লৌহকপাট বিতর্ক: সুর পাল্টানোর যুক্তি দেখছেন না সুজিত মুস্তফা

নতুন সুরের গানটি বাঙালি শিল্পীরা গাইলেও ‘আপত্তি তোলার সাহস’ তাদের হয়ে ওঠেনি বলে ধারণা করছেন সংগীতের এই শিক্ষক।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 Nov 2023, 06:35 PM
Updated : 26 Nov 2023, 06:35 PM

সিনেমায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গান ব্যবহার করতে গিয়ে সুর পরিবর্তনের যে ঘটনা ঘটেছে তার কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না শিল্পী ও সংগীতের শিক্ষক সুজিত মুস্তফা। 

রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড আউট’-এ তিনি বলেছেন, এই চলচ্চিত্রটি ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হওয়ায় বাঙালির অনুভূতিকে ‘সম্মান দেওয়া’ উচিত ছিল নির্মাতাদের। 

“এবং যেহেতু তারা এই বিশেষ গানকে গ্রহণ করেছে, লিরিকসও ঠিক রাখা আছে; তাহলে সুরটা ব্যবহারে সমস্যাটা কোথায়? আমি এটার কোনো কারণ দেখি না।” 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ এর সুর ‘বিকৃত করার’ অভিযোগ উঠেছে অস্কারজয়ী ভারতীয় সুরকার এ আর রহমানের বিরুদ্ধে।

রাজাকৃষ্ণ মেনন পরিচালিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক হিন্দি সিনেমা ‘পিপ্পা’র জন্য নজরুলের ওই গানটির নতুন কম্পোজিশন করেন রহমান।

কিন্তু অনেক শিল্পী ও শ্রোতার অভিযোগ, এ আর রহমানের হাতে পড়ে গানটি থেকে বিদ্রোহই হারিয়ে গেছে। অনেকেই এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন, সমালোচনায় মুখর হয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। 

বাংলাদেশ ও ভারতে তুমুল সমালোচনা-বিদ্রুপের মুখে ক্ষমা চেয়েছে ‘পিপ্পা'র নির্মাতা-প্রযোজকরা।

এক বিবৃতিতে প্রযোজনা সংস্থা রায় কাপুর ফিল্মস দাবি করেছে, তারা কবির পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজী ও তার পুত্র কাজী অনির্বাণের কাছ থেকে গানের স্বত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে যাবতীয় নিয়ম মেনেছেন। লিখিত চুক্তি করে এবং চুক্তি মেনে তারা গানটি ব্যবহার করেছেন।

এ আর রহমানের নতুন সুর নিয়ে বিতর্ক, এর অনুমতি, বাংলাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতি চর্চাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রোববার ‘ইনসাইড আউট’-এ কথা বলেন নজরুল সংগীত বিশেষজ্ঞ সুজিত মুস্তফা। 

রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে সম্প্রচার করা হয় ইনসাইড আউটের এই সর্বশেষ পর্বটি। 

যে প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য মাথায় রেখে নজরুলের গানটি বাছাই করা হয়েছে, সুর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তার উল্টোপথেই হাঁটা হয়েছে বলে মনে করছেন সুজিত মুস্তফা।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গাওয়া অসংখ্য গানের মধ্য থেকে এই গানটি যখন তারা বাছাই করেছেন, তার মানে তারা জানতেন এটা খুব জনপ্রিয় গান।

“যেটা মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি পুরো জানিতে উজ্জীবিত করেছে। সুতরাং এটা পরিবার বা যারা নজরুলের সৃষ্টিকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, তাদের দায়িত্ব ছিল এই অনুরোধ করা যে- মূল সুর যেন ব্যবহার করা হয়।”

সুজিত মুস্তফা বলেন, এ আর রহমান যখন সুর করেছেন, তখন তার এটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল।

“কেননা তিনি নিজেওতো সুরকার। কোনো একটা সিনেমায় যেভাবে ‍গান সংগীতায়োজন করেন, এখানেও সেভাবে করেছেন।”

গানটির আবেদন ধরে রাখার ক্ষেত্রে জাতীয় কবির পরিবারই ভূমিকা রাখতে পারত বলে মনে করেন শিল্পী সুজিত।

তিনি বলেন, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের এ আর রহমান হিন্দি ভাষাভাষীও নন। এ কারণে গানের ভাষা বোঝা তার জন্য হয়ত ‘কঠিনই’ ছিল।

“তিনি তার মত সুর দিয়েছেন। কিন্তু পরিবারের উচিত ছিল, তাকে এমন ধারণা দেওয়া বা অনুরোধ করা যে, ‘আপনি এই সুরের বাইরে যেতে পারবেন না’।”

নতুন সুরের গানটি বাঙালি শিল্পীরা গাইলেও এমন সুরের বিষয়ে আপত্তি তোলার সাহসটা হয়তো তাদের হয়ে ওঠেনি বলে ধারণা করছেন সুজিত মুস্তফা।

“যারা গেয়েছে, তারা সবাই বাঙালি শিল্পী। গানের মূল সুরটা কী- তাদের অবশ্যই জানা উচিত ছিল। হয়ত তারা খুব খুশি ছিল এ আর রহমানের দলের সদস্য হতে পেরে বা এ আর রহমানের অধীনে গান গেয়ে। সুতরাং তাদের সাহস হয়ে ওঠেনি এটা বলা যে, এই হচ্ছে মূল গান বা মূল সুর। হয়ত এমনটা ঘটেছে। কিন্তু আমি জানি না, আসলে কী ঘটেছে।”

‘সুর বিকৃতি’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে পিপ্পা সিনেমায় গানটির ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নজরুল পরিবারেই বিভক্তি দেখা দেওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে।

নজরুলের পুত্রবধূ প্রয়াত সংগীত শিল্পী কল্যাণী কাজী ২০২১ সালে গানটি ‘অবিকৃত’ রেখে ‘পিপ্পা’ টিমকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন, সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে কাজী অনির্বাণ।

সেই অনুমতি কেবল মৌখিক ছিল না। ‘যাবতীয় নিয়ম মেনে’ করা সেই চুক্তিপত্র অনির্বাণের কাছে বলে দাবি করেছেন তার বোন অনিন্দিতা।

নজরুলের নাতি-নাতনিদের মধ্যে দুই চাচাতো ভাইবোন খিলখিল কাজী এবং কাজী অরিন্দম মুক্তি পাওয়া ‘পিপ্পা’ সিনেমা থেকে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটি সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে মতামত তুলে ধরেছেন। গানের স্বত্ব হস্তান্তর নিয়ে তাদের ক্ষোভ রয়েছে।

তবে চুক্তি হিসাবে যে কাগজ প্রকাশ্যে এসেছে, তা সত্য হলে আদালতে গিয়ে কিছু করার থাকবে না পরিবারের।

সুজিত মুস্তফা বলেন, চুক্তির ডকুমেন্ট হিসাবে যেটা সামনে এসেছে, তা স্ট্যাম্পে নয় এবং উভয়পক্ষের সই থাকার কথা থাকলেও তা নেই। আছে কেবল পরিবারের সই।

“এ কারণে আমি কিছুটা সন্দিহান। হতে পারে, এটা মূল দলিল নয়। তবে সেখানে যে লেখা আমি দেখেছি, তাতে রিক্রিয়েশনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এখানে আদালতে যাওয়া এবং এ আর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ তাদের নেই।”