Published : 12 May 2026, 07:22 PM
প্রয়াত গুণী অভিনেতা ও নির্দেশক আতাউর রহমানকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের পাশাপাশি নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষজন এসেছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে তার মরদেহ শহীদ মিনারে আনা হলে ফুলে ফুলে ঢেকে যায় প্রাঙ্গণ। নাট্যকর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠক, সহশিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীরা শেষবারের মত শ্রদ্ধা জানান এই নাট্যজনকে।
সেসময় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে অভিনেত্রী লাকী ইনাম স্মরণ করেন আতাউর রহমানের সঙ্গে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা।
তিনি বলেন, “১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সবে জন্ম হয়েছে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের’। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকের মঞ্চ প্রযোজনার কাজ চলছে। সেই নাটকেই আতাউর রহমানের নির্দেশনায় প্রথম মঞ্চে কাজ করি। তিনি হাতে ধরে আমাকে মঞ্চে থিয়েটার করা শিখিয়েছিলেন। উনি আমার প্রথম নির্দেশক।”

একই সঙ্গে মঞ্চ ও টেলিভিশনে অভিনয় এবং নাট্য নির্দেশনায় সমান দক্ষতা রাখা গুণী নাট্যজন আতাউর রহমান সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পপুলার হাসপাতালে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর৷
স্বাধীনতা ও একুশে পদক পাওয়া এ শিল্পীর মৃত্যুর খবরে রাতেই সংস্কৃতি কর্মীদের অনেকে ভিড় করেন হাসপাতালে। শিল্পীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ছোট-বড় সবার কাছে আতা ভাই হিসেবে পরিচিত আতাউর রহমানের মরদেহ বিকালে শহীদ মিনারে আনা হলে সবাই শোকাতুর হয়ে পড়েন। আবেগাপ্লুত হয়ে তার সঙ্গে কাজের ও আড্ডার স্মৃতিচারণ করেন তারা।
লাকী ইনাম বলেন, আতাউর রহমান ছিলেন অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন মানুষ। যখনই মাইক্রোফোন পেতেন, তার বক্তৃতায় উঠে আসত বিশ্বের বিখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক, নাট্য গবেষক ও দার্শনিকদের নানা রেফারেন্স।
“একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘আপনি কখন এত লেখাপড়া করেন আতা ভাই? আপনার থেকে আমাদের শেখার শেষ হবে না এ জনমেই। উত্তরে আতা ভাই শুধু হেসে বলতেন, ‘আমার পড়তে ভালো লাগে’।”
আবেগমাখা কণ্ঠে তিনি বলেন, “আতা ভাই চলে গেছেন। যেখানে গেছেন ভালো থাকুন। আমরা আপনাকে ভুলব না। আপনি আমাদের হৃদয়ে সবসময়ের জন্য থাকবেন।”

সোমবার ছিল আতাউর রহমানের বিবাহবার্ষিকী। এ দিনই তাকে চলে যেতে হল বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।
তিনি বলেন, “সোমবার আতা ভাইয়ের স্ত্রী শাহিদা রহমানের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম তিনি জানালেন, তাদের বিবাহবার্ষিকী ছিল গতকাল। মনটা খারাপ হয়েছিল শুনে। যে দিনটি পরিবারের জন্য আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, সেদিনই তাকে হারাতে হল। এই বেদনা তার স্ত্রী শাহিদা রহমানকে সারাজীবন বহন করতে হবে।”
বর্ষীয়ান এ নাট্যজন বলেন, “এই শোক আসলে সহ্য করা যায় না। ভালোবাসার বিশেষ দিনে প্রিয় মানুষের বিদায়ের বেদনা আতাউর রহমানের স্ত্রীকে আমৃত্যু বইতে হবে।”

ছায়ানট থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, “সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে যারা অগ্রগণ্য, আতাউর রহমান ছিলেন তাদেরই একজন। তার চলে যাওয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
রবীন্দ্রনাথের নাট্যচর্চায় আতাউরের বিশেষ অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “‘রক্তকরবী’সহ রবীন্দ্রনাথের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নাটকের প্রযোজনা তিনি করেছেন। রবীন্দ্র নাট্যধারার ওপর তার গভীর দখল ছিল। সেই জায়গা থেকেও আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়লাম।”
নাট্যজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, “সে আমার অগ্রজ। আমাদের সম্পর্ক ছিল তুই-তুকারির। ৫৫ বছরের বেশি সময়ের সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধেও আতাউর রহমানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মঞ্চে সবাই একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা।”
অভিনেতা ও নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম বলেন, মঞ্চে একসঙ্গে কাজ না হলেও টেলিভিশনে আতাউর রহমানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। তাদের প্রজন্মের কাছে আতাউর রহমান ছিলেন একজন আলোকবর্তিকার মত পাণ্ডিত্য, রবীন্দ্রচর্চা ও শিল্পবোধের জন্য আলাদা মর্যাদার অধিকারী।
“আতাউর রহমানের নির্দেশনা ছিল স্বতন্ত্রধর্মী। অভিনয়, আবৃত্তি, সাহিত্য ও শিল্পের নানা বিষয়ে তার গভীর দখল ছিল। স্পষ্টবাদিতাও ছিল তার বড় গুণপছন্দ বা অপছন্দ সরাসরি বলে দিতেন, যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হলেও তিনি এটিকে ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য বলেই মনে করেন।”

আতাউর রহমানকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে শহীদ মিনারে আরও এসেছিলেন তারিক আনাম খান, খায়রুল আনাম শাকিল, মফিদুল হক, আসিফ মনির, শংকর সাঁওজাল, মোহাম্মদ বারী, সারাহ জাকির, আজাদ আবুল কালাম, জিতু আহসান, কমাল উদ্দিন, রওনক হাসান, পার্থ তানভির নভেদ, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, মোসাদ্দেক হোসেন মান্না, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, নাসিরুল হক খোকন, তামান্না রহমান, আমিনুর রহমান মুকুল ও কাওসার চৌধুরীসহ অনেকে।
এছাড়া কণ্ঠশীলন, ছায়ানট, উদীচী, ঢাকা থিয়েটার, প্রাচ্যনাট, পদাতিক নাট্যসংসদ, নাট্যদল বটতলা, আব্দুল্লাহ আল-মামুন থিয়েটার স্কুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যবিভাগ, ডিরেক্টরস গিল্ড, অভিনয়শিল্পী সংঘ, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ ও বাংলাদেশ আবৃত্তিশিল্পী সংসদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এর আগে মগবাজারের ইস্পাহানী সেঞ্চুরি আর্কেডে তার বাসার সামনের খোলামাঠে বাদ জোহর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকটি মাধ্যমে কাজ করেছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব। অভিনয়ের পাশাপাশি আতাউর রহমান মঞ্চনির্দেশনা করেছেন। লেখক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।
১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত।
মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য তিনি ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে পান স্বাধীনতা পুরস্কার।