Published : 21 Jun 2023, 01:38 AM
বাংলাদেশে মঞ্চ নাটক অঙ্গনের দলগুলোর সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ব্যাংক হিসাব দেড় বছর ধরে বন্ধ, অথচ সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মসূচি প্রায় নিয়মিতভাবেই চলে আসছে।
অভিযোগ উঠেছে, ফেডারেশনের বেশিরভাগ কর্মসূচিতেই অর্থ সংস্থান করা হচ্ছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে। আর ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকী একইসঙ্গে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ায় পরিচালনা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে একাডেমির অর্থ দিচ্ছেন ফেডারেশনকে।
শিল্পকলা একাডেমি আইনে আছে, এর পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক ‘প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যসম্পাদন করিবেন’ মহাপরিচালক, পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্যও ‘দায়ী থাকিবেন’।
অথচ মহাপরিচালক লাকী পরিচালনা পরিষদের তোয়াক্কাই করেন না বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সদস্য।
২৭ সদস্যের এই পরিচালনা পরিষদে পদাধিকারবলে সভাপতি হন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী; আর পদাধিকার বলে মহাপরিচালক হন সদস্য সচিব।
এক দশক ধরে শিল্পাকলার মহাপরিচালকের পদে থাকা লাকী অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
তিনি দাবি করেছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা অনুসরণ করেই তিনি কাজ করেন। আর পরিষদের নিয়মিত সভায় বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনাও হয়।
২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদকে বহিষ্কারের পর সংগঠনের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ফেডারেশনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ নাট্যকর্মীরা।
লাকী শিল্পকলার মহাপরিচালক পদে আরও ২ বছর
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে শিল্পকলার মহাপরিচালক লাকী
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ছাড়ল ঢাকা থিয়েটার
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন নিয়ে ‘অস্থিরতা’, কোন পথে নাট্যাঙ্গন?
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন: পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত নাট্যাঙ্গন
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনে ‘অনিয়ম’ নিয়ে গত ১৬ জুন বিকালে জাতীয় নাট্যশালার সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ হয় ‘সাধারণ নাট্যকর্মীবৃন্দ' ব্যানারে।
ফেডারেশনের টাকা কোথা থেকে আসছে- প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সেই সমাবেশে নাট্যনির্দেশক ও অভিনয়শিল্পী আজাদ আবুল কালাম বলেন, “গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি এখন বন্ধ করা আছে। তাহলে ফেডারেশনের টাকা এখন কোথা থেকে আসছে? আমরা যারা প্রতিবাদ সমাবেশ করছি, নিজেদের পকেটের টাকা চাঁদা দিয়ে। কিন্তু তারা এসি রুমে বসে সংবাদ সম্মেলন করছে। তাদের টাকা কোথা থেকে আসে?"
“অযোগ্যরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে” অভিযোগ করে তিনি বলেন, “কে হল পাবে, কাকে হল দেওয়া হবে- সব ঠিক করছে কিছু অযোগ্য লোক।”

সমাবেশের পাল্টায় সেদিন দুপুরে জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেছিল গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, যে সংঠনটি এখন অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জর।
সেখানে অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফেডারেশনের সভাপতি লাকী বলেছিলেন, “যারা অভিযোগ করছেন, তারা ফেডারেশনের কেউ না।
“ফেডারেশনের সদস্যরা আমাকে সভাপতি পদে রেখেছেন। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন গণতান্ত্রিক সংগঠন। গঠনতন্ত্র মেনে পরিচালিত হচ্ছে। আমি তো আগেও শিল্পকলার মহাপরিচালক ছিলাম, পরে ফেডারেশনের সভাপতি হয়েছি। তখন তো কোনো সমস্যা হয়নি।”
‘পরিষদের আর কী দরকার?’
