Published : 14 Feb 2026, 02:53 PM
"আমরা না থাকলেও ব্যান্ড সংগীতে নতুন যেসব দল আসছে তারা ব্যান্ড সংগীতকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। উত্তরাধিকার তৈরি হয়ে যায়, এটা আগে থেকে বলা যায় না। আমাদের কাজ হচ্ছে গানগুলি একবার ইন্টারনেটে তুলে রাখা, তাহলেই গানটা স্থায়ী হয়ে গেল”-এই কথাগুলো ব্যান্ডতারকা প্রয়াত শাফিন আহমেদের।
মৃত্যুর মাস দেড়েক আগে গ্লিটজকে দেওয়া এক দীর্ঘ আলাপে ব্যান্ড সংগীত ও নিজের গানের উত্তরাধিকার নিয়ে এই কথাগুলো বলেছিলেন তিনি।
তবে এ প্রসঙ্গে এই শিল্পী কোনো ব্যক্তি বা ব্যান্ডের কথা বলেনি; বরং ভরসা রেখেছিলেন 'সময় আর নতুন প্রজন্মের ওপর'।
শনিবার শাফিন আহমেদের ৬৫তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে শিল্পীর স্মরণে তার সেই শেষ সাক্ষাৎকারের কথাগুলো তুলে ধরা হল।

ব্যান্ড সংগীতেরে উত্তরাধিকার কে বহন করবে জানতে চাইলে শাফিন গ্লিটজকে বলেছিলেন, “উত্তরাধিকার কে হবে, কারা হবে এটা তো আমার পক্ষে বলে দেওয়া সম্ভব না। কিন্তু আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, পরবর্তী প্রজন্মের ব্যান্ডগুলো এই জায়গাটা নিতে পারবে।”
কথায় কথায় ব্যান্ড সংগীতের পথচলার কথাও টেনে এনেছিলেন তিনি।
শাফিন বলেন, "ব্যান্ড মিউজিকটা তো বেশি দিন আগের ব্যাপার না বাংলাদেশে। ৮০ দশকের শেষের দিক থেকে জিনিসটা একটা গতি পেয়েছে, একটা মুহূর্ত পার করছিল। নব্বই দশকে চূড়ান্তভাবে অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে গেছে ব্যান্ড মিউজিক। কিন্তু শুরুর দিকে অনেক সমালোচনা ছিল। অনেকে জিনিসটাকে সহজভাবে নিতে পারে নাই। যার কারণে এটাকে অপসংস্কৃতি বলত। এখন সেই ব্যান্ড মিউজিক কিন্তু বাংলাদেশের মূল ধারার মিউজিকে চলে আসছে অনেক দিন হলো, কয়েক দশক ধরে।"
তরুণদের মধ্যেই তিনি দেখেছিলেন উত্তরাধিকারের সম্ভাবনা। তার ভাষায়, “উত্তরাধিকার অবশ্যই আসবে। ব্যান্ড মিউজিকে শুরুর দিকে অগ্রগামী যারা ছিলেন তাদের অনেকেই কিন্তু এখনো কাজ করছেন। অনেকগুলো ব্যান্ডই কিন্তু এখনো সচল। সুতরাং আমরা তো আছি ফিল্ডে। পরবর্তীতে অনেকগুলো ব্যান্ডও তাদের মত জায়গা করে নিয়েছে। আমরা না থাকলেও তারা কিন্তু ভালোভাবে শ্রোতাদের আনন্দ দিতে পারবে, সেই লক্ষণটা আমরা দেখতে পারছি।"
নতুন প্রজন্মের ভক্ত-শ্রোতাদের আগ্রহকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন শাফিন। কনসার্টে ভিড়, পছন্দের ব্যান্ড নিয়ে উচ্ছ্বাস এসব তার কাছে ছিল সুস্থ ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত।
উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখতে শিল্পীদের করণীয় সম্পর্কেও ছিল তার স্পষ্ট মত। শাফিন বলেন, "আমরা যারা এই ধারার মিউজিকে শুরু থেকে কাজ করে আসছি, আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের ফুল গানের ক্যাটালগগুলিকে ইন্টারনেটে তুলে রাখা। সেটা ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমেই হোক বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমেই হোক, ফুল ক্যাটালগটা দিয়ে রাখা দরকার। একবার সেখানে গান তুলে রাখলেই এটা স্থায়ী হয়ে গেল আর গানটাও নিজের গতিতে এগিয়ে গেল।"
