Published : 14 Jul 2026, 12:02 PM
রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের একাংশের ডাকা কর্মবিরতিতে রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকাসহ সারাদেশের সব রুটে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে শ্রমিক নেতা মোমিনুল ইসলাম মোমিন জানিয়েছেন।
এই পরিবহন ধর্মঘটের কারণে দূরপাল্লার যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে যাত্রীদের সুবিধার্থে কাউন্টারগুলো খোলা রাখা হয়েছে এবং টিকেটের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে সোমবার বিকালে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে তার সম্মেলন কক্ষে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সেখান থেকে বেরিয়ে শ্রমিকদের একাংশ ধর্মঘটের ডাক দেন।
হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা। অশেকা জাইমা নামের ঢাকাগামী এক যাত্রী বলেন, “মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাকি রাজশাহীর সঙ্গে সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা যারা সকালের টিকেট কেটেছি, আমাদের একবার জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি তারা।”
আক্ষেপের স্বরে তিনি বলেন, “যাদের নানা জরুরি কাজ রয়েছে তারা কীভাবে যাবে সেই চিন্তাও তাদের নেই। সাধারণ যাত্রীদের এমন ভোগান্তিতে ফেলার কোনো মানেই হয় না। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হল, আমাদের কাউন্টারে গিয়ে জানতে হচ্ছে বাস চলবে না, আগে থেকে কোনো ঘোষণা বা নোটিশ দেওয়া হয়নি।”
এর আগে সোমবার বিকাল থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে কয়েক ঘণ্টার জন্য বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে জেলা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় রাত ৮টার দিকে দূরপাল্লার বাসগুলোকে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে সংকটের সমাধান না হওয়ায় শ্রমিকদের একটি অংশ মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে ফের ধর্মঘট শুরু করে।
গত কয়েক মাস ধরে রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্য নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে সংগঠনটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শ্রমিক নেতা মোমিনুল ইসলাম মোমিন ও রফিকুল ইসলাম পাখির নেতৃত্বে দুটি পক্ষ গড়ে ওঠে।
নির্বাচনের পক্ষে থাকা মোমিনের অনুসারী শ্রমিকদের অভিযোগ, গত ২৩ এপ্রিল তাদের ওপর হামলা হয়। পরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি করে নতুন কমিটি ঘোষণা করলে তা প্রত্যাখ্যান করেন শ্রমিকদের একটি অংশ। তারা মে মাসে কয়েক দফা কর্মবিরতি পালন করেন। পরে জেলা প্রশাসকের আশ্বাসে ঈদের পর নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সমঝোতা হয়।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন আয়োজন করতে সোমবার বিকালে নিজের কার্যালয়ে দুই পক্ষের শ্রমিকদের সঙ্গে বসেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। ওই সভায় রাজশাহী সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামও (হেলাল) উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম পাখি তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
বৈঠকে মোমিনপন্থী বা পাখিবিরোধী শ্রমিক নেতারা জেলা প্রশাসককে পরামর্শ দেন যে, সরাসরি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন না করে আগে ইউনিয়নের সদস্যদের নিয়ে একটি সাধারণ সভা আয়োজন করা হোক। সেই সভায় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড বা নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।
তাদের ধারণা, এভাবে বোর্ড গঠন করলে নির্বাচন বেশি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ হবে।
এ সময় বৈঠকে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে কমিটিতে শ্রম অধিদপ্তর, মহানগর পুলিশ ও শ্রমিক ফেডারেশনের একজন করে প্রতিনিধি রাখার বিষয়ে উপস্থিতরা একমত হন। তবে কমিটিতে বাস মালিক সমিতির একজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উঠলে বিরোধ দেখা দেয়।
জেলা শ্রমিক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এরশাদ আলী পল্টু এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করলে বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হট্টগোল শুরু হলে বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়।
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “শ্রমিকদের একটা অংশ সাধারণ সভা করে নির্বাচনি কমিটি গঠন করতে চান। কিন্তু তাদের কমিটি না থাকার কারণে এখন তো সেটা সম্ভব নয়। এখানে পক্ষপাত করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তারা দাবি করলে করতেই পারে। এ জন্য তারা বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায় সেটা আমরা দেখছি।”
ওই সভার পর দুই পক্ষের শ্রমিক নেতারা শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় আসেন এবং উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে কিছু রাজশাহী সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত চেম্বার ভাঙচুর করা ঘটনা ঘটে।
চেম্বারে লুটপাট চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নজরুল ইসলাম। এরপর রাত থেকেই আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
শ্রমিক নেতা মোমিনুল ইসলাম বলছেন, “ডিসি স্যার একটা পক্ষ নিয়েছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমরা সাধারণ সভা করে নির্বাচনি কমিটি করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু তিনি দুই-একজনের কথা শুনেই নজরুল ইসলামকে (মালিক পক্ষ) রেখে কমিটি করে দিতে চাইলেন।”
এ শ্রমিক নেতার ভাষ্য, “তিনি থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তাই শ্রমিকেরা বাস বন্ধ করে দিয়েছেন।”