Published : 13 Jul 2026, 05:34 PM
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহানী গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার পাঁচদিন ধরে পানিবন্দি।
মঙ্গলবার রাত থেকে এ এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। বান্দরবান থেকে সাঙ্গু নদী বেয়ে আসা পানি, ভারি বৃষ্টি আর স্থানীয় নয়া খাল, ডলু খাল ও গরলা খালে পানি নামার ব্যবস্থা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে ভাষ্য স্থানীয়দের।
সোমবার দুপুরে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের নয়া খালের মুখ এলাকায় মহাসড়ক থেকে তেমুহানী গ্রামের দিকে যাওয়া সড়কটি প্রায় ১০ ফুট পানির নিচে।
এ গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছে। কেউ কেউ জরুরি প্রয়োজনে নৌকায় চলাচল করছে।
স্থানীয়রা জানান, বুধবার এলাকায় পানি বাড়তে থাকে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার পানি ছিল সবচেয়ে বেশি। শনিবার থেকে পানির উচ্চতা কমেছে। তবে এলাকা থেকে পানি সরেনি।

নৌকা নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হয়ে দেখা গেল, গ্রামটির উত্তর দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলালাইন। পূর্ব দিকে এগোতেই লোকজনের নৌকায় করে আসা-যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ল।
নৌযাত্রী নুরুল ইসলাম বলেন, “আমি রোগী নিয়ে বৈদ্যবাড়ি যাচ্ছি। এখানে গাড়িতে করেই আসতাম। এখন এত পানি নৌকা ছাড়া উপায় নাই।”
বৈদ্যবাড়ির গেইটে দেখা যায়, কয়েকটি নৌকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন। মহাসড়ক থেকে বৈদ্যবাড়ি পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল ৩০ টাকা করে।
আরেকটু এগোতেই দেখা গেল, গ্রামের মূল রাস্তা ধরে বুক সমান পানি ঠেলে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল বশর।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার বেশি পানি উঠছে। ২০২৩ সালেও পানি উঠছিল। কিন্তু এবার বেশি। আমার স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ঘরে আটকা ছিলাম গত ৫ দিন।
“আজকে ঘর থেকে বের হলাম। খুব কষ্টে আছি। ঘরের ভেতর পানি ঢুকছিল। আজকে একটু কমছে।
“দুই-তিন পক্ষ থেকে ত্রাণ নিয়ে লোক আসছিল। সরকারি আর ব্যক্তিগতভাবে দুজন, তারা যা পারছে দিছে।”
ছাতা মাথায় পানি ঠেলে হেঁটে আসা স্থানীয় মুদি দোকানি আবদুল গনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এলাকার নয়া খাল ভরাট। সেজন্য পানি নামতে পারতেছে না। এবার পানি অন্যবারের চেয়ে বেশি। দোকান বন্ধ। আয় রোজগারও বন্ধ।”
নৌকায় গ্রামের আরো কিছু এলাকা ঘুরে তেমুহানী হিন্দু পাড়ার সামনে দেখা বিজলী তালুকদার কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, “বুধবার ঘরে ঢুকছি। আজকে বের হলাম। আমরা কোনো ত্রাণ পাইনি। কেউ কেউ ত্রাণ পাইছে।”
ফিরতি পথে নৌকায় চড়েন সুজন কান্তি সুশীল। এ গ্রামের বাসিন্দা সুজন যাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দিকে।
সুজন কান্তি সুশীল বলেন, “গ্রামে যাদের দোতলা বাড়ি আছে, তারা রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু যাদের একতলা বাড়ি, তাদের সবার বাড়িতে পানি ঢুকেছে।
“এখানে বন্যা হয়—পাহাড় মানে বান্দরবান থেকে নেমে আসা পানিতে। মহাসড়কের পশ্চিম পাশে যে ডলু খাল, সেটা দিয়ে ইট ভাটার জন্য পানি নামতে পারে না। পূর্ব পাশে (গ্রামের অংশে) নয়া খালও পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়েছে। সেটাও ভরাট। না হলে এতদিন পানি জমে থাকত না।”
মহাসড়কের পশ্চিম পাশে চা দোকান চালান মো. ওসমান। তার দোকানেও বৃহস্পতিবার পানি ঢুকেছিল। তেমুহানী গ্রামের বাসিন্দা ওসমানের ঘরেও পানি ঢুকেছিল।
তিনি বলেন, “অনেক ত্রাণের গাড়ি দেখেছি। স্থানীয় বিএনপির এমপি এবং বিরোধীদলের লোকজন ত্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু যাদেরকে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব দিছে, তারা কাদের ত্রাণ দিচ্ছে—সেটা তারাই জানে।
“আমরা ত্রাণ পাইনি। গ্রামের সামনের দিকের বাড়ির লোকজন কিছু পেয়েছে। ভেতরের দিকে কেউ যায় না।”

ফেরার পথে দেখা ‘দেওয়ানহাট ব্লাড ব্যাংক’-এর একটি দলের সঙ্গে। তারা নৌকায় করে রান্না করা খাবার ও ওষুধ নিয়ে তেমুহানী গ্রামের পথ ধরছিলেন।
দেওয়ানহাট ব্লাড ব্যাংকের সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়ে এসেছি। যতটুকু পারি দিব।”
রোববার রাত পর্যন্ত ছয় লাখের বেশি মানুষের পানিবন্দি থাকার তথ্য দিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়। জেলায় এবারের বন্যায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
৫ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়। এ বন্যায় চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা।
রোববার রাতে দেওয়া সরকারি হিসাবে, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মোট ১৫২টি পৌরসভা ও ইউনিয়ন এবারের বন্যায় আক্রান্ত।
এর মধ্যে সাতকানিয়ার ১৮টি ইউনিয়ন পড়েছে বন্যার কবলে; প্লাবিত হয়েছে উপজেলার ৮৫ শতাংশ এলাকা।
জেলার ১৫উপজেলার মোট ৪০৭টি আশ্রয় কেন্দ্র আশ্রয় নেয়া মানুষের সংখ্যা রোববার রাত পর্যন্ত ছিল ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। তারমধ্যে সাতকানিয়া উপজেলার ৯৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৮৭৩০ জন আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন।
বন্যায় উপজেলাগুলোর মোট ১১৯৬ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মধ্যে ১৮৭ কিলোমিটারই সাতকানিয়ায়।
জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মোট ১১ হাজার ৬১৪টি বসতবাড়ির মধ্যে একক উপজেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২৪৮০টি বসতবাড়িই সাতকানিয়ার।
রোববার রাত পর্যন্ত সরকারি হিসাবে সাতকানিয়াতে ১০০ টন চাল এবং নগদ ৯ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলায় চালের চাহিদা আরও ৫০০ টন, আর নগদ টাকা প্রয়োজন আরও ১০ লাখ। সঙ্গে ঘরবাড়ি মেরামতে ৫০০ বান্ডিল ঢেউটিন দরকার।

এবারের বন্যায় সাতকানিয়া উপজেলার ৯টি সেতু-কালভার্ট ভেঙেছে। জেলায় বন্যায় যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে তিনজন মারা গেছেন সাতকানিয়ায়।
রোববারের হিসাবে জেলার ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৭০টি পরিবারের প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় ছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, বিভিন্ন স্থানে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে তা পুরোপুরি কোথাও নামেনি।
এদিকে সাঙ্গু নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। পানি নেমে গেছে সাতকানিয়া-বান্দরবান সড়ক থেকেও।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর দোহাজারী অংশের পানি বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছিল।
সোমবার বেলা ৩টার দিকে তেমুহানী গ্রাম থেকে ফেরার পথে রোদের দেখা মিলছে ৯ দিন বাদে। তখনও সাতকানিয়া উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে ছিল।