Published : 05 Oct 2025, 02:46 PM
ভারতের সহযোগিতায় পাহাড়িদের সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ‘সিএইচটি সম্প্রীতি জোট’ নামে একটি সংগঠন।
রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটির নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার পদত্যাগের দাবিও জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সমন্বয়ক থোয়াইচিং মং শাক বলেন, “খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত রাখার জন্য দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে।
“কখনো বাঙালি-অবাঙালির মধ্যে দাঙ্গা, কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই; আবার কখনো আামাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের উপর বর্বরোচিত হামলা ঘটছে।”
তিনি বলেন, “সবচেয়ে দুখঃজনক হল— ভারতীয় সহযোগিতায় চাকমা জাতি পরিচালিত ইউপিডিএফ ও জেএসএস নামক সংগঠনসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। তারা সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি, লোভ ও প্রলোভন দেখিয়ে ভারত থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণে উৎসাহিত করছে।
“প্রতিবছর এসব সংগঠন কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার—এমনকি সাধারণ কৃষক পর্যন্ত জিম্মি করেছে। সেই অর্থ দিয়ে ভারত থেকে অস্ত্র আনা হয়। আবার অনেক নেতা পালিয়ে ভারতে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে এবং সেখান থেকেই ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার নীলনকশা আঁকছে।”
থোয়াইচিং মং শাক বলেন, “প্রতিনিয়ত পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এসব সংগঠন। ইউটিউব, ফেইসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে সেনাবাহিনী ও বাঙালিদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হল- বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা এবং সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।”
১৯৯৭ সালে সরকার এবং জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে পার্বত্য শান্তি চুক্তি হয়। তবে দীর্ঘ সময়েও চুক্তির বেশির ভাগ বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ করে আসছেন পাহাড়ি নেতারা।
এক প্রশ্নের জবাবে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সমন্বয়ক থোয়াইচিং মং শাক বলেন, “নামে শান্তি চুক্তি হলেও এই চুক্তির মূলে রয়েছে অশান্তি। এই চুক্তির ২৮ বছর চলছে, সামনের ডিসেম্বরে ২৯ বছর হবে। এই ২৯ বছরে সে (সন্তু লারমা) কী করেছে? সে যেটা করেছে তা হচ্ছে—গুম, খুন, হত্যা, চাঁদাবাজি, রাহাজানি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সরল মানুষকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
“তিনি প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র কিনেছেন এবং ভারতে সম্পদ গড়েছেন। এই ২৮ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার চেয়েও বড় ফ্যাসিস্ট হচ্ছে সন্তু লারমা। সেই সন্তু লারমা বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ উড়িয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বেড়াবে, এই বিষয়ে বাংলাদেশের নাগরিকরা এখনো জানে না।”
১৯৪৪ সালে জন্ম নেওয়া জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা সন্তুর বাবা চিত্ত কিশোর চাকমা এবং মা সুভাষিনী দেওয়ান। তিনি ১৯৮৩ সালে নিহত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ছোট ভাই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘উগ্রতা’ ছড়ানোর জন্য এনজিওদের দায়ী করে থোয়াইচিং মং শাক বলেন, “এই এনজিওদের ফান্ড আপনি বন্ধ করেন দেখবেন, আদিবাসী শব্দ কেউ উচ্চারণ করবে না। সমতলে অনেক সুশীল দেখবেন যারা আমাদের জোর করে আদিবাসী বানাতে চায়। যাতে করে সে লাগেজ ভর্তি টাকা নিয়ে বাসায় ফিরতে পারে।
“আপনি আমার জাতীয় পরিচয় বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করেন। কিন্তু আপনি সেই পশ্চিমের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য আদিবাসী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।”
সংবাদ সম্মেলনে সিএইচটি সম্প্রীত জোটের সদস্য আইনজীবী পারভেজ তালুকদার বলেন, “পাহাড়ে এখনো অস্ত্রের ঝনঝনানি। ইউপিডিএফ থেকে শুরু করে জেএসএস সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত নিরীহ জনগণের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, নিষ্পেষণ চালিয়ে যাচ্ছে। সন্তু লারমা তার প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। ১৯৯৭ সালে হওয়া চুক্তিতে একটি মাত্র ধারা বাস্তবায়নে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। সেটা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনা।
“তাই আজকে দাবি করতে চাই, সন্তু লারমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। কারণ তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন।”
তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ নিষ্পেষিত, একমাত্র চাকমা ছাড়া। চাকমাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ শিক্ষিত জনগণ রয়েছে। তাদের ৯৫ শতাংশ লোকজন চাকরি-বাকরি করে। আমরা চাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্প্রীত আসুক। পাহাড়ি বাঙালি সবাই মিলেমিশে বসবাস করুক। সব রকম উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সরকার করুক। এবং এই যে সন্ত্রাসী তাদের গ্রেপ্তার করুক।
“পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ১৫ লাখ মানুষ আছেন। তাদের জন্য ১৫টা অথরিটি আছে। স্বাধীনতার পর থেকে তারা কাজ করে যাচ্ছে। সেখানে চাকরি বাকরিতে ৯৮ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে নেয়া হয়।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের মুখ্য সমন্বয়ক পাইশিখই মারমা, সমন্বয়ক রাকিব হোছাইন নওশাদ, ইখতিয়ার ইমন ও তনময় হোসেন নাসির।