Published : 04 Jun 2026, 01:57 AM
বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন শুরু হওয়ার এক দশক পেরোলেও হাত বাড়ালেই মিলছে বেনামি সিম; দোকান থেকে শুরু করে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়েও তা বিক্রি হচ্ছে।
এমনকি বিকাশ-নগদের এজেন্ট বা মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের নিবন্ধনসহ সিম বিক্রি হচ্ছে ফেসবুক মার্কেটপ্লেসেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে খুব সহজেই নিজের পরিচয় লুকিয়ে সিমকার্ড সংগ্রহ কিংবা বিকাশ-নগদের মতো এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারার পুরো ‘সুফল’ নিচ্ছে অপরাধীরা।
বেনামি সিমকার্ড দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। বেনামি বিকাশ অ্যাকাউন্ট দিয়ে টাকা সংগ্রহ করছে অপরাধীরা। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ধরে জালিয়াতদের শনাক্ত করতে পারার কথা; কিন্তু বেনামি পরিচয়ের কারণে তা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। এমনকি দেশ থেকে অর্থপাচারেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব বেনামি এমএফএস অ্যাকাউন্ট।
মোবাইল অপারেটর, এমএফএস কোম্পানিগুলো বেনামি নিবন্ধনের কথা স্বীকার করলেও তারা দায় চাপাচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের এজেন্টদের ঘাড়ে। এ ধরনের অপতৎরতার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তারা দুষছেন নির্বাচন কমিশন থেকে নাগরিকের বায়োমেট্রিকসহ অন্যান্য তথ্য ফাঁসের বিষয়টিকেও।
তবে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে জানাশোনা ব্যক্তিরা বলছেন, মোবাইল ও আর্থিক সেবাদাতা অপারেটরদেরও এর দায় নিতে হবে। এখন কেবল এআই টুল ব্যবহার করে এসব সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা সম্ভব জানিয়ে তারা বলছেন, সেটি করা হচ্ছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বেনামি সিমে যত অপরাধ
সাইবার অপরাধের প্রথম ও কঠিন ধাপ হচ্ছে একটা ভুয়া ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করতে পারা। বাংলাদেশে এই কাজ সহজে করা যায় বলেই তা সাইবার অপরাধীদের ‘তীর্থক্ষেত্র’ হয়ে উঠছে।
পুলিশ বলছে, এসব সিম ব্যবহার হচ্ছে নানা অপরাধে। অপরাধের ধরন হচ্ছে- অচেনা লিংকে ক্লিক করিয়ে হ্যাকিং ও এরপর নিজের বিকাশ নম্বরে টাকা নেওয়া, পণ্য বিক্রির নামে অগ্রিম নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ, অনলাইন জুয়া, লাইভ পর্ন, এমএফএস বা ব্যাংকের পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়া ইত্যাদি।
গত ১২ জানুয়ারি ঢাকা থেকে পাঁচ চীনা নাগরিকসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন অপারেটরের ৫১ হাজার ২৬১টি সিমকার্ড ও ২১টি ভিওআইপি জিএসএম গেইটওয়েসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম।
এরপর গত ১৩ মে আরও ছয় চীনা নাগরিকসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের কাছ থেকে ২৮০টি সিমকার্ড ও কয়েকটি জিএসএম সিম মডিউল বা জিএসএম গেটওয়ে (ভিওআইপি গেটওয়ে) উদ্ধার করে ডিবি।
ডিবির ভাষ্য, তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্যের নামে নিবন্ধিত এমএফএস এজেন্ট সিম সংগ্রহ করে সেগুলো জিএসএম গেটওয়ে ডিভাইসে ব্যবহার করে একসঙ্গে শতাধিক সিম সক্রিয় রাখত।
এসব সিম ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ার অর্থ, প্রতারণার টাকা এবং অবৈধ লেনদেন পরিচালনা করা হতো জানিয়ে ডিবি বলছে, চক্রটি নিজস্ব জুয়ার পোর্টাল পরিচালনার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা বিদেশে বিশেষ করে চীনে পাচার করছিল।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলছেন, “বিকাশ বা নগদ এর মাধ্যমে টাকাটা তাদের কাছে আসছে এবং তাৎক্ষণিকভাবেই সেটা তারা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে।”
