শ্রেষ্ঠ উন্নয়ন গল্পের একটি বাংলাদেশ: বিশ্ব ব্যাংক এমডি

বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংকের কার্যক্রমের ৫০ বছর পূর্তি; ৫ কোটি ডলারের ঋণ দিয়ে শুরু, এখন তা ৩৯০০ কোটি ডলার।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Jan 2023, 07:16 PM
Updated : 22 Jan 2023, 07:16 PM

শূন্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অসাধারণ অগ্রগতির প্রশংসা করার পাশাপাশি উন্নত দেশ হওয়ার পথে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতির পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশন) অ্যাক্সেল ফন ট্রোটসেনবার্গ।

বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংকের কার্যক্রমের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রোববার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “৫০ বছর পরে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ উন্নয়ন গল্পের একটি। বিশ্বকে দারিদ্র্য কমানো ও উন্নয়নের অসাধারণ গল্প বলছে বাংলাদেশ।

“শুরুতে সবচেয়ে দরিদ্র দেশের একটি থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত অগ্রসরমান অর্থনীতির একটি। ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ লাখ লাখ লোককে দারিদ্র্য থেকে বের করেছে। ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমানে মাথাপিছু জাতীয় আয় ২১ গুণ বেড়েছে, ২০১৫ সালে পৌঁছেছে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে। বাংলাদেশ এখন উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে রয়েছে।”

যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা সফরে এসে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বিশ্ব ব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা।

তাদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের অগাস্টে বহুজাতিক এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয় বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে পাঁচ কোটি ডলারের জরুরি পুনরুদ্ধার ঋণের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযেগিতার সূচনা করে বিশ্ব ব্যাংক।

সময়ের ধারাবাহিকতায় গত ৫০ বছরে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) আওতায় বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিশ্রুত উন্নয়ন সহযোগিতার পরিমাণ তিন হাজার ৯০০ কোটি ডলার।

বর্তমানে ৫৩টি প্রকল্পে প্রায় এক হাজার ৫৩০ কোটি ডলারের অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ আইডিএ কর্মসূচির বাস্তবায়ন চলছে এবং বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার।

Also Read: জুতায় পাথর ঢোকে, সরিয়ে এগোতে হয়: পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক এমডি

Also Read: উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হতে পাশে থাকবে বিশ্ব ব্যাংক

পাঁচ দশকের এমন কাজের উদযাপনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের উপস্থিতিতে ওই অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেন বিশ্ব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফন ট্রোটসেনবার্গ।

বাংলাদেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন, মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অগ্রগতির কথা অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে তুলে ধরেন তিনি।

একশ’ ডলারের কম মাথাপিছু আয় দিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশে এখন এই সূচকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮২৪ ডলার। ২০৩১ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হলে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছাড়াতে হবে পাঁচ হাজার ডলারের বেশি।

উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট এ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে কী করা প্রয়োজন, সেই পরামর্শ দিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “এটা খুবই সুস্পষ্ট একটি লক্ষ্যমাত্রা, যাতে পৌঁছার জন্য কোথায় গুরুত্ব দিতে হবে, তা সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে।

“এবং তার মানে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য অব্যাহত সংস্কার করতে হবে; যাতে সেটা উচ্চতর আয়ের পর্যায়ে যাওয়ার প্রয়োজন মেটাতে পারে।”

দীর্ঘদিনের সহযোগী হিসেবে কোভিড ১৯ মহামারী ও ইউক্রেইন যুদ্ধের ধাক্কা মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

সংস্কার কোন কোন খাতে করতে হবে, তার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রপ্তানির বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাত, জ্বালানি এবং জলবায়ু সহনশীলতার খাতে জোরালো সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘ মেয়াদী প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।”

তিনি বলেন, অবকাঠামো বিনিয়োগ, ডিজিটালাইজেশন এবং মানবসম্পদকে টেকসই রাখাই হবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য শর্ত।

“প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী রাখার পথে মুখ্য হবে প্রাণবন্ত বেসরকারি খাত ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ। সেজন্য ন্যূনতম শুল্ক কমানো, শুল্ক-বহির্ভূত বাধা দূর এবং সেবাখাতের বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে শুল্ক ব্যবস্থাকে যৌক্তিকিকরণ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

এক্ষেত্রে ১৯৭০ সালে পুরো বছরে ৫০ কোটি ডলার থেকে গত নভেম্বরে শুধু এক মাসে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় করার মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাবনার জানান দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন বিশ্ব ব্যাংকের এমডি।

তিনি বলেন, সফল উন্নয়নের ফলাফল ধরে রাখতে, টেকসই প্রবৃদ্ধিকে সাহায্য এবং দারিদ্র্য কমানোর জন্য বাংলাদেশকে স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে হবে, যা নিবদ্ধ আছে জোরালো সামষ্টিক অর্থনৈতিক-আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে।

“এসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারযোগ্য খাতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে বিশ্ব ব্যাংক; সময়মত যেগুলোর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে উচ্চ আয়ের দিকে যাওয়ার পথ তৈরি হবে।”

উন্নত দেশের যাত্রায় বিশ্ব ব্যাংককে পাশে চান কামাল

অনুষ্ঠানে উচ্চমধ্যম আয় ও স্মার্ট-উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বিশ্ব ব্যাংকসহ সব উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

তিনি বলেন, “এখন আমাদের পরবর্তী টার্গেট হচ্ছে বাংলাদেশকে ২০৩১ সালের মধ্যে একটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা পরের টার্গেট।”

এসময় হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “আমরা জানি বিশ্ব ব্যাংক কখনও কাউকে না বলতে পারে না।”

অর্থমন্ত্রী কামাল বলেন, বাংলাদেশের এ বিপুল উন্নয়নের ভিত্তি আসলে আমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের। তারই সুযোগ্য রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনাই প্রশ্নাতীতভাবে এই আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার।

তার সঙ্গে দেশের মানুষের কঠোর পরিশ্রমের ফসল আজকের এই বাংলাদেশ, যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এই উন্নয়ন অভিযাত্রায় বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শরীফা খান আগামী ২০২২- ২০২৭ মেয়াদে বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের অংশীদারিত্ব কৌশলে সরকারের বর্তমান চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুরোধ করেন।

অনুষ্ঠানে প্যানালিস্টের আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার, বিশ্ব ব্যাংকে বাংলাদেশের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক আহমেদ কাইকাউস, মিগা এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জুনাইদ কামাল আহমেদ, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর, এমসিসিআই এর সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক