Published : 28 Apr 2026, 01:27 AM
দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসিয়েছে সরকার; শুধু চট্টগ্রামে রয়ে গেছেন নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে জিতে আসা মেয়র শাহাদাত হোসেন।
কিন্তু সবশেষ ভোটের তারিখ ধরলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদও মাস দুয়েক আগে ফুরিয়ে গেছে। ফলে এই বিএনপি নেতার মেয়র পদে বহাল থাকাটা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ আলোচনা সামনে আসে সোমবার সন্ধ্যায় নগর ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মেয়রের আলাপকালেও।
সেখানে শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, মেয়র হিসেবে তার মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত। এ নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে হাই কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
কোনো ব্যক্তি বা দলের নাম না নিয়ে তিনি বলেন, “জিনিসটা নিয়ে তারা হঠাৎ কেন এত সরব হয়ে গেল, বুঝলাম না। এটা দায়িত্ব কার? দায়িত্ব হল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। তাদের অধীনে হচ্ছে সিটি করপোরেশন।”
তার দাবি, “আমি যেদিন শপথ নিয়েছি, সেদিন থেকে ৫ বছর পর্যন্ত আমার মেয়াদ। সেটা আমি মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছিলাম। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে আর কিছু বলেনি।”
তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞরা বলছেন, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম সভা হওয়ায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখানে কারও ‘দাবির কিছু নেই’।
কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পর শাহাদাতই মেয়র থাকবেন, না কি প্রশাসক বসানো হবে, তা স্থানীয় সরকারের উপর নির্ভর করছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
সরকারের তরফে বলা হয়েছে, তারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, কবে নাগাদ এসব নির্বাচন হবে, এ বিষয়ে তারা এখনও আলোচনা করেনি। মেয়াদোত্তীর্ণ বিবেচনায় ভোটের তফসিল দেওয়া হবে।

শাহাদাতের মেয়াদ নিয়ে আইন কী বলছে
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন নৌকার প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী। বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত ধানের শীষ প্রতীকে পান ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট।
২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মেয়র হিসেবে শপথ নেন রেজাউল। এ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি।
নির্বাচনের ২৭ দিন পর ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে ফল বাতিল চেয়ে ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন শাহাদাত।
চব্বিশের আন্দোলনে সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর সেই মামলার রায়ে শাহাদাতকে নির্বাচিত ঘোষণা করেন চট্টগ্রামের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের বিচারক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমীন। পরে ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেয়র পদে শপথ নেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শাহাদাত।
আইন অনুযায়ী, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর।
এ বিষয়ে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, “এটা হয় এভাবে, যে মেয়াদের জন্য কেউ নির্বাচনে জেতে বা হারে, তা ওই মেয়াদটার জন্য। ২০২১ সালের ইলেকশনের মেয়াদ হল পাঁচ বছর।”
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “ধরুন, কেউ কোনো আদালতের আদেশে ক্ষমতা নিতে ২০২৩/২০৪ সালে গেল, তবুও তার মেয়াদ নির্দিষ্ট ওই সময়ের জন্য থাকবে। এজন্য অতিরিক্ত সময় তিনি পাবেন না।”
ইসির সাবেক এই কর্মকর্তা ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে জেসমিন টুলী বলেন, “আদালতের আদেশে থাকার কথা, উনি কোন মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। যে মেয়াদের নির্বাচনের জন্য মামলা করেছিল, সিটি করপোরেশনের সে মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়র, চেয়ারম্যান কিংবা সদস্য যাই হোক, মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।”
নির্বাচন কবে হবে, কোন নির্বাচন আগে হবে, কোনটার মেয়াদ কবে শেষ হবে, তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিংবা বিভাগ ঠিক করে।
এরপর মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি ইসির কাছে জানানোর পর ভোটের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে নির্বাচন কমিশন।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। আর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর মেয়র আরও বেশি সময় থাকবে কি না কিংবা সরকার প্রশাসক নিয়োগ দেবে কি না- তা সরকারের উপর নির্ভর করছে বলে অভিমত এ বিশেষজ্ঞের।
“মেয়াদ শেষ হওয়ার পর উনি কতদিন থাকবেন, কীভাবে থাকবেন, এটা ঠিক করবে মন্ত্রণালয়। উনার (চট্টগ্রামের মেয়র) নরমাল মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ওই পরিষদের তারিখ শেষ হওয়া পর্যন্ত।
“সিটি করপোরেশনের মেয়র লাভজনক পদ। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যখন নির্বাচন হয়, তখন তিনি প্রার্থী হতে চাইলে পদত্যাগ করে ভোট করতে হবে। মেয়রের মেয়াদ তো আগে ঠিক হবে, তারপর পদত্যাগের বিষয়টি আসবে।”
জেসমিন টুলী বলেন, সব পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করেছে সরকার। কবে নির্বাচন করবে, তা নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে।