গ্রেপ্তার হওয়া চীনাদের মত বড় চক্রগুলো ছাড়াও দেশের ছিঁচকে অপরাধীরাও ব্যবহার করছে ভুয়া সিম। ঈদের আগে জামালপুর থেকে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে র্যাব জানায়, তাদের কাছ থেকে ৯৬৩টি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

অফলাইন-অনলাইনে হাঁকডাক দিয়ে বিক্রি
কীভাবে তারা এসব সিমকার্ড সংগ্রহ করছে জানতে চাইলে ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলছেন, “আমরা এর আগে সিম বিক্রেতা এজেন্ট, বিকাশ এজেন্টদের ধরেছি, যারা এই কাজগুলো করছে। ধরেন একজন ব্যক্তি সিম কিনতে গেলে তার বায়োমেট্রিক ও এনআইডি কার্ডের তথ্য দিয়েই ওই এজেন্ট আরও কয়েকটি সিম নিবন্ধন করিয়ে নিজের কাছে রেখে দিচ্ছে।
“এরপর সে সেগুলো বাজারে বেচে দিচ্ছে, অপরাধীরা সেগুলো কিনে নানা অপকর্ম করছে। কিন্তু পরে তাদের খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, সিমের নিবন্ধন ভুয়া।”
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মোবাইলের দোকানে একটু খোঁজ করলে এসব ভুয়া সিম পাওয়া যায় বলে জানাচ্ছেন ডিবি কর্মকর্তারা। এর বাইরে ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও মার্কেটপ্লেসে রীতিমতো হাঁক-ডাক দিয়ে বান্ডেল ধরে বিক্রি হচ্ছে ভুয়া নিবন্ধনের সিমকার্ড। ফেইসবুকে এরকম শতাধিক গ্রুপ পাওয়া গেছে, কোনো কোনো গ্রুপের সদস্য ১০ হাজারেরও বেশি।
সিমকার্ড ছাড়াও বিকাশ-নগদের নিবন্ধিত সিম কেনার জন্য ফেইসবুকে পৃথক গ্রুপওগড়ে উঠেছে। এসব গ্রুপে বিকাশের বিভিন্ন ধরনের অ্যাকাউন্ট নিবন্ধিত সিমকার্ড পাওয়া যাচ্ছে। বিকাশের একটি এজেন্ট বা মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে জাতীয় পরিচয়পত্রের পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য দিতে হয়।
বিকাশের গ্রাহক সম্পর্কিত তথ্যের ফরম বা ‘কেওয়াইসি’ করা সিমকার্ডও এসব মার্কেটপ্লেসে বিক্রি হচ্ছে। গ্রাহকের নাম, এনআইডি ও ছবিসহ আনুষাঙ্গিক তথ্য নির্বাচন কমিশনের সার্ভার থেকে যাচাইয়ের পরই এসব অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। অনলাইন মার্কেট প্লেসে এসব অ্যাকাউন্ট ‘বিকাশ কেওয়াইসি সিম’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে, দামও কিছুটা বেশি। আবার নারীর নামে খোলা অ্যাকাউন্টের (কেওয়াইসিসহ) সিমের দাম আরও বেশি।
একটি গ্রুপের পোস্টের সূত্র ধরে একজনকে ফোন করা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করে বলেন, মূলত অনলাইন ব্যবসায়ীরা এই সিমগুলো কেনে। মার্চেন্ট সিম পেতে যেসব কাগজ লাগে তা অনেকেরই থাকে না। কিন্তু মার্চেন্ট নম্বর থাকলে ক্রেতাদের আস্থা থাকে বেশি, আর্থিক লাভটাও বেশি। সে কারণে অনেক অনলাইন বিক্রেতা এরকম সিম খোঁজ করেন।

শতবর্ষীদের সিম কেনার ধুম
বেনামি পরিচয়পত্র দিয়ে সিমকার্ড নিবন্ধন দেশের টেলিকম খাতে ‘ওপেন সিক্রেটের’ মত। সবাই বিষয়টি জানেন, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।
সিমকার্ড বিক্রির দায়িত্বে থাকা একটি মোবাইল কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপক বলছেন, “যাচাইকরণের বিষয়টিতো আর আমাদের হাতে নেই। দোকান থেকে কেউ একজন এনআইডি কার্ড নিয়ে এসে সিম নিলে সেটা যদি নির্বাচন কমিশনের সার্ভার থেকে ভেরিফায়েড হয়ে আসে, তাহলে তো আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা চাইলেই সিম বাতিল করতে পারি না।”