গত ১৬ জুন সাধারণ নাট্যকর্মীদের প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন একুশে পদকজয়ী নাট্যব্যক্তিত্ব আহমেদ ইকবাল হায়দার। তিনি শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনা পরিষদেরও সদস্য। ওই সমাবেশেই তিনি বলেছিলেন, শিল্পকলার সাম্প্রতিক অধিকাংশ কর্মসূচিই পরিষদকে না জানিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ইকবাল হায়দার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন সাম্প্রতিক সময়ে যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তার বেশিরভাগ আয়োজনেই আমরা দেখছি ব্যানারে লেখা থাকে ‘সহযোগিতায়: শিল্পকলা একাডেমি’।
“নানান মাধ্যমে কথা হচ্ছে, ফেডারেশনের এসব কর্মসূচিতে শিল্পকলা একাডেমি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় টাকাটা দেওয়া হচ্ছে, তা পরিষদ সভায় অনুমোদন করানো তো দূরে থাক, জানানোই হয় না।”
সাম্প্রতিক কয়েকটি আয়োজনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “৬৪ জেলায় গণহত্যার বিষয় নিয়ে পরিবেশ থিয়েটার করা হল। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আয়োজন, অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সেটি কীভাবে করা হল? কত টাকা ব্যয় হল? আমরা কিছুই জানি না। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে একটা করে শো করে, ছবি তুলে চলে আসল। জনসমাজে এই কাজটির প্রভাব কী তৈরি হল, এসব নিয়ে পরিষদ সভায় জানানো হল না।
“এছাড়া ‘স্বল্পব্যয়ে নাটক’ এবং ‘মহাস্থান’ নামে নাটক করা হয়েছে। সেখানে কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনছি। কিন্তু পরিষদের সদস্য হয়েও আমরা সেটি জানতে পারছি না। পরিষদ সভায় এসব আনা হয় না।”
“এটা অবশ্যই শিল্পকলা একাডেমির আইন লঙ্ঘন। মহাপরিচালক পরিচালনা পরিষদকে তোয়াক্কাই করছেন না। কিন্তু আইনে আছে পরিষদ থেকে সকল পরিকল্পনা অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। কিন্তু মহাপরিচালক সেটি করছেন না,” বলেন ইকবাল হায়দার।

পরিষদের আরেকজন সদস্য, রংপুর বিভাগ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সমন্বয়ক এবং রংপুর শিখা সংসদের সভাপতি বিপ্লব প্রসাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি ১২ বছর ধরে শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনা পরিষদে আছি। বর্তমান মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী সাম্প্রতিক যেসব কর্মসূচি পরিকল্পনা করছেন এবং বাস্তবায়ন করছেন, তার কিছুই পরিষদ সভায় অবহিত করেন না।
“সবশেষ বৈঠকেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন, সকল কর্মসূচিই পরিষদ থেকে অনুমোদন করে নিতে হবে। কিন্তু সেটি হচ্ছে না।”
মহাপরিচালক লাকী নিজের ‘ইচ্ছেমতো একাডেমি চালাচ্ছেন’ বলে অভিযোগ করেছেন পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও রাজশাহীর অনুশীলন নাট্যদলের প্রধান অধ্যাপক মলয় ভৌমিক।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিনি শিল্পকলার মহাপরিচালক এবং গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্বে থাকার কারণে তার অনুগত অনেককে নানা রকম সুবিধা দিচ্ছেন, বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। কিন্তু পরিষদের অনুমোদন ছাড়া উনি যদি কোনো টাকা ব্যয় করেন, সেটি অবৈধ।”
পরিষদের অন্যতম সদস্য রামেন্দু মজুমদার তো এভাবে পরিষদ রাখা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিল্পকলার কোনো কর্মসূচিই পরিষদকে অবহিত করা হয় না। কোথায় টাকা দেওয়া হচ্ছে, কী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার কিছুই আমরা জানি না, আমাদেরকে জানানো হয় না।
“পরিষদের সভাপতি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী, আমি প্রতিমন্ত্রীকে বলেছি- এভাবেই যদি চলে, তাহলে পরিষদের আর দরকার কী? পরিষদ বাদ দিয়ে দিলেই তো হয়।”
পরিষদের সভায় এ নিয়ে কথা তুলেছিলেন কি না- জানতে চাইলে রামেন্দু মজুমদার বলেন, “পরিষদ সভায় আমরা অনেকবার প্রতিবাদ জানিয়েছি, পরিষদের সভাপতি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীকেও বলেছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।”

মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে পরিষদের সদস্যদের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এক খালিদ বিডিনিউজ েটায়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরিষদ সদস্যদের সকল বক্তব্যের সাথে আমি একমত নই।”
