Published : 21 Jan 2026, 12:43 AM
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ‘অতিরিক্ত নিন্ত্রণের’ মধ্যে দিয়ে গেছে, এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উদারীকরণের পথে হাঁটার কথা বলেছেন।
তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত, তাই আমাদের ডি-রেগুলেশন ও উদারীকরণের পথে হাঁটতে হবে। এত বেশি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।”
মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে একটি হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।
রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে ‘পোস্ট ইলেকশন ২০২৬ হরাইজন; ইকোনোমি, পলিটিক্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল মার্কেট’ শীষর্ক এই আয়োজনে আমীর খসরু বলেন, “ভোটের পূর্ব প্রস্ততি চলছে। আমরা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা হল নির্বাচনি প্রক্রিয়া যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।
“১৬, ১৭ বা ১৮ বছর পর নাগরিকরা তাদের ভোট দিয়ে এমন একটি সরকার গঠন করার সুযোগ পাবেন, যারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।”
বিশ্বজুড়ে অনেক ‘ফান্ড ম্যানেজার’, যাদের মধ্যে অনেকে প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন তারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেই জন্য বাংলাদেশকে কঠোর সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, এমন মত দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত, তাই আমাদের ডি-রেগুলেশন এবং উদারীকরণের পথে হাঁটতে হবে।”
তার মতে, বাংলাদেশের বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো নীতিগত বিকৃতি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশি আইন ও বিধিনিষেধ যুক্ত হয়েছে মন্তব্য করে আমীর খসরু বলেন, “অনেকগুলোই মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আপনি হয় বাজারব্যবস্থা রাখবেন, নয়তো রাখবেন না—দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়। বাজারের ওপর আস্থা রাখতে হলে বাজারকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে।
“বাস্তবতা হল, গত দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্যে চলে গেছে।”
এ অবস্থা থেকে বের হওয়াটাই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যাপক সংস্কার, উদারীকরণ এবং বাজারমুখী নীতি। হোক সেটা বিনিময় হার, পুঁজিবাজার কিংবা আমদানি–রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই বাজারকে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে।’’
‘বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে উঠানো’
সেমিনারের দ্বিতীয় পর্বে প্যানেল আলোচনার সঞ্চালক ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের পরিচালক ও ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের প্রশ্নে আমীর খসরু বলেন, আমানত ও ঋণ বিতরণের সময়ের বিশাল ব্যবধানের কারণে ব্যাংকে তারল্য ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, “ব্যাংকগুলো থেকে যথেচ্ছ ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার কিছু অংশ ব্যবসায় ব্যবহৃত হলেও কিছু অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, যা আর্থিক খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।”
নির্বাচিত সরকারের প্রতি জনগণ ও বিদেশিরা আস্থা রাখবে, এমন আশা প্রকাশ করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, “যারা নিজেদের ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, তারা সরকারের ওপর আস্থা পাবেন। আমরা যদি নিজেদের সরকারের ওপর আস্থা রাখতে না পারি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কীভাবে আস্থা রাখবে?’’
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের কারণে ভিয়েতনাম ও চীন সমস্যায় পড়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ অনেক ‘সুবিধাজনক’ স্থানে আছে বলে দাবি করেন তিনি।
আমীর খসরু বলেন, “প্রতিনিয়ত বিদেশিরা বাংলাদেশ আসছেন, কিন্তু তারা বিনিয়োগ করছেন না। নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছেন।
“নির্বাচিত সরকার এলে সবাই বিনিয়োগ করবেন।”
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস রাখতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই বিশ্বাসের অভাব। আস্থাহীনতার কারণে ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।”
আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হল, অর্থনীতিকে এখান থেকে কীভাবে তুলে আনা হবে? তিনি বলেন, “আমাদের সংস্কারের বিকল্প নেই। সংস্কারেই যেতে হবে, বাজারই ঠিক করবে কী ধরনের সংস্কার লাগবে।

“পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা আনতে হবে। আমি এ কথার সঙ্গে একমত যে, বছরের পর বছর ধরে যেসব ‘গারবেজ অ্যাকাউন্ট’ দিয়ে সাজানো হয়েছে, সেগুলো পরিষ্কার করা জরুরি। প্রতিবছর হিসাব সাজিয়ে সমস্যা ঢাকার কোনো মানে নেই; এতে সমস্যা আরও বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে মূলত এই হিসাব সাজানোর সংস্কৃতির কারণেই।’’
ব্যাংকিং খাতে খেলাপী ঋণ এখন প্রায় ৩৬ শতাংশ, প্রকৃত চিত্র তুলে আনলে তা ৪০ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করেন সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী।