ওই ব্যবস্থাপক বলছেন, “আমরা সিম বিক্রেতা ও বিক্রয়কর্মীদের কাছ থেকে জানতে পাই, অদ্ভূত পরিচয়ের মানুষ সিম কিনছে এবং এগুলো নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনও পাচ্ছে।
“যেমন এই বছরের জানুয়ারির দুই দিনে সাতটি জেলায় অন্তত ২০ জন শতবর্ষী ব্যক্তির এনআইডি ব্যবহার করে সিমকার্ড কেনা হয়েছে। এদের কারও বয়স ১০৮, কারও ১০৩। এগুলো অনুমোদনও পেয়েছে।”

‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণে না থাকার’ দোহাই অপারেটরদের
জালিয়াত চক্রের সিম কেনা ঠেকাতে গ্রামীণ ফোন কী করছে জানতে চাইলে কোম্পানির সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, “আমাদের সাইড থেকে আমরা এটা বলতে পারি, আমরা পুরো সিস্টেমটা কন্ট্রোল করি না। ওদিক থেকে কী হচ্ছে সেটা তো আমরা অ্যাশিউর করতে পারব না।
“আমরা যত টেকনোলজি আনছি এটা বন্ধ করার জন্য; যারা এসব করছে, তারাও নতুন নতুন টেকনোলজি ইনোভেট করছে। গ্যারান্টি দেওয়া ভেরি ডিফিকাল্ট, তবে আমরা বলতে পারি আমরা আমাদের বেস্ট এফোর্টটা দিয়ে যাচ্ছি।”
এসব নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাওয়া হয়েছিল আরেক শীর্ষ অপারেটর রবির কাছে।
জবাবে রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, “এনআইডি জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকের অজান্তে সিম নিবন্ধনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিষয়টি এখন আর গ্রাহক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, অনেক সময় বিকল্পভাবেও এ ধরনের জালিয়াতি হয়ে থাকে।
“তবে এনআইডির মাধ্যমে সিম জালিয়াতির বিষয়টি আমরা অবহিত হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং এনআইডি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং এ বিষয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
সাহেদ আলম বলেন, “আমরা দেখেছি আমাদের ন্যাশনাল আইডির ডেটা কম্প্রোমাইজড হয়েছে। এটা একটা অনেক বড় বিষয়। আমাদের এই জায়গাটাকে সিকিউরড করতে হবে। এটা সিকিউরড করতে না পারলে, অন্যান্য যেসব ডেটা আছে- সেগুলো সিকিউরড করে লাভ হবে না।
“এটার ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে আমাদের দরজাটা খোলাই থেকে যাবে। আমরা সবাই একটা চ্যালেঞ্জে পড়ে যাব। সেটা এমএফএস’র ক্ষেত্রেও সত্যি।”

বেহাত নাগরিকের তথ্য
সাহেদ আলমের কথার সত্যতা পাওয়া যায় পুলিশের কাছ থেকেও। গত ১৪ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের দুই কম্পিউটার অপারেটরকে গ্রেপ্তারের পর সিআইডি জানায়, নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের সংবেদনশীল তথ্য ২০০-৩০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করত চক্রটি।
ইসির অনুসন্ধানের বরাতে সিআইডি বলছে, ওই চক্রের আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ৩০ দিনে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০৮টি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দেখা হয়েছে। প্রতিটি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য প্রদানের বিপরীতে ৩০০ টাকা বিনিময় মূল্য হিসাব করলে চক্রটি অবৈধভাবে একমাসেই প্রায় ১১ কোটি হাতিয়ে নিয়েছে।
আবার বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বায়োমেট্রিক তথ্য বিভিন্ন উৎস থেকে ফাঁস হয়েছে—এমন খবরও এসেছে। এসব তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হচ্ছে এবং সেগুলো কিনে ভুয়া ডিজিটাল আইডেন্টিটি তৈরির জন্য অপরাধীরা ব্যবহার করছে বলে তথ্য দিচ্ছে পুলিশ।
ডার্ক ওয়েবে পাওয়া ফিঙ্গার প্রিন্ট ও অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে কেউ বাংলাদেশে সিমকার্ড সংগ্রহ করতে পারে কি না জানতে চাইলে গ্রামীণ ফোনের ইয়াসির আজমান বলেন, “হ্যাকাররা চাইলে অনেক কিছু পারে।”

