছোট ছোট সবুজ কাঁচা পিচ ফলে একেবারে ভরে আছে। উইলো গাছগুলোও পালকের মতো কচি পাতায় হালকা সবুজ হয়ে উঠেছে।
মাঠে চাষিরা কাজে ব্যস্ত। এদিক-ওদিক কত নালা কেটে রেখেছে তারা। আর সেই নালা বেয়ে পানি ছুটে চলেছে কলকল করে। পেঁয়াজে পানি চাই, শিমে পানি চাই, বাঁধাকপিতে পানি চাই—আরও কত রকমের সবজি রয়েছে মাঠে, তাদেরও পানি চাই। তাই এই নালা।
কিন্তু গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে ওগুলো কি আর নালা! তাদের চোখে ওগুলো এক-একটা চমৎকার নদী—খেলনা নৌকা ভাসানোর নদী।
লিটল পিয়ার আর তার বন্ধু বড় মাথারও একটি করে নৌকা ছিল। নৌকা দুটি বানানো কাওলিয়াং দিয়ে। কাওলিয়াং একরকমের মিলেট বা জোয়ারজাতীয় খাদ্যশস্য। এর ডাঁটার বাইরের খোসা লম্বা লম্বা ফালি করে ছাড়িয়ে নেওয়া যায়। সেই ফালি আর ডাঁটার ভেতরের নরম শাঁস দিয়ে চীনের ছেলেমেয়েরা কত রকমের খেলনাই না বানায়!
লিটল পিয়ার আর বড় মাথা নিজেদের বানানো নৌকা দুটি নিয়ে পাল্লা দিত—কার নৌকা আগে যায়! কিন্তু মাঝে মাঝেই চাষিরা এসে তাদের খেলায় বাধা দিত।
“যাও, যাও, এখান থেকে!” চেঁচিয়ে উঠত তারা। “দুষ্টু ছেলের দল! আমাদের সবজিগুলো যে সব পায়ে মাড়িয়ে দিচ্ছ!” অমনি বড় মাথা আর লিটল পিয়ার সেখান থেকে চটপট সরে যেত। মাঠের আরও দূরে গিয়ে খুঁজে নিত অন্য কোনো জায়গা। সেখানে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু হতো প্রতিযোগিতা।
লিটল পিয়ার বলল, “ও বড় মাথা, চল এই নালাটাকেই হলুদ নদী ভেবে নেই। আমার নৌকাটা হলো তিন পাল বিশিষ্ট একটা জাঙ্ক (চীনা নৌকা)। দেখি তো, সামনের বাঁকটা পর্যন্ত কে আগে যেতে পারে!”
“আমার নৌকায় সাতটা পাল!” চেঁচিয়ে উঠল বড় মাথা। সে তার কাওলিয়াংয়ের টুকরোটা লিটল পিয়ারেরটার ঠিক পাশেই নালার পানিতে নামিয়ে দিলো। আর অমনি দুই নৌকা ছুটল মস্ত হলুদ নদী বেয়ে। পানির টানে ছোট্ট নৌকা দুটি তরতর করে এগিয়ে চলেছে। আর দুজন পাড় ধরে তাদের সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে।
উত্তেজনায় চেঁচিয়ে একবার একজন বলে, “আমারটা এগিয়ে গেছে রে!” আরেকজন বলে, “না, আমারটা!” “এই তো, এবার আমারটা আগে!” “না না, ওই দেখ, আমারটাই যাচ্ছে রে!” নৌকার দৌড় নিয়ে ওরা এমনই মেতে উঠল, খেয়ালই করল না—ছুটতে ছুটতে ভীষণ এক বদরাগী চাষির খুব কাছাকছি চলে এসেছে।
হঠাৎ চাষি হাঁক দিলো: “ছুবা!” মানে, “দূর হও এখান থেকে! তোমাদের কত বড় সাহস যে আমার খেতের ফসল সব পায়ে মাড়িয়ে দিচ্ছ? জলদি পালাও, নইলে পিটিয়ে মারবো!”
