Published : 13 Jun 2026, 02:05 PM
বিশ্বসাহিত্যের কথা উঠলেই যে নামটি হিমালয়ের মতো অটল আর প্রশান্ত ভঙ্গিতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তিনি লিও তলস্তয়। তুষারশুভ্র দীর্ঘ দাড়ি, ঋষিসুলভ চাউনি আর মহাকাব্যিক সব সৃষ্টি, এই হলো তার পরিচিত অবয়ব।
কিন্তু এই কিংবদন্তি লেখকের বিশাল হৃদয়ের গহিনে লুকিয়ে ছিল এক অবুঝ শিশুর হাহাকার। যে শিশুটি তার জীবনের ঊষালগ্নেই হারিয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, তার মা। তলস্তয়ের বয়স তখন ২ বছরও পূর্ণ হয়নি। মা মারিয়া ভলকনস্কায়া তাকে ছেড়ে চলে যান না-ফেরার দেশে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ২ বছরের ব্যবধানে মায়ের কোনো স্মৃতিই লিওর মনে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি বাড়িতে মায়ের কোনো ছবি বা প্রতিকৃতিও ছিল না। আর এ শূন্যতাই তলস্তয়ের জীবনে আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছিল।
প্রিন্সেস মারিয়া ভলকনস্কায়া ছিলেন রাশিয়ার এক প্রভাবশালী অভিজাত পরিবারের সন্তান। উচ্চশিক্ষিত এ নারী বহু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, ছিলেন এক নিপুণ গল্পকার। সমসাময়িকদের বর্ণনা অনুযায়ী, মারিয়া দেখতে খুব একটা সুন্দরী ছিলেন না এবং এ নিয়ে তিনি কিছুটা কুণ্ঠিত থাকতেন। কিন্তু তলস্তয়ের কাছে তার মা ছিলেন সৌন্দর্যের অতীত কোনো এক পবিত্র সত্তা।
যেহেতু কোনো ছবি ছিল না, তাই তলস্তয় তার কল্পনার তুলিতে মায়ের এক অনন্য রূপ সৃষ্টি করেছিলেন। আত্মীয়স্বজন আর পরিচারিকাদের মুখে শোনা গল্পের ওপর ভিত্তি করে তিনি তার মাকে গড়ে তুলেছিলেন এক ‘নিখুঁত আদর্শ’ হিসেবে। সেখানে কোনো খুঁত নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। তার মা হয়ে উঠেছিলেন নিঃস্বার্থ ও ঐশ্বরিক ভালোবাসার চিরন্তন প্রতীক।
তলস্তয়ের দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় জীবনে যখনই কোনো ঝঞ্ঝা এসেছে, যখনই তিনি প্রলোভনের চোরাবালিতে পা দিয়েছেন, তখনই তিনি তার প্রয়াত মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন। তিনি নিজেই লিখেছেন, “তিনি আমার কাছে এমন এক উচ্চতর, পবিত্র ও আধ্যাত্মিক সত্তা ছিলেন যে, জীবনের মধ্যগগনে যখনই আমি প্রলোভনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, তখনই তার আত্মার কাছে সাহায্য চেয়ে প্রার্থনা করেছি। আর সেই প্রার্থনা আমাকে কখনো বিমুখ করেনি।”
এক অদ্ভুত সমর্পণ ছিল এ প্রার্থনায়। জগতের সব কোলাহল ছাপিয়ে তলস্তয় যেন তার মায়ের সেই অদৃশ্য অস্তিত্বের সঙ্গে কথা বলতেন। মা ছিলেন তার নৈতিক কম্পাস। যখনই পথ হারানোর ভয় জেগেছে, মায়ের সেই কাল্পনিক পবিত্রতা তাকে আলোর পথ দেখিয়েছে।
তলস্তয়ের সৃষ্টিগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে আছেন তার মা। বলা হয়ে থাকে, বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র প্রিন্সেস মারিয়া বলকনস্কায়া আসলে তার মায়েরই একটি ছায়া। উপন্যাসে প্রিন্সেস মারিয়া দেখতে সুন্দরী নন, কিন্তু তার চোখ দুটো ছিল গভীর আর আধ্যাত্মিক জ্যোতিতে উজ্জ্বল, ঠিক যেমনটি তলস্তয় তার মাকে কল্পনা করতেন।