তার মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে দেশি ও বিদেশি সবাইকে বাস্তব ও স্বচ্ছ আর্থিক চিত্র দেখাতে হবে।
সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে সরকারি কয়টি সংস্থা তালিকাভুক্ত হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি ভালো প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করতে হবে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে চলতে দিতে হবে। তাদেরকে আনতে (তালিকাভুক্ত) হলে ভিন্ন ধরনের প্যাকেজ দিতে হবে।”
সেমিনার সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের পরিচালক ও ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
দ্বিতীয় পর্বে প্যানেল আলোচনার সদস্য ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন জানতে চান বিএনপি সরকার গঠন করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে কি না।
জবাবে আমীর খসরু বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) হচ্ছে বিশেষ ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
“শুধু স্বায়ত্তশাসন যথেষ্ঠ না, সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রচলিত অর্থের ব্যাংকের মত না। সেন্ট্রাল ব্যাংকের জন্য প্রয়োজন সেন্ট্রাল ব্যাংকার, পেশাদার ব্যাংকার। সেন্ট্রাল ব্যাংক পরিচালনার জন্য আলাদাভাবে ব্যাংকার তৈরি করতে হবে।”
একইভাবে বিএসইসির জন্য পৃথক পেশাদার জনবল নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অল্প কিছু টাকা দিয়ে তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যাবে না। ভালো বেতন দিতে হবে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। সবকিছু স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক অবস্থায় দুরাবস্থায় চলে যাওয়া বেসরকারি খাতের শরীয়াভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করেছে। ব্যাংক বহির্ভূত ৯ এনবিএফআইকে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আগামীতে ব্যাংক খাত কেমন যেতে পরে সঞ্চালকের প্রশ্নে মাশরুর আরেফিন বলেন, “ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি না মানায় এসব ব্যাংক সমস্যায় পড়েছে। অতীতে হওয়া একই ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারী, অর্থপাচার, বেনামী ঋণ, ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর হবে না।”
তিনি বলেন, “সব ব্যাংকের তারল্য খারাপ অবস্থায় নেই। ভালো ব্যাংকগুলোর খেলাপী ঋণের হার ৫ শতাংশের মধ্যে। এ কারণে ব্যাংক খাতে বর্তমানে অতিরিক্ত প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারবে।”
ব্যাংকে বিশাল তারল্য থাকার পরও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত নভেম্বরে নেমেছে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এত তারল্যর পরও ব্যাংক ঋণে ভাটার টানের কারণ তুলে ধরে মাশরুর আরেফিন বলেন, “সার্বিকভাবে বিনিয়োগ খুব একটা খারাপ অবস্থায় নেই। আমদানি বাড়ছে, সেখানে ব্যবসায়ীদের ঋণ আছে। ব্যবসায়িক পরিস্থিতি এখনো স্থবিরতায় থাকায় প্রকৃত বিনিয়োগে কম ঋণ যাচ্ছে, কারণ হচ্ছে ব্যবসয়ীরা নির্বাচন দেখতে চাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা সময় নিচ্ছেন বিনিয়োগে যাওয়ার জন্য।”
জামায়াত ইসলামী সরকার গঠন করলে শরীয়াহভিত্তিক অর্থনীতি কেমন হবে, এই প্রশ্নে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মহাসচিব আতীকুর রহমান বলেন, “সুদমুক্ত কল্যাণকর একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠন করা হবে, যেখানে আমানতকারী ও ব্যাংক দুইজনই লাভবান হবে। মেধাভিত্তিক জনবল নিয়োগ হবে। প্রতিটি নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত হবে কল্যাণকর, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত কর হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম তুলে ধরেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন।
মূল প্রবন্ধে অর্থনীতিবিদ এম এ রাজ্জাক বলেন, “এলডিসি উত্তরণের পর ইইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে রপ্তানিতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সুবিধা বাতিল হবে। এখনই সময় হচ্ছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা। এটি আমাদের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
“কমপ্লায়েন্সে ইস্যুতে শুধু পণ্যর দামই একটি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে না। শ্রমিকের মজুরিও কত হবে তা গুরুত্ব হয়ে দাঁড়াবে। এখনই এলডিসি পরবর্তী সময়ের জন্য সুবিধার মেয়াদ বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা দরকার। পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখতে হবে।”
সেমিনারে অনলাইনে দুই শতাধিক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভার্চুয়াল প্যানেল আলোচনায় যুক্ত হন প্রভা হেলথ কেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সিলভানা কাদের সিনহা, সুইডেনভিত্তিক টুন্ড্রা ফন্ডারের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ম্যাটিয়াস মার্টিনসন ও ফ্লোরিডাভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কনটেক্সচুয়াল ইনভেস্টমেন্ট এলএলসি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকাও হিরোসে।