খুচরো বিক্রেতাদের দায় খোঁজা
এ বিষয়ে সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছেন জানিয়ে ইয়াসির আজমান বলেন, “এটা খুবই সংবেদনশীল একটা বিষয়। আমি এই চেয়ারে বসতেই পারি না, যদি আমি সাইবার নিরাপত্তাকে টপ প্রায়োরিটি না দিই। আমার বোর্ড আমাকে একসেপ্টই করবে না। সাইবার সিকিউরিটি ও প্রাইভেসির জন্য যে ইনভেস্টমেন্ট দরকার হয়, সেখানেও আমাকে বাধা দেওয়া হয় না।
“কিন্তু এখানে শুধু ইনভেস্ট আর ক্যাপাবিলিটি দিয়ে হয় না। অনেক কিছু গ্রাহকের ওপর। আমরা এমনো সিচুয়েশনে পড়ি, যেখানে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হই যে- আমরা সিম রিপ্লেস করব না। ব্যবসার ক্ষতি হলে হবে, দুই-তিন হাজার দোকান আমরা এক দিনে বন্ধ করে দিয়েছি।”
নিজেদের খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলমও।
তিনি বলছেন, “বাংলাদেশ টেলিকম ইকোসিস্টেমে একজন রিটেইলার (খুচরো বিক্রেতা) সাধারণত সব মোবাইল অপারেটর এবং এমএফএস অপারেটরদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। তবে কোনো রিটেইলারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।”
বিকাশের চিফ এক্সটার্নাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শেখ মো. মনিরুল ইসলামও এই অপতৎপরতার জন্য দুষছেন প্রান্তিক পর্যায়ের এজেন্টদের। তার ভাষ্য, এজেন্টরা ‘সরলমনা’ মানুষকে ভুলিয়ে বিকাশ বা নগদে নিবন্ধন করিয়ে সেসব অ্যাকাউন্ট বেশি দামে বেচে দিচ্ছে। এসব অনিয়ম শনাক্ত করতে পারলে সংশ্লিষ্ট এজেন্টের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা হয়।

যা করছে ‘বিকাশ’
এ মাসের শুরুতে বিটিআরসি আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশ বিকাশের মনিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভুয়া অ্যাকাউন্ট প্রতিরোধে তারা কী করছেন?
জবাবে তিনি বলেন, “বিকাশে রেগুলেটরের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয় অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য। এখন বাংলাদেশ ফাইনেন্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সার্কুলারে বলা আছে কীভাবে পেপার কেওয়াইসি বেইজড একটা অ্যাকাউন্ট খোলা হবে। এবং সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে এনআইডি যুক্ত করতে হবে এবং সেটা জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ডেটাবেইজ থেকে ভেরিফাই করতে হবে।
“পরে এল ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি। এরজন্য পাঁচটা স্টেপ আছে। এখানে এনআইডি স্ক্যান করতে হবে, ইসি ডেটাবেজ থেকে সেটা ভেরিফাই হবে, তার লাইভ ফটো আপলোড হবে এবং সেটা ম্যাচিং হওয়ার পরই একটা অ্যাকাউন্ট খোলা হবে।”
তবে এ প্রক্রিয়ার পরেও ভুয়া নিবন্ধন বন্ধ হয়নি স্বীকার করে বিকাশের এই কর্মকর্তা বলেন, “এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা আমাদের সবাইকে জানতে হবে। কিছু কিছু গ্রামের মহিলা বা পুরুষ, বয়স্ক–তাদের চাচি, খালাম্মা বা চাচা ডেকে হয়ত এনআইডি কার্ডটা নিয়ে আসতে বলছে। এরপর ২০০ টাকা দিচ্ছে ‘চা খাওয়ার’ জন্য। এরপর বলছে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করার জন্য। ওই ব্যক্তি তো কিছুই বুঝতে পারছেন না।
“অথচ তার নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়ে গেল। এখন কেওয়াইসির জন্য সিম ভেরিফিকেশন কোনো পূর্বশর্ত নয়। আমরা জানি একজন ব্যাক্তির নামে একাধিক সংখ্যাক সিম (১০টি পর্যন্ত) কেনা যায়। ওই যখন একটা সিমে বিকাশ অ্যাকাউন্ট হয়ে গেল, তখন ওই দোকানদার একটা ইল মোটিভ (অসাধু চিন্তা) নিয়ে ওই সিমটা কাউকে বিক্রি করছে।