আবার তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘চাইল্ডহুড’-এর ‘মামান’ চরিত্রটি তো সরাসরি তার মায়েরই স্মৃতি ও কল্পনার মিশেল। তলস্তয় তার মাকে সাহিত্যে অমর করে রাখার মাধ্যমেই যেন নিজের সেই শৈশবের শূন্যতাকে পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন।
তলস্তয়ের জীবনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার মৃত্যুচিন্তা এবং তার মায়ের স্মৃতি এক অবিচ্ছেদ্য সুতোয় গাঁথা। মনোবিশ্লেষকরা মনে করেন, তলস্তয়ের জীবনে প্রথম বড় আঘাত ছিল মাতৃহীনতা। তার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘নোটস অফ আ ম্যাডম্যান’-এ যে তীব্র মৃত্যু-উদ্বেগ বা ‘আর্জামাস আতঙ্ক’-এর কথা বলা হয়েছে, তার মূলে রয়েছে এই বিচ্ছেদজনিত হাহাকার।
তলস্তয়ের কাছে মৃত্যু মানে ছিল এক প্রকার ‘মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া’। তিনি বিশ্বাস করতেন, জন্মের সময় আমরা যে ‘প্রবেশদ্বার’ দিয়ে পৃথিবীতে আসি, মৃত্যু আসলে সেই একই ‘প্রস্থানদ্বার’ দিয়ে ফিরে যাওয়া। তার ব্যক্তিগত পুরাণে একটি অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। তলস্তয় জন্মেছিলেন তাদের পৈতৃক বাড়ির এক ‘সবুজ সোফায়’। আর সারা জীবন তিনি এক ‘সবুজ কাঠির’ (লিটল গ্রিন স্টিক) রহস্য খুঁজে বেড়িয়েছেন, যেখানে লেখা ছিল মানুষের সব দুঃখ অবসানের মন্ত্র।
জীবনের শেষ ইচ্ছা হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন সেই সবুজ কাঠির জায়গাতেই যেন তাকে সমাহিত করা হয়। যেন সেই সবুজ সোফা (জন্ম) আর সবুজ কাঠি (মৃত্যু) মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এক চিরন্তন মাতৃত্বে।
১৮৭৮ সালে ‘মাই লাইফ’ নামক এক খসড়ায় তলস্তয় আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছিলেন শৈশবের স্মৃতি মনে করার অক্ষমতা নিয়ে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “আমি কখন বাঁচতে শুরু করেছিলাম? কেনই বা আমি সেই সময়ের কথা ভেবে এত সুখ পাই যা মাঝে মাঝে ছিল ভয়ংকর?” তার কাছে শৈশবের সেই প্রথম কয়েক বছর ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, যখন তিনি তার মায়ের বুকের দুধ খেতেন, হাসতেন আর মাকে খুশি করতেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের বাকি সময়ে তিনি যা অর্জন করেছেন, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্জন করেছিলেন শৈশবের সেই দিনগুলোতে। তলস্তয়ের এই দর্শন আসলে এক চিরন্তন সত্যকেই তুলে ধরে, মানুষ যত বড়ই হোক, যত বড় জ্ঞানী বা সাধুই হোক না কেন, মনের কোনো এক গহিন কোণে সে সবসময় সেই ফেলে আসা শৈশব আর মায়ের আঁচল খুঁজে বেড়ায়।
লিও তলস্তয়ের ৮২ বছরের দীর্ঘ পথচলা আসলে ছিল সেই হারানো মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক মহাকাব্যিক যাত্রা। ১৯১০ সালের এক কনকনে শীতের রাতে যখন তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন এবং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন এক নির্জন স্টেশনে, তখনো কি তার অবচেতন মন সেই মমতাময়ী মায়ের কোলটিকেই খুঁজছিল না?
সূত্র: গেটওয়ে টু রাশিয়া, ড্যানিয়েল র্যাঙ্কুর-লাফেরিয়ারের বই ‘তলস্তয় অন দ্য কাউচ: মিসোজিনি, ম্যাসোকিজম অ্যান্ড দ্য অ্যাবসেন্ট মাদার’।