বড় মাথা আর লিটল পিয়ার এমন থতমত খেয়ে গেল যে, নৌকার দৌড়ের কথা একেবারেই ভুলে গেল। এমনকি তারা ভুলে গেল যে, তাদের নৌকা দুটি তখনও হলুদ নদী বেয়ে ভেসে চলেছে। দুজনেই প্রাণপণে দিলো ছুট! “ছুবা!” আবার চেঁচিয়ে উঠল চাষি। এবার সে তাদের পেছন পেছন তাড়া করল। লোকটা বেশ লম্বা, ন্যাড়ামাথা, আর পা দুটোও দীর্ঘ। বড় মাথা আর লিটল পিয়ার অবশ্য তাকে ভালো করে দেখার সময়ও পেল না। তবে তাদের মনে হল, লোকটা দেখতে বেশ ভয়ংকর!
ওরা ছুটল তো ছুটলই। বড় রাস্তার দিকে প্রাণপণে ছুটে চলল। একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছন ফিরে তাকাল লিটল পিয়ার। এ বাবা! তাকিয়েই আগের চেয়েও জোরে ছুটতে লাগল। চাষির হাতে যে একটা কোদাল! সেটা হাতে তাকে আগের চেয়েও ভয়ংকর দেখাচ্ছে।
“বড়—রাস্তায়—পৌঁছাতে—পারলেই,” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল বড় মাথা, “ওপাশে—গিয়ে—লুকোতে—পারব।” লিটল পিয়ার মাথা নাড়ল। মুখে কিছু বলার জো নেই। সে একটু নাদুস-নুদুস তো, তার ওপর জীবনে কখনো এমন জোরে ছোটেইনি!
অনেকটা ছুটে অবশেষে ওরা বড় রাস্তায় এসে পৌঁছাল। তারপর পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে—চাষি আর ওদের তাড়া করছে না। নিজের কাজে ফিরে গেছে।
“ও আচ্ছা—শুধু—আমাদের—ভয়ই—দেখাচ্ছিল,” তখনও হাঁপাতে হাঁপাতে বলছিল বড় মাথা। লিটল পিয়ার মাথা নাড়ল।
কাছেই একটা গাছ ছিল। তার নিচে বসে দুজনে একটু জিরিয়ে নিল। তারপর কিছুক্ষণ যেতেই হঠাৎ নৌকা দৌড়ের কথা মনে পড়ল।
“কে জানে, আমাদের জাঙ্ক দুটো এখন কোথায়!” বলল লিটল পিয়ার। “দৌড় বোধহয় এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছে রে,” বলল বড় মাথা। “আমার মনে হয়, আমারটাই জিতেছে।”
“উঁহু, আমারটাই জিতেছে—আমি ঠিক জানি!”
কিন্তু তখন আর ফিরে গিয়ে কে জিতেছে, তা দেখে আসতে তাদের মোটেই ইচ্ছে করে নি।
হঠাৎ লিটল পিয়ার বলল, “ওই দেখ! মাথার ওপরে গাছটায় কিছু দেখতে পাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ,” বলল বড় মাথা, “পিচ!”
সত্যিই তো! গাছভরা পিচফল—ডালে ডালে কত পিচ ঝুলছে! তবে সবই কাঁচা, সবুজ।
লিটল পিয়ার গাছের দিকে চেয়ে বলল, “কে জানে, খেতে কেমন! আমার যে খুব খিদে পেয়েছে—ভারি খিদে। আমার বেশ কয়েকটা খেতে ইচ্ছে করছে।”
বড় মাথা লিটল পিয়ারের চেয়ে একটু বড়, বুদ্ধিও তার একটু বেশি। সে বলল, “ওগুলো খেলে তোর পেট ব্যথা করবে খুব।”
লিটল পিয়ার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হল, মাত্র একটা পিচ খেলে কী আর এমন ক্ষতি হবে! আর এদিকে যে তার খিদেটাও বেড়েই চলেছে। “আচ্ছা, বড় মাথা,” সে বলল, “আমি শুধু একটা পিচফলই খাব। যদি দেখি তাতে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তখন না হয় আরও কয়েকটা খাব।”
বড় মাথাও মেনে নিল, একটা পিচ খেলে বোধহয় কারও কিছু হবে না। তাই ওরা একটা লাঠি খুঁজে এনে গাছের ডালে খোঁচাখুঁচি করতে লাগল। কিন্তু একটা পিচও পড়ল না।
“বড্ড শক্ত করে আটকে আছে,” বলল বড় মাথা। “দাঁড়া, আমি গাছে উঠছি!” বড় মাথা গাছে উঠতে শুরু করল। কিন্তু যতবারই একটু ওপরে ওঠে, ততবারই আবার খানিকটা পিছলে নিচে নেমে আসে। “এ গাছে ওঠা তো ভীষণ কঠিন রে!” বলল সে।
“আমি জানি কী করতে হবে,” লিটল পিয়ার বলল। “তুই হাঁটুতে হাত দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়া। আমি তোর পিঠের ওপর চড়ব।”
“এ তো বেশ ভাল বুদ্ধি রে!” বড় মাথা বলল। হাঁটুতে দু-হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল সে, আর লিটল পিয়ার চড়ে বসল তার পিঠে। তারপর, যেই না লিটল পিয়ার তিনটা পিচফল পেড়ে নিয়েছে—অমনি হুড়মুড় করে পড়ে গেল বড় মাথা, আর তার ওপর গিয়ে পড়ল লিটল পিয়ার!