প্রশাসক, মেয়াদ ও ভোটের সময়
২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ৬ ধারায় ‘ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ’ বিষয়ে বলা হয়েছে, করপোরেশনের মেয়াদ হবে প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর।
দুই বছর পর ২০১১ সালে এ আইন সংশোধনের সময় ‘তবে মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও পুনর্গঠিত সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা যাবে’ অংশটি বিলুপ্ত করা হয়।
সেই সঙ্গে ২০১১, ২০১২ ও ২০২৪ সালে ‘অবস্থা বিশেষে প্রশাসক নিয়োগ’, ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগ ও কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা’, ‘নির্বাচনের সময়, ইত্যাদি’- তিন বিষয়ে সংশোধনীও আনা হয়।
মেয়াদ শেষের আগের ১৮০ দিনের মধ্যে এবং করপোরেশন গঠন বাতিলাদেশের পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে ভোটের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ছয় সিটি ও ১৪ মার্চ আরও পাঁচ সিটিতে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক পদে বসায়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সংশোধনীসহ অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিল সংশোধন বিল আকারে পাস করা হয়।
শাহাদাত কী বলছেন
পেশায় চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন ছাত্রাবস্থা থেকে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। নগর বিএনপির আহ্বায়কও ছিলেন তিনি।
নিজে আবার মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী কি না জানতে চাইলে গত ১৫ এপ্রিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হ্যাঁ, দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। আরেকজনকে দিলে কিছু করার নেই। দলের অন্য কেউও দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারে। এটা গণতান্ত্রিক অধিকার।”

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সরকার চাইলে নির্বাচন হতে পারে। এটা সরকারের বিষয়। যদি সরকার চায় আজকেই নির্বাচন করতে পারে। সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলে আমাকে পদত্যাগ করতে হবে। যদি সরকার চায় তাহলে অবশ্যই পদত্যাগ করতে রাজি আছি। অথবা আদালতের আদেশের মাধ্যমেও নির্বাচন হতে পারে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব তার মেয়াদ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন বলেও তুলে ধরেন শাহাদাত।
তিনি বলেন, “সেসময় আইনজীবীর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম যেদিন শপথ নিয়েছি সেদিন থেকে ৫ বছর পর্যন্ত আমার মেয়াদ। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে আর কিছু বলেনি।”
এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি নিজের মেয়াদের বিষয়ে মেয়র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার মেয়াদ ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে স্থানীয় সরকার আইনের ৬ ধারায় মেয়র কতদিন দায়িত্ব পালন করবেন, সেটা বলা আছে। সে অনুসারে বর্তমান মেয়র পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।
“এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জানতে চেয়েছিল। একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর মাধ্যমে আমার পক্ষ থেকে লিখিতভাবে আইনের ব্যাখ্যাটি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে।”
চট্টগ্রামের মেয়রের মেয়াদ নিয়ে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা স্থানীয় সরকারের যুগ্ম সচিব ও উপ সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের কেউ এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু বলেন, নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে দায়িত্বে আসা এ মেয়রের মেয়াদ ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে। প্রশাসক নিয়োগ করলে যে সময়ের জন্য করেছে, সে সময় পর্যন্ত থাকতে পারবেন। ওনার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ আইন সমিতির সাবেক এই সভাপতি ইসির আইন শাখার যুগ্ম সচিবের দায়িত্বেও ছিলেন।
উদাহরণ টেনে এ আইনজ্ঞ বলেন, “মামলা করতে করতে পাঁচ বছরের জায়গায় ৪ বছর ১১ মাস ২৫ দিন সময় চলে গেছে; বাকি ৫ দিনের জন্য শপথ নিয়ে মেয়র পদে বসবে। এখানে কারো দাবির কিছু নেই। আইনেই বলা রয়েছে; মেয়াদই পাঁচ বছর।”
ভোটের জন্য প্রস্তুত ইসি ও সরকার
সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়াদ শেষের বিবেচনায় যথাসময়ে ভোটের আয়োজন করার কথা বলেছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের মেয়াদের বিষয়ে অবশ্য মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের সচিবালয় স্থানীয় সরকারের নির্বাচন উপযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। সরকারের তরফেও নানা উদ্যোগ দেখছি। যথাসময়ে নির্বাচনগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেব। কমিশন সভায় প্রয়োজনীয় বিষয় উপস্থাপন করবে ইসি সচিবালয়; আলোচনা হলে কোন নির্বাচন কবে হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। স্থানীয় সরকারের সংশোধন আইন পাস হয়েছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।”
১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর ১২ মে সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট রয়েছে। এরপর স্থানীয় সরকারের ভোটের বিষয়ে প্রস্তুতির প্রক্রিয়া নেবে ইসি সচিবালয়।
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সোমবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের ‘সক্রিয় বিবেচনাধীন’ রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।”
আরও পড়ুন-
এবার স্থানীয় সরকার ভোটের পালা, আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম?
দুই ভাগ হলো ঢাকা সিটি কর্পোরেশন
মেয়াদ শেষের আগের ৯০ দিনের মধ্যে হবে সিটি নির্বাচন
ঢাকায় ৯০ দিনে নির্বাচন হচ্ছে না
মেয়াদ প্রায় শেষ, নিজেকে পরখ করতে ভোট চান মেয়র শাহাদাত
স্থানীয় সরকার: নির্বাচন উপযোগী ৫ প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহে ইসি