২০২৪ সালের ২৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একটি হাসপাতালে মারা যান শাফিন আহমেদ। কনসার্ট করতে জুলাইয়ের ৯ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন শাফিন। সেখানে একটি কনসার্টে গানও করেন।
২০ জুলাই ভার্জিনিয়াতে আরেকটি কনসার্টে পরিবেশনার কথা ছিল শাফিনের। কিন্তু হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে সেখানকার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চারদিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাকে, কিন্তু জীবনে ফেরানো যায়নি।
কফিনবন্দি হয়ে শাফিন দেশে ফেরেন ২৯ জুলাইয়ে। পরদিন ৩০ জুলাই বনানী কবরস্থানে শায়িত হন শাফিন।
বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনের দুই মহারথী সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম এবং সুরকার কমল দাশগুপ্তের ছেলে শাফিন নিজে ছিলেন বেইজ গিটারিস্ট, সুরকার এবং গায়ক।
পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে ছোটবেলা থেকেই গানের আবহে বেড়ে উঠেছেন শাফিন। বাবার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত আর মায়ের কাছে নজরুলগীতি শিখেছেন।
ফরিদ রশিদের হাত ধরে ১৯৭৯ সালে বড় ভাই হামিন আহমেদ ও শাফিন গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘মাইলস’। প্রথম কয়েক বছর তারা বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে ইংরেজি গান গাইতেন।
এরমধ্যেই প্রকাশিত হয় দুইটি ইংরেজি গানের অ্যালবাম ‘মাইলস’ ও ‘এ স্টেপ ফারদার’। পরে মাইলসের বাংলা গানের প্রথম অ্যালবাম ‘প্রতিশ্রুতি’ বের হয় ১৯৯১ সালে।

ওই অ্যালবামের জনপ্রিয়তার পর বিটিভিতে বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানে দেখা যেতে থাকে মাইলসকে। ধীরে ধীরে মাইলস দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।
মাইলসের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘প্রথম প্রেমের মতো’, ‘গুঞ্জন শুনি’, ‘সে কোন দরদিয়া’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘ধিকি ধিকি’, ‘পাহাড়ি মেয়ে’, ‘নীলা’, ‘কি যাদু’, ‘কতকাল খুঁজব তোমায়’, ‘হৃদয়হীনা’, ‘স্বপ্নভঙ্গ’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘শেষ ঠিকানা’, ‘পিয়াসী মন’, ‘বলব না তোমাকে’, ‘জাতীয় সঙ্গীতের দ্বিতীয় লাইন’ ও ‘প্রিয়তমা মেঘ’।
কয়েক বছর আগে মাইলস থেকে আলাদা হয়ে শাফিন আহমেদ গড়ে তোলেন ‘ভয়েস অব মাইলস’ নামের তার নিজস্ব একটি ব্যান্ড। তবে সেই ব্যান্ডটিরও আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
আরও পড়ুন:
শাফিন নেই এক বছর: 'খারাপ সময়ে মনে হয় পাপাকে ফোন দিই'
মিউজিক এখন কেউ কিনে শোনে না: শাফিন আহমেদ
ধ্রুপদী সংগীত পরিবারের এক রকস্টার শাফিন আহমেদ
ঝরে গেল ব্যান্ড সংগীতের আরেক তারা, চলে গেলেন শাফিন আহমেদ
পুরনো জিনিস ঘাঁটানোর দরকার নেই: শাফিন আহমেদ
গানে গানেই 'লিজেন্ড' বিতর্কের জবাব দিলেন ফুয়াদ-শাফিন