Published : 25 Jul 2025, 10:39 PM
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চলতি মাসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে; সবশেষ একজনের মৃত্যু হয় বৃহস্পতিবার।
এদিকে জেলায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬৯ জনে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
চিকুনগুনিয়া উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও হাসপাতালগুলোতে এখনো এই রোগ শনাক্তের পরীক্ষা শুরু হয়নি।
মশাবাহিত এই দুই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শুক্রবার ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি ছিলেন ৭২ জন; আর চিকুনগুনিয়া রোগী ছিলেন ৩২ জন।
এর মধ্যে আবার জেলায় তিনজনের শরীরের জিকা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।
চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তাতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস নাকি ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে রোগী যথাযথ চিকিৎসা পাবে। নইলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ছে
চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গুতে মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। চারজনই মারা গেছেন জুলাই মাসে।
শুক্রবার বিকালে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ইমরান হোসেন (২৭) নামের একজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার মারা যান। বুধবার তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
চলতি বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুতে প্রথম মৃত্যু হয় ১৩ জুলাই। সে হিসাবে গত ১৩ দিনে চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন।
শেষ ২৪ ঘন্টায় চট্টগ্রাম জেলায় আরো ১২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের শুক্রবারের প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি মাসের প্রথম ২৪ দিনে জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩১৪ জন।
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৭২ জন বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এ বছর এখন পর্যন্ত জেলায় মোট ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭৫৯ জন। যার মধ্যে জুন মাসে শনাক্ত হয় ১৭৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৩৫১ জন নগরীর এবং ৪০৮ জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এদের মধ্যে ১১৪ জন বাঁশখালী উপজেলার এবং ১০৮ জন সীতাকুণ্ড উপজেলার বাসিন্দা।
ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪১৭ জন পুরুষ, ২২০ জন নারী এবং ১২২ জন শিশু।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে জেলায় মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ ও একজন নারী। এর আগে একজন জানুয়ারিতে এবং একজন মে মাসে ডেঙ্গুতে মারা যান।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, “গত বছর জুলাই মাসে জেলায় ডেঙ্গুতে একজন মারা গিয়েছিলেন। এবার এখন পর্যন্ত চারজন মারা গেছেন।”
তিনি বলেন, “ জ্বর হলে সাথে সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। তাহলে সময়মত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হবে। অনেক সময় দেরি হওয়ায় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।
“ডেঙ্গু শনাক্ত হলে রোগীকে প্রচুর তরল খাবার খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ওষুধ খাওয়া যাবে না।”

বাড়ছে চিকুনগুনিয়া রোগী
নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকার বাসিন্দা দেবী মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রথমে আমার ছেলের জ্বর হয়। জ্বর ছিল ১০৩ এর উপরে। এরপর আমার পুত্রবধুর জ্বর হয়। তারপর আমি নিজেও জ্বরে আক্রান্ত হই।
“বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিয়েছি। এখন জ্বর নেই। কিন্তু শরীরে খুব ব্যথা; সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।”
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবদুর রব মাসুম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিদিন হাসপাতালে ও চেম্বারে চিকুনগুনিয়ার রোগী আসছে। এই জ্বরে আক্রান্তদের জ্বর চলে যাওয়ার পরও ১৫-৩০ তিন পর্যন্ত শরীরে ব্যথা থাকে।
“সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করতে খুব কষ্ট হয়। হাঁটাচলা করতেও ব্যথার কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেকে রোগীকে দেখি অন্যের উপর ভর দিয়ে হাসপাতালে বা চেম্বারে আসছেন। এক পরিবারে একাধিক ব্যক্তির চিকুনগুনিয়া হচ্ছে।”
এখন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়া আক্রান্তদের স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি তেমন গুরুতর না হলেও জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার আহ্বান জানান এ চিকিৎসক।
নগরীতে চিকুনগুনিয়া গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়লেও এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে এর শনাক্তকরণ পরীক্ষা শুরু হয়নি।
বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে চিকুনগুনিয়া শনাক্তের পরীক্ষা হয়।
বেসরকারি ডায়গনস্টিক সেন্টার এপিক হেলথ কেয়ার সেন্টারের মেডিকেল সার্ভিসেস ইনচার্জ ডা. হামিদ হোসেন আযাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরশু পর্যন্ত আমাদের এখানে ৩৫৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ৩১৬ জনের চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়েছে। প্রতিদিন যে সংখ্যক রোগী পরীক্ষা করতে আসে, তা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি।”
শুক্রবার প্রথমবারের মত সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জেলায় চিকুনগুনিয়া আক্রান্তদের তথ্য জানানো হয়।
সিভিল সার্জন বলেন, “এখন পর্যন্ত ৬৬৯ জনের চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়েছে। সব রোগী জুন ও জুলাই মাসে শনাক্ত হয়। চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত ৩২ জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
“এটি এইডিস মশাবাহিত রোগ। শরীরে ব্যথা, গিড়া ব্যথা, ফোলা থাকে। হাঁটাচলা ও উঠাবসা করা কঠিন। এখন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত কারো শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতির তথ্য নেই।”
আইইডিসিআরের একটি দল চলতি মাসে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচটি ওয়ার্ডের ৬টি এলাকায় জরিপ চালিয়ে সবগুলো এলাকাতে এইডিস মশার উপস্থিতির উচ্চ হারের প্রমাণ পেয়েছে, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার উচ্চ মাত্রার সংক্রমণের ঝুঁকি নির্দেশ করে।
এছাড়া চট্টগ্রামে আরেক মশাবাহিত রোগ জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত তিনজন রোগীর তথ্যও নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
চট্টগ্রামে জিকা শনাক্ত, 'উচ্চ ঝুঁকি' ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু
চট্টগ্রামে দুজনের জিকা ভাইরাস বলে সন্দেহ