এনিয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
যা বলছেন লাকী
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকলে কর্মসূচি পালনে অর্থের সংস্থান কীভাবে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে রাখা হয়েছিল লাকীকে।
জবাবে তিনি বলেছিলেন, “মন্ত্রণালয়ের অনুদান, শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতাসহ সদস্যদের চাঁদা এবং বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে ফেডারেশন।”
পরিষদ সদস্যদের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানের কাজের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিল্পকলায় সারা বছর আমরা কী কাজ করব, তার জন্য মন্ত্রণালয়ের সাথে আমাদের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সেখানে মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সচিব এবং শিল্পকলার পক্ষে মহাপরিচালক স্বাক্ষর করেন। সেই চুক্তিটা আবার কেবিনেটে চলে যায়। এই চুক্তির আওতায় বছরব্যাপী কর্মসূচিগুলো উল্লেখ থাকে এবং এটা বিধিসিদ্ধ।
“এর বাইরে ছোট ছোট আরও কিছু কাজ হয়, যেগুলো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশে কিংবা আমাদের সংসদীয় কমিটি আছে, তাদের নির্দেশে করা হয়।”
১৯৮৯ সালে প্রণীত যে আইনের অধীনে শিল্পকলা একাডেমি একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে চলছে, সেই অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান উদ্দেশ্য জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ললিতকলা, জাতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও প্রসার ঘটান এবং তার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা।
সেই আইনে বলা আছে, একাডেমির সাধারণ পরিচালনা ও প্রশাসন একটি পরিষদের উপর ন্যস্ত থাকবে এবং পরিষদ সেই সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কাজ করতে পারবে, যা একাডেমি কর্তৃক প্রযুক্ত ও সম্পন্ন হইতে পারে।
মহাপরিচালক একাডেমির সার্বক্ষণিক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন এবং তিনি পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যসম্পাদন করবেনশিল্পকলা একাডেমি আইন
আইনেই বলা আছে, মহাপরিচালক একাডেমির সার্বক্ষণিক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন এবং তিনি পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যসম্পাদন করবেন এবং পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য দায়ী থাকবেন।
পরিষদকে না জানিয়ে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে আর্থিক সহযোগিতা করার বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক লাকী বলেন, “শিল্পকলা একাডেমি যখন নৃত্য নিয়ে কিছু আয়োজন করে, তখন নৃত্যশিল্পীদের যে ফেডারেটিভ সংগঠন আছে, তাদের সাথে নিয়েই করে। তেমনি নাটক নিয়ে যখন কিছু করে, তখন নাটকের ফেডারেটিভ বডি হিসেবে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে সাথে নিয়েই যৌথভাবে আয়োজন করে।”
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এখন ‘১০ মিনিটের নাট্যোৎসব’ নামে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সেটাও শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যৌথ আয়োজনে করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পরিষদ থেকে কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার কোনো বিষয় নেই দাবি করে লাকী বলেন, “বছরব্যাপী সকল কর্মসূচিই এপিএ চুক্তির অধীনে বাস্তবায়ন হয়।”
বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে পরিষদকে না জানিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আইনের লঙ্ঘন কি না- প্রশ্নে তিনি বলেন, “বাংলা একাডেমিও তো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তারাও কিন্তু এপিএ চুক্তির অধীনে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। শিল্পকলা একাডেমিও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বিধি মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।”
তাহলে পরিষদের ভূমিকা কী থাকে- জানতে চাইলে মহাপরিচালক লাকীর উত্তর আসে, “পরিষদের নিয়মিত সভা হয় এবং সেখানে বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।”