Published : 19 May 2026, 07:21 PM
আমের মৌসুম এলেই অনেকে বাজারে গিয়ে একসঙ্গে অনেকটা আম কিনে আনেন। পরিবারের সবাই মিলে খাবেন, কিছু ফ্রিজে রাখবেন — পরিকল্পনাটা সুন্দর।
তবে তিন-চার দিন যেতে না যেতেই দেখা যায় বোঁটার দিকটা কালো হয়ে গেছে, আম নরম হয়ে চুপসে গেছে, কোনোটায় আবার পচন ধরেছে। ফ্রিজে রাখা আমও রক্ষা পায়নি।
এই হতাশার পেছনে আমের দোষ নেই। দোষ হলো সংরক্ষণের পদ্ধতিতে। সামান্য কিছু বিষয় জানলেই পাকা আম অনেকদিন তাজা রাখা সম্ভব।
শুরুটা হোক বাজার থেকেই
পাকা আম ভালো রাখার চেষ্টা শুরু করতে হয় কেনার সময় থেকেই।
ঢাকার বাদামতলীর পাইকারি আড়তদার আব্দুল কাদের জিলানি বলছেন, “সবচেয়ে বড় ভুল হল- একেবারে পেকে যাওয়া, নরম আম কিনে বাড়ি নিয়ে আসা। এই আমগুলো আনার পরদিনই নষ্ট হতে শুরু করে।”
বুদ্ধিমানের কাজ হল- হালকা পাক ধরেছে এমন আম কেনা। যেটা রং ধরেছে, সুগন্ধ আছে, তবে এখনও একটু শক্ত।
এই আম বাড়িতে এনে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখলে আস্তে আস্তে পাকবে এবং স্বাদও ভালো হবে। তাড়াহুড়া করে একেবারে পাকা আম কিনলে সময়টা পাওয়া যায় না, আম সামলানোও কঠিন হয়।
ফ্রিজ কি আমের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা?
অনেকে মনে করেন, আম মানেই ফ্রিজে রাখতে হবে। তবে পুরোপুরি পাকা আমের জন্য এই ধারণা সব সময় ঠিক নয়।
আব্দুল কাদের জিলানি বলেন, “আধা পাকা বা সবে পাকা আম ঘরের ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখলে বরং বেশিদিন ভালো থাকে। রান্নাঘরের কোণে, বিছানার নিচে বা এমন কোনো জায়গায় যেখানে সরাসরি রোদ পড়ে না— এই জায়গাগুলো আম রাখার জন্য ভালো। শুকনা ও বাতাস চলাচল করে এমন পরিবেশ আমকে তাজা রাখে।”
আম পুরোপুরি পেকে গেলে এবং আরও দুতিন দিন রাখতে চাইলে ফ্রিজে রাখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ফ্রিজের নিচের তাক বেছে নিতে হবে, যেখানে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম ঠাণ্ডা।
প্লাস্টিক ব্যাগ আমের শত্রু
“বাজার থেকে আনার পর অনেকে প্লাস্টিকের ব্যাগেই আম রেখে দেন। এটাই সবচেয়ে ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোর একটি।
প্লাস্টিকের ভেতরে বাতাস চলাচল করে না। ফলে আর্দ্রতা জমে যায় এবং সেখান থেকেই পচন শুরু হয়। আমের গায়ে পানির ফোঁটা জমলে সেটা আরও দ্রুত নষ্ট হয়”- বলেন জিলানি।
এর বদলে কাগজের ব্যাগ বা বাঁশের ঝুড়ি ব্যবহার করা উপকারী।
“এগুলো বাতাস চলাচলে সাহায্য করে এবং আর্দ্রতা শুষে নেয়। পুরানো খবরের কাগজে আলাদা আলাদা করে মুড়িয়ে রাখলেও আম বেশিদিন তাজা থাকে”- পরামর্শ দেন এই ফল ব্যবসায়ী।
একটা পাকা আম বাকি সবগুলোকেও পাকিয়ে দেয়
পাকা আম থেকে একটি প্রাকৃতিক গ্যাস বের হয়— যাকে বলে ‘ইথিলিন’। এই গ্যাস আশপাশের আমগুলোকেও দ্রুত পাকিয়ে দেয়।
একটা বেশি পাকা আম যদি কাঁচা বা আধা পাকা আমের সঙ্গে রাখা হয়, তবে সবগুলো আমই কয়েকদিনের মধ্যে একসঙ্গে পেকে নষ্ট হয়ে যায়।
সমাধান সহজ। বেশি পাকা আম আলাদা করে রাখতে হবে। আগে সেগুলো খেয়ে ফেলতে হবে। যেগুলো এখনও শক্ত বা কম পাকা, সেগুলো আলাদা জায়গায় রাখতে হবে।
জিলানি আরও পরামর্শ দেন, “চাইলে চালের কৌটোর মধ্যে আম রাখা যেতে পারে পারেন। চাল আর্দ্রতা শুষে নেয়, ফলে আম তুলনামূলকভাবে বেশিদিন ভালো থাকে।”
সারা বছর আমের স্বাদ পেতে চাইলে
মৌসুম শেষে আমের আফসোস করেন অনেকে। তবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে মৌসুমের পরেও আম খাওয়া সম্ভব।
এই বিষয়ে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর হোম ফুড প্রিজারভেশন’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন খাদ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ ড. এলিজাবেথ এল. অ্যান্ড্রেস এবং ড. জুডি এ. হ্যারিসন বলেন, “ডিপ ফ্রিজে ফল রাখার সময় সবচেয়ে বড় শত্রু হল ভেতরের বাতাস বা অক্সিজেন। বাতাস থাকলে আমের আর্দ্রতা শুকিয়ে চামড়া খসখসে হয়ে যায় এবং স্বাদ নষ্ট হয়, যাকে 'ফ্রিজার বার্ন' বলে।”
তাই ফ্রিজারে রাখতে পাকা আম খোসা ছাড়িয়ে ছোট টুকরা করে কেটে নিতে হবে। তারপর একটি ট্রেতে আলাদা আলাদা করে সাজিয়ে ফ্রিজারে রেখে জমিয়ে নিন। জমে গেলে জিপলক ব্যাগে ভরে আবার ফ্রিজারে রেখে দিন।
এই পদ্ধতিতে আম জমিয়ে রাখলে টুকরাগুলো একসঙ্গে আটকে যায় না, প্রয়োজনমতো বের করে নেওয়া যায়।
এই জমানো আম দিয়ে সারা বছর জুস, স্মুদি, আমের মিষ্টি বা যে কোনো ডেজার্ট বানানো সম্ভব। স্বাদও প্রায় তাজা আমের মতোই থাকে।
আরও পড়ুন