দুজন আবার কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে পিচ তিনটা কুড়িয়ে নিল। বড় মাথা বলল, তার একটাও চাই না, একটাও না। সব কটাই লিটল পিয়ার খেতে পারে। “তবে সাবধানে খাস,” সে বলল। “প্রথমটা খেয়ে যদি পেট ব্যথা শুরু হয়, তবে বাকিগুলো আর খাস নে।”
তারপর লিটল পিয়ার— লিটল পিয়ার প্রথম পিচটা খুব সাবধানে খেতে লাগল। আর বড় মাথা উদ্বিগ্ন হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল। “খেতে ভালো?” জিজ্ঞেস করল সে।
“হ্যাঁ,” বলল লিটল পিয়ার। “কই, আমার তো একটুও খারাপ লাগছে না? আরেকটা খেলেও বোধহয় কিছু হবে না রে।” এই বলে দ্বিতীয় পিচটাও সে খেয়ে ফেলল। তারপর শেষ পিচটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। পিচটা এমনই ছোট্ট যে, শেষমেশ সেটাও খেয়ে ফেলল। তারপর লিটল পিয়ার আর বড় মাথা দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, কাঁচা পিচ বোধহয় বাচ্চাদের জন্য ভালোই।
কিন্তু দিনশেষে লিটল পিয়ারকে দেখে মা বললেন, “তোমাকে যে মোটেই ভালো দেখাচ্ছে না।” রাতে খেতে বসেও সে কিছু খেল না। রাতের খাবারে ছিল বাঁধাকপি-ভরা ভাপে সেদ্ধ ডাম্পলিং, সঙ্গে শিমের সস। তবু সে যখন কিছুতেই খেতে চাইল না, মা বললেন, “এ ছেলে নিশ্চয়ই অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”
তারপর তিনি লিটল পিয়ারকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। সারারাত লিটল পিয়ার তাদের চওড়া, শক্ত বিছানার একেবারে দূরের কোণে এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। ঘুমের মধ্যেও সে বকেই চলল—কখনো সেই ভয়ংকর চাষিদের কথা, কখনো পিচফলের কথা, কখনো হলুদ নদীর কথা; আবার কখনো জাঙ্ক নৌকা, কোদাল আর পিচ—সব মিলেমিশে একাকার! লিটল পিয়ারের তখন ভারি অসুখ।
পরদিন সকালে বড় মাথা তাকে দেখতে এলো। মুখখানা তার বেশ চিন্তিত। “কী হয়েছে রে তোর?” সে জিজ্ঞেস করল।
লিটল পিয়ার দুঃখ করে মাথা নাড়ল। “কাঁচা পিচফল আসলে বাচ্চাদের জন্য মোটেই ভালোকিছু নয় রে,” বলে সে।
লিটল পিয়ার সেরে ওঠার পর সে আর বড় মাথা আরও কতবার যে সেই নালাগুলোয় তাদের নৌকা ভাসিয়েছে, আরও কতবার যে নৌকাদৌড় হয়েছে। কিন্তু কাঁচা পিচফল?
কোনোদিনও ওরা কেউ আর মুখে নেয়নি।
চলবে...
আগের পর্ব