“চীনা নাগরিকদের হাতে তো এই কেওয়াইসি বা বিকাশ অ্যাকাউন্ট যাওয়ার কোনো কারণই নেই। তারা যেটা করছে, তারা বিকাশের ওই এজেন্টকে এই সিমের জন্য অতিরিক্ত দাম দিচ্ছে। এভাবে বিকাশ, নগদ, উপায় বা রকেট অ্যাকাউন্ট খুলে তারা ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমগুলো করছে।”
এই চক্রকে থামাতে নিজেদের কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, “আমি আপনাকে বাস্তবতা বললাম, আমাদের দেশে এরকম লোক আছে যারা সারা দিন-রাত শুধু চিন্তা করে কীভাবে ফ্রড করবে, কীভাবে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম করবে। তারা এক্সট্রিমলি স্মার্ট।
“আমি বাস্তবতার আলোকে বললাম, কোন কোন জায়গায় এই ধরনের সিম এনেবেলড করে বিক্রি করার প্রবণতা আছে। আমরা তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করি এবং আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ডিসকানেক্ট করে দিই। প্লাস সন্দেহজনক অ্যাক্টিভিটি ও ট্রানজেকশনের রিপোর্ট বিএফআইইউকে করা হয়। ওনারা সিআইডিকে দিয়ে এই জিনিসগুলোকে তদন্ত করান এবং তখন আবার অপারেশন দেয়।
“বিষয়গুলো নিয়ে আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলছি। আমরা কিন্তু তাদের ধরার জন্য পেছন থেকে সাপোর্ট দিই এবং আমাদের নাম উল্লেখ না করার জন্য বলে দিই। ফোন অপারেটর যারা রয়েছে, তারাও জানে; আমাদের ইঞ্জিনিয়াররাও চেষ্টা করে যাচ্ছে কীভাবে এগুলোকে রোধ করা যায়।”

সমাধান কোন পথে?
বিকাশ কর্মকর্তা মনিরুলের সঙ্গে ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর।
মনিরুলের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে ফাহিম বলেন, “বাংলাদেশে অনলাইন গ্যাম্বলিং গত ১০-১৫ বছরে যে এপিডেমিক পর্যায়ে চলে গেছে, আমার মনে হয় ঢাকা শহরে বসে কেউ এটা কল্পনা করতে পারবে না। এর দায় আমাদের মোবাইল অপারেটরগুলোকেও নিতে হবে এবং এমএফএস বা ব্যাকিং সেবাদাতাদেরও নিতে হবে। টেলিকম অপারেটরদের ক্ষেত্রে ইস্যু হচ্ছে–কেন একজন ব্যাক্তির নামে ১০টা পর্যন্ত সিম রাখা যাবে।
“আরেকটা হচ্ছে এখন এআই এর এখন এত সুন্দর টুলস আসছে যে এগুলো নজরদারি করেই কিন্তু সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করা যায়। যখনই এমএফএস-এর সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা হয়, তারা বলে, তারা চেষ্টা করছেন, সিআইডিকে ডেটা দিচ্ছেন… অফকোর্স আপনাদের সদিচ্ছা আছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এআইসহ মডার্ন টেকনোলজির ব্যবহার করে এই সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টগুলোকে শনাক্ত করা যায়। এই দায়টা আমার মনে হয় ফাইনেন্সিয়াল সিস্টেমের নিতে হবে, সিআইডির ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না।”
বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান আবু বকর ছিদ্দিকও এক ব্যক্তির নামে বেশি সংখ্যক সিম রাখার বিধানকে সমস্যা হিসেবে মনে করছেন।
তিনি বলন, “আমরা গাণিতিকভাবে দেখলে সংখ্যায় যত বেশি হবে, তত বেশি অপরাধ করার সুযোগ বাড়বে। মানে এটাকে সরলীকরণ করে বলছি।
“অর্থাৎ একটা- দুইটা সিম থাকলে এই যে বেনামে ১০-১৫টা সিম রাখার যে বিষয়টা… এখানে ভাবার একটা বিষয় আছে। আমি এখানে কোনো কনক্লুডিং রিমার্কস করছি না।”
বিটিআরসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলছেন, গত বছরের মে মাস থেকে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০টি সিম রাখার বিষয়টি কার্যকর করা হয়েছে। তার আগে একজন সর্বোচ্চ ১৫টি সিম রাখতে পারত। পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা পাঁচে নামিয়ে আনার কাজ চলছে, তবে মোবাইল অপারেটরগুলো সেটা চায় না। মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে বিটিআরসি।